৭৩ মণ্ডপে বিদ্যাদেবীর আরাধনার প্রস্তুতি ঢাবিতে

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টায় প্রতিমা স্থাপনের মাধ্যমে সরস্বতী পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 Jan 2023, 08:05 AM
Updated : 25 Jan 2023, 08:05 AM

মহামারীর দাপট কমে আসায় এবারে ‘পূর্ণ আড়ম্বরে’ এবং ‘পুরনো আমেজে’ বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধানায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন ধর্মের শিক্ষার্থীরা; এবারে ৭৩টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে জগন্নাথ হলে।  

ঐতিহ্যগতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল এ পূজার মূল কেন্দ্র বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ভগবানের জ্ঞান ও বিদ্যার রূপ হলেন দেবী সরস্বতী। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জগন্নাথ হলের মাঠে বাণী অর্চনা, আরতি ও ভক্তদের পুষ্পাঞ্জলিতে তারই আরাধনা করবেন শিক্ষার্থীরা।

জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ ও পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মিহির লাল সাহা বলেন, “করোনার বিধিনিষেধ কাটিয়ে আবারও আমরা বড় পরিসরে বিদ্যাদেবীর উপাসনা করতে পারছি, এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। ৭৩টি মণ্ডপে পূজা পালন করা হবে।“

পূজা সবার জন্য ‘উন্মুক্ত’ থাকবে জানিয়ে মিহির লাল সাহা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টায় প্রতিমা স্থাপনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পূজার কার্যক্রম শুরু হবে। এরপর সাড়ে ৭টায় বাণী বন্দনা এবং ৮টা ১০মিনিটে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হবে। এছাড়া, সাড়ে ১১টায় প্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে পূজার কাজ শেষ হবে।

জগন্নাথ হল ছাড়াও ছাত্রীদের জন্য রোকেয়া হল, শামসুন্নাহার হল, সুফিয়া কামাল হল, কুয়েত মৈত্রী হলে বীণাপাণির আরাধনায় বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে বলে জানান মিহির লাল সাহা।

প্রতিবছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শ্রী পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যাদেবীর পূজা হয়। হাতে বীণা থাকে বলে সরস্বতীকে বীণাপাণিও বলা হয়। সাদা রাজহাঁস এই দেবীর বাহন। ঐতিহ্য অনুযায়ী এদিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পুরোহিতের মন্ত্র পাঠের মধ্য দিয়ে বিদ্যাদেবীর মন্দিরে সন্তানদের প্রথম বিদ্যার পাঠ হতেখড়ির আয়োজন করেন।

বুধবার জগন্নাথ হলে গিয়ে দেখা যায়, হলের খেলার মাঠে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা পূজামণ্ডপ তৈরিতে কারু ও মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে হাত লাগিয়েছেন। পূজার আগের রাতেই মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করতে হয়, তাই মাত্র এই একটি দিনই হাতে থাকায় ব্যস্ততার শেষ নেই তাদের।

পূজা ঘিরে জগন্নাথ হলের দুই পাশের ফটক ও রাস্তায় আলোকসজ্জার কাজও সেরে নেওয়া হয়েছে। চলছে সিসি ক্যামেরা (ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা) বসানোর কাজ।  

গত দুই বছরে পূজার আয়োজনের ‘আড়ম্বর’ আটকে যায় কোভিড মহামারীর বিধি-নিষেধের বেড়াজালে। তবে ‍জগন্নাথ হলের উপাসনালয়ে হল কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয়ভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরস্বতী পূজার আয়োজন করেছিল।

এবারও হলের খেলার মাঠে চারিদিক দিয়ে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা পূজার আয়োজন করেছে। ৭৩টি মণ্ডপের অধিকাংশই বিভিন্ন বিভাগের 'থিমের' আদলে গড়া। অন্য বছরের মত এবারও জগন্নাথ হলের পুকুরের মাঝে বসানোর জন্য দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা তৈরি করছে চারুকলা অনুষদ।

চারুকলার ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধানে প্রতিমাটি তৈরি হচ্ছে বলে জানান কারুকার্য বিভাগের শিক্ষার্থী তন্ময় মণ্ডল।

তিনি বলেন, “আমাদের তৈরি করা এ প্রতিমা হবে আগের তৈরি সব প্রতিমা থেকে বড়। এর উচ্চতা ৩২ ফুট। এটা তৈরিতে আমরা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু করেছি।

জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইটটি ফোর’ বইয়ের থিমের আলোকে মণ্ডপ তৈরি করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

এ বিভাগের শিক্ষার্থী প্রান্ত দত্ত বলেন, “আমাদের পূজামণ্ডপ জর্জ অরওয়েলের ‘মিনিস্ট্রি অব ট্রুথের’ আদলে সাজানো। কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী সংবাদ, সংগীত, কলা ইত্যাদিকে ব্যাবহার করে মিডিয়ার দ্বারা কীভাবে তার জণগণের কাছে তাদের প্রপাগান্ডা প্রচার করে, তার প্রতিভূ এই ‘মিনিস্ট্রি অব ট্রুথ’।

“বিদ্যাদেবী তাদের এই করাল প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করুক, সাধারণ মানুষকে জ্ঞান দান করুক, যাতে তারা তাদের বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর হীনচালের শিকার হয়ে না পড়ে, এই বার্তাকে সামনে রেখেই আমাদের এই আয়োজন।”

সরস্বতী পূজায় বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীদের মিলন মেলার মাধ্যমে ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা’ চর্চা হয় বলে মনে করেন জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের সভাপতি কাজল দাস।

তিনি বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অসাম্প্রদায়িক চর্চার বাতিঘর। সরস্বতী পূজা আমাদের হিন্দু ধর্মের শিক্ষার্থীদের পূজা হলেও এখানে ক্যাম্পাসের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা ঘটে এবং সেখোনে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে।… আমরা বার্তা দিতে চাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একতাবদ্ধ, সব সময় আসাম্প্রদায়িক চেতনা চর্চা করে এবং মানুষের সম্প্রীতি চর্চার আহ্বান করে।”

অধ্যাপক মিহির লাল সাহা বলেন, “উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে সবাই পূজার প্রস্তুতিতে কাজ করছেন। নিরাপত্তার বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রক্টরিয়াল টিম কাজ করবে। আশা করছি সকলের সহোযোগিতায় আমরা সুন্দর একটি পূজা পালন করতে পারব।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক