Published : 10 Sep 2025, 05:02 PM
জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টিতে চোখ রেখে কদিন ধরেই মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে অনুশীলন করছিলেন মাহমুদউল্লাহ। দেশের সাবেক অধিনায়ককে বুধবার এই আঙিনায় দেখা গেল ভিন্ন রূপে। এ দিন তিনি ব্যাটিং ওয়ার্কশপের মনোযোগী ছাত্র। এখানে তার সঙ্গী বর্তমান-সাবেক আরও বেশ কজন ক্রিকেটার ও দেশের কয়েকজন কোচ। তাদের সবারই চাওয়া, উঁচু মানের কোচ হয়ে ওঠার শক্ত ভিত গড়ে তোলা।
বিসিবি সভাপতি বেশ কিছু দিন আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন এই ব্যাটিং কোচিং কোর্সের কথা। মিরপুরে তিন দিনব্যাপী সেই কোর্স শুরু হলো বুধবার, যেটির কেতাবি নাম দেওয়া হয়েছে ‘রান স্কোরিং ওয়ার্কশপ।’
মাহমুদউল্লাহ ছাড়াও সাবেক ক্রিকেটারদের মধ্যে এই ওয়ার্কশপ করছেন জাভেদ ওমর বেলিম, মোহাম্মদ আশরাফুল, রাজিন সালেহ, আব্দুর রাজ্জাক, শাহরিয়ার নাফীস, হান্নান সরকার, নাজিম উদ্দিন, নাদিফ চৌধুরি, ফরহাদ হোসেন, তুষার ইমরান, নাসিরউদ্দিন ফারুকরা। তাদের মধ্যে আশরাফুল, রাজিন, হান্নান, ফারুকরা এর মধ্যেই কোচ হিসেবে দেশের ক্রিকেটে কাজ করছেন বেশ কিছুদিন ধরে। নাজিম উদ্দিনও চট্টগ্রামে কোচিং করানো শুরু করেছেন।
দেশের কোচদের মধ্যে আছেন মিজানুর রহমান, সোহেল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলমের মতো পরিচিতরা। এমনকি নাঈম ইসলাম, শামসুর রহমান শুভ, ফজলে মাহমুদ রাব্বি, মার্শাল আইয়ুবের মতো যারা এখনও খেলছেন, তারাও অংশ নিচ্ছেন এই কোর্সে।
এই ধরনের কোর্স বিসিবির ইতিহাসে এটিই প্রথম। কোর্সটি পরিচালনা করেছেন দুই অস্ট্রেলিয়ান কোচ অ্যাশলি রস ও ইয়ান রেনশ। পাশাপাশি স্বয়ং বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, যিনি লেভেল থ্রি কোচ ও আইসিসির ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন, তিনিও এখানে একজন প্রশিক্ষক।
কোর্সের প্রথম দিন শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এই উদ্যোগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরলেন বিসিবি সভাপতি।

“এই প্রোগ্রামটা আমরা করছি এই জন্য যে, একটা কোচিং কোর্স যখন হয়, লেভেল ওয়ান, টু, থ্রি এসব, তখন সেখানে সবকিছু শেখানো হয়। ডাক্তাররা যেমন আগে এমবিবিএস পাশ করে, এরপর স্পেশালাইজেশনের দিকে যায়। আমাদের এখানে ইমার্জিং দল আছে, অনূর্ধ্ব-১৯ ও অন্য বয়সভিত্তিক দলগুলি আছে, জাতীয় দল তো আছেই। সেগুলোর জন্য কিন্তু আমাদের স্পেশালিস্ট ব্যাটিং কোচ, বোলিং কোচ, ফিল্ডিং কোচ, এগুলো তৈরি করতে হবে।”
“এটা আমাদের প্রথম পদক্ষেপ। আমরা মনে করেছি যে, আমাদের দেশীয় বিশেষজ্ঞ কোচ তৈরি করতে হবে। সেখানে প্রথম উদ্যোগ হিসেবে ব্যাটিং কোচ দিয়ে শুরু করছি। যে দুজন লোক আমরা নিয়ে এসেছি, আমার চোখে এখানে তারা বিশ্বসেরা।”
প্রশিক্ষকদের একজন অ্যাশলি রস ক্রিকেট বিশ্বের অভিজ্ঞ একজন কোচ। দুর্ঘটনার কারণে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টেনে কোচিংয়ে নেমেছিলেন তিনি। মেলবোর্নের ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষার ডিগ্রি নিয়ে পরে তিনি কাজ করেছেন ভিক্টোরিয়া রাজ্য দলের সহকারী কোচ ও ক্রিকেট ভিক্টোরিয়ার ডিরেক্টর অব কোচিং হিসেবে। রে নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেটের হাই পারফরম্যান্স সেন্টারে কাজ করেন তিনি। সেখান থেকে নিউ জিল্যান্ড জাতীয় দলের সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করেন বেশ কিছুটা সময়। সেই সময় কিউইদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান কোচের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। তার ছেলে অ্যালেক্স রস বিপিএল খেলে গেছেন খুলনা টাইগার্স ও দুর্দান্ত ঢাকার হয়ে।
আরেক প্রশিক্ষক ইয়ান রেনশ কোচ ও কোচ এডুকেটর হিসেবে ক্রিকেট বিশ্বে বেশ পরিচিত নাম। ক্রিকেটের বাইরে গলফ, রাগবি, ফুটবল, বাস্কেটবল, হকি, সাইক্লিংয়ে কোচ ও কোচদের প্রশিক্ষক হিসেবে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে, এমনকি এনবিএ প্লেয়ার ডেভেলপমেন্ট প্রধান হিসেবেও কাজ করেছেন। কোচিং নিয়ে তার অনেক গবেষণাপত্র ও বই আছে। তার ছেলে ম্যাট রেনশ অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ক্রিকেটার।
উঁচু মানের প্রশিক্ষক আনতে পারায় বিসিবি সভাপতি তৃপ্তি তো পাচ্ছেনই, পাশাপাশি তিনি খুশি তাদের ছাত্রদের নিয়েও।
“এই কোর্সে ১২ জন টেস্ট ক্রিকেটার আছে। কেউ খেলছে (ঘরোয়া ক্রিকেটে), অনেকে অবসর নিয়েছে। প্রায় সবাই আন্তর্জাতিক ওয়ানডে খেলা ক্রিকেটার।”
“একজন ক্রিকেটার যখন জানতে পারবে, তার সমস্যার সমাধান কীভাবে করতে পারবে… সে যদি খেলতে খেলতেই নিজের সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে হয়তো সে আরও ভালো ক্রিকেটার হতে পারবে।”
নিজের ভুল নিজে ধরতে পারা ও শোধরানোর ক্ষেত্রেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথাও জানালেন বিসিবি প্রধান।
“আমাদের যে কালচারাল কনসেপ্ট, সেটা বদলাতে হবে। আমরা চিন্তা করছি, জাতীয় দলের ক্রিকেটার যারা আছে, তাদের সবাইকে আমরা লেভেল টু কোচ বানাব। এজন্য এটা করব যে, তাদেরকে কোচের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না, তারা নিজেরাই নিজেদের ছোট ছোট সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারবে। কাজেই এখানে যারা এসেছে, ১২ জন টেস্ট ক্রিকেটারসহ যারা আছে এখানে, তারা শুধু কোচিংই করবে না, নিজের সমস্যাগুলোর সমাধানও করবে এবং তাদের বন্ধুদের সমস্যাগুলোরও সমাধান করবে।”

আমিনুলের আশা, এই ব্যাটিং কোর্সের পথ ধরেই সামনের পথচলায় আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঁচু মানের আন্তর্জাতিক কোচ উপহার দিতে পারবে বাংলাদেশ।
“দেশের প্রশিক্ষক যারা আছেন, তাদেরকে যেন আমরা আন্তর্জাতিক মানের করতে পারি এবং আমাদের কোচরা যেন বিদেশে কাজ করতে পারে, সেটাও আমাদের বড় একটি লক্ষ্য। কারণ, শুধু এশিয়ায় নয়, সহযোগী দেশগুলোর পরিধি বাড়ছে। প্রথমে দেখব, আমাদের নিজস্ব স্থানগুলোতে তারা কীভাবে কাজ করছে এবং তারা যদি আন্তর্জাতিক মানের হয়, অবশ্যই বিদেশে গিয়েও কাজ করতে পারবে।”
“এখানে রিয়াদ (মাহমুদউল্লাহ), শাহরিয়ার নাফীস, আশরাফুল, রাজিন সালেহ, এরা সবাই সফল টেস্ট ক্রিকেটার। তারা যদি আন্তর্জাতিক মানে খেলে (উঁচু পর্যায়ে থাকে) আর কোচিংয়ে যদি শূন্য থাকে, তাহলে তো কোচিং করাতে পারবে না। কিন্তু তারা যখন উঁচু মানের কোচিং কোর্স করবে ও তাদের খেলোয়াড়ি অভিজ্ঞতা সঙ্গে যোগ হবে, ওই মিশ্রণটা পৃথিবীতে বিরল। সেই বিরল ধরনের ওরাই এখানে এসেছে। শুধু খেলা নয়, তাদের বিশ্বমানের কোচ হওয়ার জন্য প্রথম পদক্ষেপ এটি।”
এই ব্যাটিং কোর্স শেষে আগামী সোমবার শুরু হবে লেভেল থ্রি কোচিং কোর্স। বিসিবির উদ্যোগে লেভেল থ্রি কোর্স হতে যাচ্ছে এই প্রথমবার। সেটি পরিচালনা করবেন আরও দুই অস্ট্রেলিয়ান কোচ রস টার্নার ও অ্যালান ক্যাম্পবেল। টার্নার বাংলাদেশে কাজ করে গেছেন আগেও। লেভেল থ্রি কোচিং কোর্সে বর্তমান ক্রিকেটার ও অবসর নেওয়া সবাই অংশ নিতে পারবেন। তবে কিছু মানদণ্ড ধরে নেওয়া আছে, যে শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।