তানজিদ-জাকেরদের ‘সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি’

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের বাংলাদেশ স্কোয়াডে আরও ২-১ জনকে যোগ করার ভাবনা আছে নির্বাচকদের।

ক্রীড়া প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 Feb 2024, 03:25 PM
Updated : 24 Feb 2024, 03:25 PM

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের জন্য বাংলাদেশের স্কোয়াড যখন চূড়ান্ত হয়, বিপিএলে তানজিদ হাসানের রান ছিল তখন ৭ ইনিংস খেলে ১৪২। দল ঘোষণার পর ৪ ইনিংসেই তিনি করেছেন ২৪০ রান! বিধ্বংসী একটি সেঞ্চুরি করেছেন, ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস টপকেছেন দুই দফায়। তরুণ এই ওপেনারের মনে হতেই পারে, দলটা আর কয়েকদিন পরে বাছাই করা হলেই হয়তো সুযোগ মিলত তার!

একই ধরনের আক্ষেপ থাকতে পারে জাকের আলিরও। এই কিপার-ব্যাটসম্যানক জাতীয় দলে না নেওয়ায় তার বিপিএল দলের কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের মন্তব্য নিয়ে তো তোলপাড়ই পড়ে গিয়েছিল দেশের ক্রিকেটে। শেষ পর্যন্ত তাদের দুজন কিংবা অন্তত একজন শ্রীলঙ্কা সিরিজেই টি-টোয়েন্টি দলে ডাক পেয়ে যেতে পারেন। বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান জালাল ইউনুস ও জাতীয় নির্বাচক আব্দুর রাজ্জাক এরকম ইঙ্গিতই দিয়ে রাখলেন।

এমনিতে দল নিয়ে প্রশ্ন বা আঙুল তোলার জায়গা বেশির ভাগ সময়ই থাকে। তবে এবার প্রশ্নটা উঠে যাচ্ছে দল ঘোষণার সময় নিয়ে। বিশ্বকাপের মতো আসরেও একদম শেষ সময়ে দল ঘোষণার নজির আছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। বিদেশ সফরেও দল ঘোষণায় দেরি করা হয় অনেক সময়। এবার ঘরের মাঠের সিরিজের জন্য প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই দল ঘোষণা করায় একটু বিস্ময়ের উপকরণ ছিল বটে। বিশেষ করে, বিপিএল যখন চলছে এবং এখানকার পারফরম্যান্স বড় ভূমিকা রাখছে দল বাছাইয়ে, তখন আরও কিছু দিন অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করে দল ঘোষণার সুযোগ নিশ্চয়ই ছিল।

এই প্রশ্নে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নির্বাচক আব্দুর রাজ্জাক জানালেন, “আমাদেরকে একটা সময় বলে দেওয়া ছিল। তখনই আমরা দল গড়েছি। ওই সময় পর্যন্ত পারফরম্যান্স যার যেরকম ছিল, সেসবই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।”

সময়টা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগ থেকে। এই বিভাগের প্রধান জালাল ইউনুস বললেন, দলে নতুন কাউকে যোগ করার সময় এখনও আছে।

“দেখুন, আমাদের কিছু প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার ব্যাপার ছিল। এজন্যই বলা হয়েছিল দল গড়তে। আমার মনে হয় না খুব তাড়াহুড়ো করা হয়েছে। যেহেতু হোম সিরিজ, যে কোনো সময় যে কাউকে যোগ করার সুযোগ তো আছেই। এটা খুব বড় কোনো ব্যাপার নয়। কেউ ভালো করলে তার সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি।”

জালাল ইউনুস জানালেন, কোচ ও নির্বাচকদের সঙ্গে এটা নিয়ে তাদের প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছে।

“গতকালই (শুক্রবার) আমরা এটা নিয়ে কথা বললাম। সেখানে কোচ (চান্দিকা হাথুরুসিংহে) ছিল, নির্বাচকরা ছিল, আমরা আলোচনা করছিলাম এটা নিয়ে। আপনি যে নামগুলি বললেন (তানজিদ, জাকের) তাদের প্রসঙ্গ সেখানে উঠেছে বেশ জোর দিয়েই। মুশফিককে (পেসার মুশফিক হাসান) নিয়েও কথা হয়েছে। দল ঘোষণার পর যারা ভালো করেছে, এরকম সবার কথাই হয়েছে।”

“আমরা বলেছি, নির্বাচকরা যদি প্রয়োজন মনে করে, দলে আরও কাউকে যোগ করতে পারে। তারা চাইলে সিরিজের আগে বা শেষ ম্যাচের আগে এরকম কিছু হতেও পারে। কোচও বলেছে, এটা তেমন বড় কিছু নয়। কাউকে স্কোয়াডে নিয়ে কাছ থেকে দেখতে তো ক্ষতি নেই। হোম সিরিজে এটা খুবই সম্ভব।”

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি দল ঘোষণার পরদিনই জাকেরকে নিয়ে একটি মন্তব্য করে তুমুল আলোচনার জন্ম দেন কোচ সালাউদ্দিন। সিলেটে বিপিএলের ম্যাচ শেষে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের কোচ কড়া সমালোচনা করেন নির্বাচক কমিটি ও বোর্ডের।

“…জাকেরের কথা আপনারা সবসময় হয়তো ভুলে যান। আপনারা কেউ কখনও জিজ্ঞেস করেন না। ছেলেটার হয়তো চেহারা একটু কালো, এই কারণে আমার মনে হয় বোর্ডও (বিসিবি) তাকে দেখে না ঠিকমতো।”

“আপনারা ৬-৭ নম্বর (পজিশনের) খেলোয়াড় খোঁজেন। এই ছেলেটা গত দুটি বছর ধরে খুবই ভালো খেলছে, তার স্ট্রাইক রেট যদি দেখেন। প্রতিটি দিনই সে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে রান করে দিয়ে আসে এবং সে অনেক সেন্সিবল। আমার মনে হয়, এই ছেলেটাকে সুযোগ দেওয়া উচিত।”

সালাউদ্দিনের কথার পুরোপুরি সত্যতা অবশ্য গত বিপিএলে জাকেরের পারফরম্যান্সে ছিল না। সেবার ১১ ইনিংসে ১ ফিফটিতে ১৭৫ রান করেছিলেন জাকের ১২০.৬৮ স্ট্রাইক রেটে।

এবার দল ঘোষণার আগ পর্যন্ত কয়েকটি প্রভাববিস্তারী ইনিংস অবশ্য ছিল জাকেরের। শুরুর দুই ম্যাচে ২০ বলে ২৩ ও ২৭ বলে ২৯ রান করেন তিনি। এর একটি ইনিংস ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্যকর ছিল। ক্রিজে গিয়েই বড় শট খেলায় উন্নতির ছাপ রাখেন তিনি পরের দুই ম্যাচে। একটিতে করেন ৪ বলে ১৮, আরেকটি ৮ বলে ১৮। পরের ম্যাচে আউট হয়ে যান তিনি ১০ বলে ৬ রান করে।

তবে দল ঘোষণার পর দুটি ম্যাচে তার পারফরম্যান্স সত্যিকার অর্থেই ছিল দুর্দান্ত। একটিতে তাওহিদ হৃদয়ের সঙ্গে ম্যাচ জেতানো জুটিতে ৩ ছক্কায় অপরাজিত ৪০ রান করেন ৩১ বলে। সবশেষ শুক্রবার ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে দলের নাজুক সময়ে গিয়ে করেন ১৬ বলে অপরাজিত ৩৮।

সব মিলিয়ে ৯ ইনিংসে তার রান ১৭৯। ৭টিতেই অপরাজিত থাকায় গড় ৮৯.৫। স্ট্রাইক রেট ১৫১.৬৯। অন্তত ১৭৫ রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে টুর্নামেন্টের তৃতীয় সেরা স্ট্রাইক রেট তার।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের দল নিয়ে সমালোচনায় কুমিল্লার কোচ সালাউদ্দিন উল্লেখ করেছিলেন, একগাদা টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানকে নিয়ে রাখা হয়েছে স্কোয়াডে। জাকের আলির আবির্ভাবকে এখানে দেশের ক্রিকেটের জন্যও সুখবর বললেন ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান জালাল ইউনুস।

“আমরা তো আসলে টপ অর্ডারে ব্যাট করার মতো ব্যাটসম্যান পেয়ে থাকি অনেক। জাকের যেখানে ব্যাট করে, এই জায়গায় ঘাটতি আছে। ছেলেটা গিয়েই বড় শট খেলতে পারে, পরিস্থিতি বুঝেও খেলতে পারে। ওকে তো গত বছর দলে নেওয়াও হয়েছিল। আবার সুযোগ পাবে সামনেই, আমি নিশ্চিত।”

“শ্রীলঙ্কা সিরিজেই যোগ করার সুযোগ আছে। এরপর সামনেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৫টি ম্যাচ আছে। তানজিদ, জাকেরসহ যারা ভালো করছেন, সবারই সুযোগ আছে। আমি শুধু বলতে চাই, অনেক খেলা আছে সামনে। কাজেই হতাশ হওয়ার কিছু নেই।”

শ্রীলঙ্কা সিরিজের দলে কাউকে যোগ করার সম্ভাবনার কথা জানালেন নির্বাচক আব্দুর রাজ্জাকও।

“জাকেরকে কিন্তু গত বছর আমরা দলে নিয়েছিলাম। সেবার যে ওর পারফরম্যান্স অসাধারণ ছিল, তা নয়। তবে আমরা ওকে আগে থেকেই খেয়াল করেছিলাম এবং নিশ্চিত ছিলাম, সামনে ওকে আমাদের লাগবে। এজন্যই তখন দলীয় আবহে রাখার জন্য ওকে নিয়েছিলাম। এবার আসলেই ভালো করছে, কাজেই সুযোগ আসবে। হোম সিরিজে ২-১ জনকে যোগ করার সুযোগ সবসময় থাকেই।

“তানজিদ শুরুতে অতটা ভালো করতে পারছিল না, যতটা ওর কাছ থেকে আমরা চাই। পরে গত কয়েকটি ম্যাচে অসাধারণ খেলেছে। এসব আমরা অবশ্যই বিবেচনায় নেব। যেহেতু দল ঘোষণা করা হয়ে গেছে, কাউকে বাদ না দিয়ে আমরা আরও ২-১ জন যোগ করতেই পারি। এখন হোক বা সামনে, ওরা সুযোগ পাবেই।”

বিপিএলের শুরুর দিকে ভালো করে টি-টোয়েন্টি দলে ফেরেন এনামুল হক ও মোহাম্মদ নাঈম শেখ। তবে পরে সেই ধারা ধরে রাখতে পারেননি দুজনের কেউ। নাঈম আসর শেষ করেছেন ১১৯.৬৯ স্ট্রাইক রেটে ৩১০ রান নিয়ে, এনামুল ১২০.৮১ স্ট্রাইক রেটে ২৯৬ রানে।

শুরুতে তাদের পেছনে থাকা তানজিদ পরে টপকে গেছেন দুজনকেই। ১১ ইনিংসে ৩৮২ রান করে আসরের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান স্কোরার তিনি এখনও পর্যন্ত, স্ট্রাইক রেট ১৩৬.৪২। এই পরিসংখ্যান আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ আছে প্লে অফে।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরু ৪ মার্চ। এরপর তিন ম্যাচের ওয়ানডে ও দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলবে দুই দল। ওয়ানডে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচের দলও ঘোষণা করা হয়ে গেছে। পরের ম্যাচ ও টেস্ট সিরিজের দল ঘোষণা করবে গাজী আশরাফ হোসেনের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচক কমিটি।