Published : 08 Sep 2025, 10:35 PM
একসময় আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কাছে যারা ছিলেন স্বপ্নের নায়ক, তাদেরকেই তিনি নতুন করে চিনেছেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা হওয়ার পর। প্রিয় ক্রীড়া তারকাদের কাছ থেকে দেখে চমকে গেছেন বলে জানালেন অন্তবর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা।
গত বছরের জুলাইয়ের আগেও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ছিলেন দেশের আর সব ক্রীড়ানুরাগী মানুষের মতোই। দেশের সাফল্যে ইচ্ছ্বসিত হতেন, প্রিয় ক্রীড়া তারকাদের নিয়ে আবেগের স্রোত বইয়ে দিতেন সামাজিক মাধ্যমে। সেই তিনিই গত প্রায় ১৩ মাস ধরে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক।
দূর আকাশের তারাদের একদম নাগালেই পেয়েছেন তিনি এই সময়টায়। তবে তার সেই অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয় বলেই দাবি করলেন ক্রীড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায়।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে সোমবার আলোচনার এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ক্রিকেটে কাজ করতে এসে কোন ব্যাপারটিতে তিনি সবচেয়ে বেশি ‘শকড’ হয়েছেন। ক্রীড়া উপদেষ্টা রাখঢাক না রেখেই শোনালেন তার অভিজ্ঞতা।
“আমি তো একজন ফ্যান ছিলাম। নানা সময়ে লেখালেখিও করেছি, পরবর্তীতে কিছু হাইড করে ফেলতে হয়েছে পেশাদারিত্বের কারণে। তবে বাইরে থেকে যা দেখা যায়, ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপনারা জানেন সেসব, না জানার কথা নয়। আমার চেয়েও হয়তো বেশি জানেন।”
“আমি দেখেছি যে, আমি যে খেলোয়াড়দেরকে বা যাদেরকে প্রিয় খেলোয়াড় মনে করতাম বা উদযাপন করতাম এক সময়, তারা এখানে অনেক ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত, যা আসলে লজ্জাজনক। এটা আমাকে সবচেয়ে বেশি ‘শক’ করেছে এবং নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে যে, আসলে কী…।”
ক্রীড়া উপদেষ্টা যা দেখে ‘শকড’ হয়েছেন, সেখানে ফিক্সিংয়ের মতো গুরুতর ব্যাপারও আছে।
“সেখানেও আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি…। আপনারাও জানেন, খেলাধুলায় আসলে আন্তর্জাতিকভাবেই বিষয়গুলো হয়, ফিক্সিং থেকে শুরু করে বুকি বা এই ধরনের কাজ। এগুলো সমাধানে আমরা চেষ্টা করছি, বিসিবি চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে কোনো ধরনের খেলায় এসব যেন না থাকে, সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি।”
সেই নামগুলো কে কে বা ফিক্সিংয়ের মতো ব্যাপারে জড়িত কারা, সেই প্রশ্নের জবাব সরাসরি দেননি ক্রীড়া উপদেষ্টা। তবে পাশেই বসে থাকা বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “এখানে বুলবুল ভাই আছেন। উনাকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। উনি বিষয়টি দেখছেন।’

ক্রীড়া উপদেষ্টার দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথম কয়েক মাসে ক্রিকেট ও বিসিবি নিয়েই বেশি ব্যস্ত দেখা গেছে উপদেষ্টাকে। পরবর্তীতে সেটি কমে এলেও তাকে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় বা তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ক্রিকেটেই। আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের পথ ধরে সেই সময়ের বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের বিদায়ের পর ফারুক আহমেদের বিসিবি সভাপতি হওয়া ছিল ক্রীড়া উপদেষ্টার চাওয়াতেই। উপদেষ্টা নিজেও তা বলেছেন নানা সময়ে। পরে ফারুককে সরিয়ে আমিনুলকে বিসিবি পরিচালক করে সভাপতির দায়িত্ব পাইয়ে দেওয়াতেও মূল ভূমিকা ক্রীড়া উপদেষ্টারই।
সম্প্রতি যেমন ক্রিকেট আঙিনায় জোর আলোচনা চলছে, আগামী মাসের বিসিবি নির্বাচনে আমিনুলকে আবার বিসিবি পরিচালক করে সভাপতির দায়িত্ব পাইয়ে দেওয়ায় জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ক্রীড়া উপদেষ্টা। সেই গুঞ্জনের পালে জোর হাওয়া লাগল, যখন দেখা গেল ক্রীড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের এই সভায় আমিনুলও উপস্থিত।
আনুষ্ঠানিকভাবে অবশ্য ব্যাখ্যা দেওয়া হলো, বাফুফে সভাপতি তাবিথ আওয়ালকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দেশের বাইরে থাকায় তিনি আসতে পারেননি। তবু এই সভায় আমিনুলের উপস্থিতি ও বিসিবির নির্বাচনে তার প্রতি ক্রীড়া উপদেষ্টার সম্ভাব্য সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই থাকল বারবার। বিব্রত আমিনুল নিজেও নানা ব্যাখ্যা দিলেন।
ক্রীড়া উপদেষ্টা অবশ্য বিসিবি নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উড়িয়ে দিলেন।
“আমরা ততটুকুই হস্তক্ষেপ করব, যতটুকু আমাদের আওতাধীন। নির্বাচন যেন বিধিবদ্ধভাবে হয়, ঠিকভাবে হয়, সেটুকু নিশ্চিত করতে যা করা দরকার, আমরা করব। এর বাইরে বিসিবি নির্বাচনে আর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না সরকার।”
সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকারের হস্তক্ষেপ একটা মাত্রা পর্যন্ত প্রয়োজন আছে বলেও দাবি করলেন ক্রীড়া উপদেষ্টা।
“ডিসিদের ফোন করে জোর করা হচ্ছে পছন্দের লোকদের কাউন্সিলর করার জন্য। ডিসিরা আমাকে ফোন দিয়ে জানাচ্ছেন যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে তাদেরকে। বুলবুল ভাইকে যেমন ফোন করে বলা হয়েছে, ‘আপনি সরে যান। আপনাকে আমরা সিইও (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) বানাব।’ এই ব্যাপারগুলো প্রতিহত করার জন্য সরকারী হস্তক্ষেপ দরকার হচ্ছে। এছাড়া আর কোনো হস্তক্ষেপ নেই।”
ক্রিকেটের নানা সমস্যা ও অভিযোগ ছাড়াও ক্রীড়াঙ্গনের অন্যান্য নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন ক্রীড়া উপদেষ্টা, তাদের বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথাও জানান। ক্রীড়া সাংবাদিকদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি। ক্রীড়াঙ্গনের তহবিল বাড়াতে এক মাসের মধ্যে সম্ভাব্য স্পন্সরদের নিয়ে একটি সম্মেলন আয়োজন করার ঘোষণাও দেন উপদেষ্টা।