Published : 28 Dec 2025, 06:30 PM
গতিময় ডেলিভারিতে ব্যাটসম্যানের স্টাম্প উড়িয়ে দেওয়া, গতি দিয়ে রেকর্ড বইয়ে নাম লেখানো; এসব ছিল ব্রেট লির ছোটবেলার স্বপ্ন। ক্যারিয়ারে সেইসব চাওয়া পূরণ করে নিজেকে গ্রেটদের কাতারে তোলেন তিনি। এবার অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ‘হল অব ফেমে’ জায়গা পেয়ে সেটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও পেয়ে গেলেন লি।
মেলবোর্নে রোববার এই সম্মাননা পেয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা পেসারদের একজন ডেনিস লিলিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন লি। সাফল্যমণ্ডিত ক্যারিয়ারের জন্য পূর্বসূরির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। সঙ্গে তুলে ধরেন, তার পথচলায় লিলির বিশাল অবদানের কথা।
সেই ৯ বছর বয়স থেকেই লি স্বপ্ন দেখতেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট ক্রিকেট খেলার, ঘণ্টায় ১৬০ কিমি গতিতে বল করার। ওই বয়সেই তাই জোরে বল করার প্রতি বেশি মনোযোগ ছিল তার। কিন্তু সমস্যা ছিল তার বোলিং অ্যাকশনে। যা নিয়ে তাকে টিনএজ বয়সেই সতর্ক করেন লিলি।
এক ফাস্ট-বোলিং ক্যাম্পে লিলির সঙ্গে দেখা হয় লির। ওই সময়ই লিকে বোলিং অ্যাকশন পরিবর্তন করার পরামর্শ দেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৭০ টেস্টে ৩৫৫ উইকেট নেওয়া লিলি।
কিংবদন্তি তাকে কী বলেছিলেন তা জানালেন ৪৯ বছর বয়সী লি, “তুমি এখানে সবচেয়ে দ্রুত গতির বোলার, তবে তুমি যদি বোলিং অ্যাকশন পরিবর্তন না করো, আমার মনে হয়, দুই বছরের মধ্যে তুমি পিঠের চোটে পড়বে।”
ওই সময় লিলির পরামর্শ কানে নেননি লি। পরে ঠিকই পিঠের চোটে পড়েছিলেন গতিময় এই পেসার।
“১৬ বছর বয়সের একজন নিজেকে অজেয় মনে করে। কিন্তু দুই বছর পর, আমি সত্যিই পিঠে চোট পেয়েছিলাম।”
তখনকার অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড (বর্তমানের ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া) লির প্রতিভাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিচর্যা করেছিল। চোটে পড়া বোলারকে পার্থে পাঠিয়েছিল লিলির সঙ্গে কাজ করতে।
“আমার পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে, বোলিং অ্যাকশন বদলাতে, ঠিক করতে এবং আমার খেলা চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল অনেক। আমি বলব না, এইসব কিছুতে কষ্ট হয়নি-তবে গতিময় বোলিংয়ে লক্ষ্যে পৌছাঁতে আমি তা করেছি।”
১৯৯৯ সালে টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন লি। মেলবোর্নে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই ইনিংসে পাঁচ উইকেটসহ মোট ৭ শিকার ধরেন তিনি। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে অস্ট্রেলিয়া দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন তিনি। লি, গ্লেন ম্যাকগা, শেন ওয়ার্নদের মতো গ্রেটদের নিয়ে তখন অস্ট্রেলিয়া ছিল প্রায় অপ্রতিরোধ্য।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে একাধিক অ্যাশেজ জিতেছেন ব্রেট লি। ইতিহাসের সেরা টেস্ট সিরিজগুলোর একটি ২০০৫ অ্যাশেজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
ক্যারিয়ারে অনেকবার চোটের কবলে পড়া লি সব মিলিয়ে, অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে ৭৬ টেস্ট খেলতে পারেন। ১০ বার ইনিংসে পাঁচ উইকেটসহ মোট শিকার ধরেন ৩১০টি। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্টে অষ্টম সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি তিনি।
সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও বল হাতে দুর্দান্ত ছিলেন লি। বিশেষ করে ওয়ানডেতে নিজের সময়ের সেরাদের একজন ছিলেন তিনি। এক সময় আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ে ওয়ানডে বোলারদের শীর্ষেও ছিলেন তিনি।
২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়েও বড় ভূমিকা রেখেছিলেন লি। ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে ২ উইকেটসহ আসরে ১০ ম্যাচ খেলে ২২ শিকার ধরেছিলেন তিনি। ওই আসরে তার চেয়ে বেশি উইকেট পেয়েছিলেন কেবল শ্রীলঙ্কার চামিন্দা ভাস, ২৩টি।
অ্যাঙ্কেলের চোটের কারণে পরের বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি লি। ওই আসরে ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপ ঘরে তোলে অস্ট্রেলিয়া। ২০১১ সালের আসরে ৭ ম্যাচ খেলে ১৩ উইকেট নিয়েছিলেন লি।
ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ২২১ ম্যাচ খেলে ৩৮০ উইকেট নিয়েছেন ব্রেট লি। দেশের হয়ে গ্লেন ম্যাকগ্রার সঙ্গে যা যৌথভাবে সর্বোচ্চ। এই সংস্করণে তিনশ উইকেটও নিতে পারেননি দলটির আর কেউ। টি-টোয়েন্টিতে দেশের জার্সিতে ২৫ ম্যাচ খেলে তার প্রাপ্তি ২৮ উইকেট।
২০১২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিটকে বিদায় বলা লি ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গতিময় ডেলিভারির একটি করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তার একটি ডেলিভারির গতি ছিল ১৬১.১ কিমি/ঘণ্টা, যৌথভাবে যা দ্বিতীয় দ্রুততম। রেকর্ডটি পাকিস্তানের শোয়েব আখতারের, ১৬১.৩ কিমি/ঘণ্টা।
শৈশবে তিন ভাইয়ের মধ্যে লি ব্যাটিং ও লেগ স্পিন বল করতে পারতেন না। শুরু থেকেই ফাস্ট বোলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গতিময় পেসার জেফ থমসনকে আদর্শ মানতেন লি।
“আমি খুব জোরে বল করতে চাইতাম, দৌড়ে এসে বল করে স্টাম্প উড়িয়ে দেওয়ার রোমাঞ্চটা অনুভব করতে চাইতাম, এটা আমার এরকম নেশায় পরিণত হয়েছিল। আমি এটাই করতে চাইতাম। আমার মনে হয়, ৯ কিংবা ১০ বছর বয়সেই আমি ১৬০ কিমি গতির সীমা অতিক্রম করতে চাইতাম।”
“সত্তর ও আশির দশক জুড়ে জেফ থমসনকে আমি অনুসরণ করতাম, তার রেকর্ড বিলিং ১৬০.৪৫ কিমি। তখন ভাবতাম, ‘একদিন আমি ওই রেকর্ডটা ভাঙার চেষ্টা করব।’ সেটা অর্জন করতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে।”