মিরপুর রাজত্বে আবার জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় ‘কিং’ কোহলি

কোহলির রান প্রসবা মাঠে তাকে সামলানোর কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে বাংলাদেশের বোলারদের।

শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 Dec 2022, 03:31 PM
Updated : 3 Dec 2022, 03:31 PM

অনুশীলন সেরে শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের একাডেমি থেকে বের হচ্ছিলেন বিরাট কোহলি। জাতীয় পতাকা ওড়াতে ওড়াতে তাকে শুভ কামনা জানালেন চণ্ডীগড় থেকে আসা ভারতীয় সমর্থক রামবাবু। তার দিকে হাসিমুখে হাত নেড়ে মূল মাঠের দিকে এগিয়ে গেলেন কোহলি। শনিবার সকালে অনুশীলনে থাকা এই ভক্ত শুধু নয়, আরও অসংখ্য মানুষের শুভ কামনা তার সঙ্গী। তবে মিরপুরের এই মাঠ ভারতের মহাতারকার জন্য এমনিতেই দারুণ শুভ!

এই আঙিনায় তিনি বরাবরই বইয়ে দিয়েছেন রানের স্রোত। এই ২২ গজে বরাবর হেসে উঠেছে তার ব্যাট। এই সবুজ ঘাসে সবসময়ই তার বিচরণ আনন্দময়।

প্রায় ছয় বছর পর শুক্রবার ফের সেই সাফল্যের মঞ্চে পা রাখেন কোহলি। অনুশীলন শুরুর আগে ওয়ার্মআপ কিংবা নিজেদের মধ্যে খেলা ভলিবলে অন্যদের চেয়ে চনমনে দেখা যায় তাকে। পরে নেটেও ভারতের অন্য খেলোয়াড়দের চেয়ে বেশি সময় কাটান।

শনিবারও অনুশীলনে একাগ্র দেখা গেল ভারতের এই ব্যাটিং জিনিয়াসকে। নেট সেশন শেষে ফুরফুরে মেজাজে ড্রেসিং রুমে যেতে দেখা যায় তাকে। বাংলাদেশে প্রতি সফরে যে মাঠে সাফল্যের রেণু ছড়িয়েছেন, সেখানে আরও একবার নামার আগে কোহলির এমন প্রাণোচ্ছল ছবিতে অশনী সংকেত দেখতেই পারে বাংলাদেশ!

এমনিতে তিনি ব্যাটিংয়ের মহারাজ। ক্রিকেট দুনিয়াজুড়ে তার রাজত্ব। তবে কোথাও কোথাও তো তার শাসনের দাপট একটু বেশি। মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়াম তেমনই।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত ২৩ ইনিংস ব্যাট করে ৮ ফিফটির সঙ্গে হাঁকিয়েছেন ৪টি সেঞ্চুরি। তিন সংস্করণে মিলিয়ে তার ক্যারিয়ার গড় ৫৩.৯২ হলেও এই মাঠে ১ হাজার ২৫৮ রান করেছেন ৮৩.৮৬ গড়ে!

এই মাঠের সঙ্গে তার সখ্য বহু পুরনো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যখন কেবল তার হাঁটি হাঁটি পা পা, তখনই এই আঙিনায় তিনি ছুটতে শুরু করেন জোর পায়ে!

২০১০ সালে ত্রিদেশীয় সিরিজের জন্য জাতীয় দলের জয়ে প্রথমবার বাংলাদেশে আসেন কোহলি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খ্যাতি পাওয়া বহু দূরে, তখনও জাতীয় দলে থিতু হতে পারেননি তিনি। স্রেফ ১৫ ওয়ানডের অভিজ্ঞতা তখন সম্বল। একটা স্বস্তি অবশ্য সঙ্গী ছিল তার। বাংলাদেশে আসার সপ্তাহখানেক আগেই প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির স্বাদ পান ইডেন গার্ডেনসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডেতে।

মিরপুরে শুরুটা তার ভালো ছিল না খুব একটা। মহেন্দ্র সিং ধোনির দলর হয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আউট হয়ে যান ৯ রানে। পরের ম্যাচ থেকেই গড়ে ওঠে এ্ মাঠের সঙ্গে তার হৃদ্যতা। দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে করেন ৯১ রান। পরের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলেন ৭১ রানের অপরাজিত ইনিংস।

 বাংলাদেশের বিপক্ষে পরের ম্যাচে টানা তৃতীয়বার পঞ্চাশ পেরিয়ে সেটিকে রূপ দেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরিতে। সব মিলিয়ে ওই প্রথম সফরে ৯১.৬৬ গড়ে করেন ২৭৩ রান। এরপর যতবারই এসেছেন মিরপুরে, ততবারই আপন আলোয় উদ্ভাসিত ছিলেন কোহলি।

২০১১ সালে নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটিও এই মাঠেই খেলেন কোহলি। উপলক্ষ রাঙিয়ে রাখেন সেদিন সাকিব আল হাসানের দলের বিপক্ষে স্রেফ ৮৩ বলে ১০০ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে।

যে সংস্করণে তিনি সবচেয়ে উজ্জ্বল, সেই ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংসটিও কোহলি পেয়েছেন মিরপুরের ২২ গজে। ২০১২ এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে উমর গুল, সাঈদ আজমল, শহিদ আফ্রিদি, ওয়াহাব রিয়াজদের গুঁড়িয়ে ৩৩০ রান তাড়ায় খেলেন ১৪৮ বলে অপরাজিত ১৮৩ রানের ম্যাচ জেতানো অসাধারণ ইনিংস।

চার বছর পর টুর্নামেন্টের টি-টোয়েন্টি সংস্করণে একই দলের বিপক্ষে খেলেন ৫১ বলে ৪৯ রানের ইনিংস। রান-বলের সংখ্যায় যেটিকে আদর্শ টি-টোয়েন্টি ইনিংস মনে হয় না। তবে তার ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংসগুলোর একটি মনে করা হয় সেটিকে। মোহাম্মদ আমির, মোহাম্মদ সামি ও মোহাম্মদ ইরফানদের আগুনে বোলিং সামলে সেদিন নিজের স্কিলের ঝলক দেখান তিনি।

২০১৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে অপরাজিত ৭২ কিংবা ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৭৭ রানের ইনিংসগুলোও এসেছে এই মাঠে।

যদিও অতীত সাফল্য কখনোই ভবিষ্যতে সফল হওয়ার নিশ্চয়তা নয়। প্রতিটি দিন, প্রতিটি ম্যাচ নতুন। শুরু করতে হবে শূন্য থেকেই। তবে গড়পড়তা কোনো ক্রিকেটার থেকে চ্যাম্পিয়ন কেউ, সবাই আপনাকে বলবে, যে মঞ্চে সাফল্যের নজির আছে অনেক, সেখানে পা রাখলে ভালো লাগার অনুভূতি দোলা দেবেই। সেই অনুভূতিই হয়ে ওঠে আরও একবার ভালো করার জ্বালানি।

তবে তাকে থামাতে বাংলাদেশের যে আশার আলো একদমই নেই, তা কিন্তু নয়। এখানে দুই দলের সবশেষ সিরিজটিই তো হতে পারে প্রেরণা! এই মাঠ অল্প যে কটি ম্যাচে তাকে খালি হাতে ফিরিয়েছে, এর একটি ২০১৫ সালের সিরিজ। সেবার তার তিন ইনিংস থামে ১, ২৩ ও ২৫ রানে। লিটনরা ভাবতেই পারেন, সেবার হলে এবার কেন নয়!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক