Published : 16 Jan 2026, 12:18 AM
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের তিন সপ্তাহের কম সময় বাকি, এখনও এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের খেলা নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে। আইসিসির সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে আইসিসির অবস্থান বদলের অনুরোধে সাড়া দেয়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষক ইশতিয়াক আহমেদ চান, ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকুক বাংলাদেশ।
মুস্তাফিজুর রহমানকে এবারের আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ইশতিয়াক আহমেদের মতে, এটাই ‘সঠিক’ সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক চাপে দেশের একজন খেলোয়াড়কে এভাবে বাদ দেওয়ার পর ‘আত্মমর্যাদার প্রশ্নে’ বাংলাদেশের এমন কিছুই করতে হত।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোচনা অনুষ্ঠান ইনসাইড আউটে অংশ নিয়ে ইশতিয়াক আহমেদ বলেছেন, মিঠুন মানহাসের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) রাজনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে বলিষ্ট ভূমিকা রাখলে ঘটনা এতদূর গড়াতই না।
“আগে যেরকম আমরা দেখেছি রজার বিনি ছিল, সৌরভ গাঙ্গুলী ছিল। অনেকের খেয়াল, এরা থাকলে হয়ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হত না। হয়েছে, কারণ বিসিসিআই প্রেসিডেন্টের সেই সক্ষমতাটা ছিল না এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। যেই কারণে আমার মনে হয় যে, আজকে আমরা যেটা দেখছি, সেটা হয়েছে ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতে একজন অনুপস্থিত থাকায়।”
আইপিএল থেকে মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া, ভারতের সঙ্গে ক্রিকেটীয় সম্পর্ক, বিশ্বকাপ বয়কটের সম্ভাব্য প্রভাব, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের ভাবমূর্তিসহ নানা বিষয়ে ইনসাইড আউটে খোলামেলা কথা বলেন ইশতিয়াক আহমেদ।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়।

‘বাংলাদেশ সিদ্ধান্তে অটল থাকুক’
আশির দশক থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে গভীরভাবে দেখছেন ইশতিয়াক আহমেদ। ভোটের বছরে রাজনীতিকে ছাপিয়ে আলোচনায় ক্রিকেট ও ক্রিকেট রাজনীতি। গভীরভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে বিসিবির কাছে তার চাওয়া একটাই।
“কঠোর একটা পদক্ষেপ, কঠোর একটা সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে বিসিবি এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে চাইব যেন সেটাই থাকে।”
ভারতের মাটিতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এত দূর এসে অবস্থান না পাল্টানোর তাগিদ দিয়েছেন সাবেক এই ক্রিকেটার।
তবে তিনি এও বলেছেন, “বাংলাদেশকে যদি ভারতে খেলতে যেতেই হয়, চাপে যদি নত হতেই হয়, তা হবে দুঃখজনক, তাতে হেরে যাবে ক্রিকেট। আমি বলতে চাই, ক্রিকেট আর আগের মত থাকবে না।”

‘বিসিসিইয়ের বলিষ্ঠ ভূমিকা না থাকায় এ ঘটনা’
সাবেক ক্রিকেটার ইশতিয়াক মনে করেন, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) শুরুতে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিলে ঘটনা এতদূর গড়াতই না।
আইপিএলের নিলামের আগে ও পরে বাংলাদেশের পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন দেখেন না ইশতিয়াক। নিলামে মুস্তাফিজ দল পাওয়ার পর যেভাবে বাঁহাতি এই পেসারকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলে, সেটা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
“আমার মনে হয়, বিসিসিআইয়ের যে বর্তমান কর্ণধার (মিঠুন মানহাস) রয়েছে, তার যদি বলিষ্ঠ একটা সিদ্ধান্ত যদি এখানে থাকত, আমার মনে হয় এই ঘটনা হত না।”
‘ভারতে ঝুঁকির সঙ্গে ভিসা জটিলতার ঝামেলা’
বিসিসিআইয়ের সভায় ওই সিদ্ধান্ত হয়নি, এমনকি আইপিএল গর্ভনিং কাউন্সিলও সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কিছু জানত না। ফ্র্যাঞ্চাইজি দল কলকাতা নাইট রাইডার্স মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর সংবাদ মাধ্যম থেকে তারা জানতে পারে।
বিসিসিআয়ের শীর্ষ কর্তার নির্দেশে বাঁহাতি পেসারকে বাদ দেওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ইশতিয়াক মনে করেন, সেটা আরও জটিল হয়েছে, ভারতের ভিসা নীতির জন্য।
বাংলাদেশের সমর্থক, সাংবাদিকরা যে ভিসা পাবেন, তা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না তিনি।
“প্রথমত (সমস্যা) হচ্ছে ভিসা পাওয়া নিয়ে। কত সহজে এদেরকে ভিসা দেবে। ভিসা যে দেবেই এটা কিন্তু আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না।”
বিভিন্ন দেশের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত কয়েক জন ক্রিকেটার এখনও ভারতের ভিসা পাননি বলে খবর এসেছে। এ দিকটায় দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ইশতিয়াক।
তিনি বলেন, “আইসিসি কি জানতো না কিংবা বিসিসিআই কি জানত না যে, এইসব দেশে এই পাকিস্তানি খেলোয়াড়রা আছে? তো এটা হচ্ছে কেন?”
খেলোয়াড়রা এখনও ভিসা না পাওয়ায় ওই সব দেশের প্রস্তুতিতে সমস্যা হতে পারে বলে মন্তব্য করেন ইশতিয়াক।
তিনি বলেন, “(যদি সমস্যা থাকে) তো কেন আপনি আগেই সংশ্লিষ্ট ক্রিকেট বোর্ডগুলোকে বলেননি যে, দেখেন আপনাদের এই এইসব খেলোয়াড় আছে, এদের যদি আপনারা নেন তাহলে কিন্তু আমরা তাদেরকে ভিসা দেব না।
“এটা যদি আগে হত, হয়ত তারা মেনে নিতেও পারত। কিংবা তারা নতুন একটা দল বানাত, যেখানে এই পাকিস্তানি (বংশোদ্ভূত) খেলোয়াড়রা নাই। সেই সুযোগটা তো তাদেরকে দিত। তো সেটা কিন্তু হচ্ছে না। লাস্ট মোমেন্টে ইউ আর টার্নিং দেম ডাউন। তো এটাও আমার মনে হয় যে, মাইট ইজ রাইট।”

ভারতের দিক থেকে ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ঘটেছে’
মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব দেখছেন ইশতিয়াক।
“এটা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই তো। যেটা আমি বললাম যে, বিসিসিআইয়ের মধ্যে ওরকম কোনো যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। যদি ওখানে ভালো কেউ থাকতেন, তাহলে এই সিদ্ধান্তে তারা আসত? বিসিসিআই আসত না। অবশ্যই একটা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই এটা হয়েছে।”
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের প্রভাবে ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি। পরিস্থিতি যেভাবে এগিয়েছে, সরকারের সঙ্গে বিসিবির আলোচনার কোনো বিকল্প দেখছেন না ইশতিয়াক।
“আমার মনে হয় বিসিবির যে সিদ্ধান্তটা প্রথম দিকে নেওয়া হয়েছে যে, এখানে একটা জাতীয় মর্যাদা (জড়িত)। আমাদের স্পোর্টস অ্যাডভাইজার বলেছেন যে, এখানে আমরা কোনোভাবেই জাতীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে দেব না। অ্যান্ড দ্যাট ইজ রাইট।”

বাংলাদেশের সামনে শঙ্কা
বাংলাদেশের যৌক্তিক অবস্থানে অন্য বোর্ডগুলো সমর্থন না দেওয়ায় বিস্মিত হয়েছে সাবেক ক্রিকেটার ইশতিয়াক। আইসিসির আয়ের সিংহভাগ যে বোর্ড থেকে আসে, তাদের সঙ্গে যে কেউ ঝামেলায় জড়াতে যাবে না সেটাও তিনি বুঝতে পারছেন।
“আমি অবাক হচ্ছি যে, কেন অন্যান্য আইসিসি (সদস্য) দেশগুলা বাংলাদেশকে সাপোর্ট করছে না। বাংলাদেশ যেসব কারণগুলা দিয়েছে, কোনোটিই অযৌক্তিক না।”
ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না গেলে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইশতিয়াকের মতে, এই শঙ্কা থেকে অবস্থান পাল্টে খেলতে যাওয়া মানে ভারতের ‘অন্যায়’ মেনে নেওয়া।
“এটা খুব দুঃখজনক হবে যদি বাংলাদেশকে ফোর্স করা হয়। এখন এমনও হতে পারে যে ফর দ্য গ্রেটার ইন্টারেস্ট অব ক্রিকেট (বাংলাদেশ খেলতে যেতে পারে)…।”
তিনি বলেন, “ইয়েস, শিওর ক্রিকেট উইল সাফার। বাংলাদেশ শেষমেষ যদি নত হয় কিংবা তারা যদি যেতে রাজি হয় তাহলে হচ্ছেটা কী? আপনি যে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটা থেকে আপনি সরে গেলেন। সো ইউ আর উইকিনিং ইউর পজিশন, সেটা কি ঠিক হবে? দ্যাট মিন্স ইউ আর অ্যালাউয়িং বিসিআই টু গেট অ্যাওয়ে উইথ মার্ডার।”

ভারতের ভাবমূর্তি
ক্রিকেটে ভারতের ভাবমূর্তির অবনতি দেখছেন সাবেক এই ক্রিকেটার। উদাহরণ হিসেবে গত এশিয়া কাপের প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন তিনি। যেখানে ফাইনালসহ তিন দফায় পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলে ভারত। কোনোবারই প্রতিপক্ষের কারো সঙ্গে করমর্দন করেনি তারা।
“গত এশিয়া কাপে হয়েছে কী? অবশ্যই ভারতীয় ক্রিকেটারদের সমালোচনা হয়েছে। ইভেন সুরিয়াকুমার ইয়াদাভ ওয়াজ ক্রিটিসাইজড ফর শোয়িং আনস্পোর্টসম্যান লাইক বিহেভিয়ার। আমি হ্যান্ডশেক করছি না, আমি কী প্রমাণ করছি, যে আমি খেলার থেকে বড়? তা তো না। সেটা তো শেখায় না। খেলাধুলা তো সেটা শেখায় না।”
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিতে বাংলাদেশের ক্ষতি দেখছেন ইশতিয়াক। নিজেদের স্বার্থে সম্পর্কের উন্নতিতে জোর দিয়েছেন তিনি।
“আমি বলব না যে ব্যাড রিলেশনশিপস, এটা হাইলি স্ট্রেইনড রিলেশনশিপস। আমরা খালি আশা করতে পারি যে, সামনে নিশ্চয় দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হবে। ভারতের সমর্থন আমাদের প্রয়োজন আছে।”