উহানের সেই বাজার থেকেই কোভিডের উৎপত্তি, ইংগিত গবেষণায়

গবেষকরা বলছেন, ২০১৯ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শুরুর দিকেই উহানের মানুষের শরীরে করোনাভাইরাসের দুটি ধরন সক্রিয় ছিল।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 27 July 2022, 09:21 AM
Updated : 27 July 2022, 09:21 AM

চীনের উহান শহরের হুয়ানান সি ফুড ও বণ্যপ্রাণীর বাজার থেকেই যে করোনাভাইরাস মহামারীর সূচনা হয়েছিল, তার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ার কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা।

বিবিসি জানিয়েছে, হুবেই প্রদেশের ওই শহরে সর্বপ্রথম করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার তথ্যগুলো পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে দুটি গবেষণায়, যার ফলাফল মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে।

এর একটিতে দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের শুরুর দিকের সংক্রমণগুলো হুয়ানান বাজার ঘিরেই হয়েছিল। আর করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর সঠিক সময় জানতে অন্য গবেষণায় জেনেটিক তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

বিবিসি লিখেছে, ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রথম সংক্রমণের খবর গণমাধ্যমে এলেও ওই বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শুরুর দিকেই মানুষের শরীরে করোনাভাইরাসের দুটি ধরন বিদ্যমান ছিল।

গবেষকরা বলছেন, ২০১৯ সালের শেষ দিকে হুয়ানানের বাজারে বিক্রি হওয়া জীবন্ত স্তন্যপায়ী প্রাণিগুলোতে সার্স-কভ-২ এর উপস্থিতি ছিল। সেই বাজারে কাজ কিংবা বাজার করতে আসা কেউ একজন প্রথম এসব প্রাণীর সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হয়েছিলেন।

এ গবেষণায় যুক্ত ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসকোর ভাইরলোজিস্ট অধ্যাপক ডেভিড রবার্টসন বিবিসিকে বলেছেন, উহানের ল্যাব থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার যে সন্দেহ অনেকের মধ্যে আছে, তাদের গবেষণায় তা নিরসন হবে বলে তার প্রত্যাশা।

মহামারীর কেন্দ্রস্থল

বিবিসি লিখেছে, যে ভাইরাসের কারণে কোভিডের উৎপত্তি, তার চরিত্র বুঝতে দুই বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছেন বিজ্ঞানীরা। তাতে নতুন নতুন যেসব তথ্য উপাত্ত মিলছে, তাতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এসব গবেষণা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। মহামারীর শুরুরে দিকে সংক্রমণের তথ্য নিয়ে যে বিভ্রান্তির তৈরি হয়েছিল, তারও সমাধান এখন হচ্ছে।

সে সময় উহানের হাসপাতালে ভর্তি কোভিড রোগীদের মাত্র অর্ধেকের সঙ্গে হুয়ানান বাজারের সরাসরি যোগাযোগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল। তাতে গবেষকরা বিভ্রান্তিতে পড়ছিলেন, তাদের ধারণা হচ্ছিল, এ ভাইরাস আসলে অন্য কোনো উৎস থেকে ছড়িয়েছে কি না।

রবার্টসন বলেন, এখন এ ভাইরাস সম্পর্কে যত বেশি তারা জানতে পারছেন, তাদের সেই ধন্দ কেটে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, মার্কেট নিয়ে তাদের যে ধারণা ছিল, সেটাই সঠিক।

কোভিড-১৯ এর উৎপত্তিস্থল শনাক্তের গবেষণায় দেখা গেছে, শুরুর দিকের রোগীদের একটি বড় অংশের সঙ্গে উহানের সেই বণ্যপ্রাণির বাজারের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছিল না। অর্থাৎ, তারা সেখানে কখনও কাজ করেননি, কিংবা বাজার করতেও যাননি। কিন্তু পরে গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের অধিকাংশ ওই মার্কেটের আশেপাশের এলাকাতেই থাকেন।

ফলে ওই বাজারই যে সংক্রমণ ছড়ানোর কেন্দ্রস্থল ছিল, বিজ্ঞানীদের সেই ধারণা শক্ত ভিত্তি পেয়েছে বলে জানান অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলোজিস্ট অধ্যাপক মাইকেল ওরোবে।

তিনি বলেন, “বাজারের বিক্রেতারা প্রথমে সংক্রমিত হয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই আশপাশের কমিউনিটির মানুষের মধ্যে সংক্রমণের চেইন তৈরি হয়েছিল।”

এই গবেষক বলেন, সাত হাজার ৭৭০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে উহান শহরে একেবারে প্রথম দিকে যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের বাড়ি হুয়ানান বাজারের আশপাশে হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

গবেষকরা তাদের মনোযোগ ওই বাজারের ওপরই কেন্দ্রীভূত করেছেন। যেসব নালার পানিতে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতে একটি মানচিত্র তারা তৈরি করেছেন।

রবার্টসন বলেন, “বেশিরভাগ পজিটিভ নমুনাগুলো বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের এলাকার এবং এটি সেই জায়গা যেখানে রেকুনের মত জীবজন্তু বিক্রি হয়।

“সুতরাং আমরা নিশ্চিত যে, সার্স-কভ-২ ভাইরাসের বাহক ওই প্রাণীগুলো ২০১৯ সালের শেষ দিকে সেখানে বিক্রি হয়েছিল।”

ল্যাব থেকে ছড়ানোর তত্ত্ব

গত দুই বছর ধরে কোভিড-১৯ এর উৎস খুঁজতে বিজ্ঞানিদের অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে শুরু থেকেই বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কেরও কেন্দ্রে চলে আসে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ চলে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছে, উহানের ল্যাব বা উহান ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি থেকে প্রাণঘাতী ওই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। আর চীন সেটি বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

তবে গবেষকরা এ পর্যন্ত যেসব তথ্য-উপাত্ত পেয়েছেন, তা ওই অনুমান বা অভিযোগকে সমর্থন করে না বলে জানিয়েছেন কিংস কলেজের অধ্যাপক স্টুয়ার্ট নিল।

তিনি বলেন, “আমাদের কাছে থাকা অসম্পূর্ণ প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা এখন যেটুকু নিশ্চিত হতে পারছি, ওই বাজার থেকেই এ ভাইরাস চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।”

আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, মহামারী শুরুর পর থেকে ১৮ মাসে উহানের বাজারে ৩৮ প্রজাতির ৫০ হাজার প্রাণী বিক্রি হয়েছে।

অধ্যাপক নিল বলেন, নিষ্ঠুর ও অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে এই ভয়বাহ পরিণতি হতে পারে, এ বিষয়ে চীনা কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক