Published : 14 Oct 2025, 12:39 AM
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী-বাঙালি বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস চান পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা।
পাশাপাশি তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য হলে আসন বণ্টনে বৈষম্য এবং ঐতিহ্যগত খাবার পরিবেশনের বিষয়টিও তুলে এনেছেন তারা।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি আদিবাসী শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেন।
তাদের ভাষ্য, ক্যাম্পাসে তারা প্রতিনিয়ত বৈষম্য এবং ‘বুলিং‘র শিকার হন। আসন্ন চাকসু, হল ও হোস্টেল সংসদ নির্বাচনে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের চাওয়া, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেন বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস গড়ে তোলেন।
তারা বলছেন, তাদের সবচেয়ে বেশি ‘বুলিংয়ের’ শিকার হতে হয় ভাষাগত কারণে। ‘কোটা’ নিয়েও তাদের কটূক্তি করা হয়।

বুধবার অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রাম বিশ্বববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু), হল ও হোস্টেল সংসদের নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ হাজার ৫১৬ জন শিক্ষার্থী ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি বাছাই করবেন।
চাকসুর ২৬টি পদের বিপরীতে ৪১৫ জন এবং ছাত্রদের নয়টি, ছাত্রীদের পাঁচটি এবং একটি ছাত্র হোস্টেল সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন ৪৯৩ জন। ১২টি প্যানেলের বাইরে প্রতিটি পদে আরও ডজন খানেক করে প্রার্থীরা ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত চাকসু নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি দাওয়া নিয়ে প্রার্থীরা তাদের ইশতেহার নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের কাছে। শিক্ষার্থীরাও সেগুলো নিয়ে করছেন বিশ্লেষণ।
নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন আদিবাসী শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের ছাত্র লালরিন বম বলেন, আদিবাসীসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বৈষম্যের শিকার হন হলের আসন বণ্টন নিয়ে।
তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা হল বরাদ্দ আছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যে হলটি আছে, সেখানে ৬০ শতাংশ আদিবাসী, বৌদ্ধ, হিন্দু সম্প্রদায়ের এবং ৪০ শতাংশ আসন মুসলমান শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ।
“আমরা যখন হলে আসনের জন্য আবেদন করি, তখন অতীশ দীপঙ্কর হল ছাড়া অন্য কোনো হলের অপশন আমাদের জন্য থাকে না। কিন্তু মুসলমান শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যান্য হলের পাশাপাশি অতীশ দীপঙ্কর হলের নামও থাকে। আমরা এ বৈষম্যের অবসান চাই। আমরা ইনক্লুসিভ থাকতে চাইলেও আমাদের আলাদা করে রাখা হচ্ছে।”
লালরিন বলেন, আদিবাসীদের সঙ্গে বাঙালিদের খাবারে ভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু হলে বাঙালি বাবুর্চি দ্বারা খাবার বানানো হয়। আবার শিক্ষার্থীরা নিজেরা রান্না করতে চাইলেও দেওয়া হয় না। যার কারণে আমরা সুষম খাদ্য থেকে বঞ্চিত হই।
“আমরা চাই, ভবিষ্যতে আমাদের যারা প্রতিনিধি হয়ে আসবেন, তারা যেন খাবার এবং আবাসনের বৈষম্যটি দূর করে।”
তিনি বলেন, “আদিবাসী হওয়ায় আমাদের চেহারা-ভাষার সঙ্গে বাঙালিদের ভিন্নতা আছে। যার কারণে আমরা বিভিন্ন স্থানে কটূক্তির শিকার হই। আবার অনেকেই ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলেও কটূক্তি করেন।”

লালরিনের আক্ষেপ, ক্যাম্পাসে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা ব্যক্তিরা যখন এ ধরনের কটুক্তি করেন, তখন সেটা মেনে নিতে কষ্ট হয়।
“আমরা আশা করি, আগামীর ছাত্র প্রতিনিধিরা এসব বৈষম্য দূর করে আমাদের হয়ে কথা বলবেন।”
ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র মংক্যউ চাক বলেন, ক্যাম্পাসে ১৩ থেকে ১৪টি সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন।
“নাম না বলে আমাদের ‘ওই চাকমা’ বলে কটূক্তি করে অনেকেই। ক্যাম্পাসের ভেতরেই এভাবে অনেকে বলে। আমরা পাহাড়ি-বাঙালি সমান অধিকার চাই। আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সেটা নিশ্চিত করবেন বলে আশা করি।”
নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী অনিন্দিতা চাকমা বলেন, “আমরা বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস চাই। কেউ আমাদের মাইনরিটি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে মূল্যায়ন করুক, সেটা আমরা চাই না। এ শব্দগুলো আমরা শুনতে চাই না। হলগুলোতেও আমরা বৈষম্যের শিকার হই। আমাদের কোনো প্রার্থনা কক্ষ নেই।
“আমরা চাই আগামীর ছাত্র প্রতিনিধিরা আমাদের জন্য বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস তৈরি করবে।”

পালি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ক্যাচিংহ্লা মারমা বলেন, ক্যাম্পাসে আসার পর থেকেই আদিবাসী শিক্ষার্থীরা বুলিংয়ের শিকার হন। সম্প্রতি একটি প্যানেলের প্রার্থীও আমাদের ঐতিহ্যগত পোশাককে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে।
“আগামী নেতৃত্বের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের বৈষম্যে না রেখে পাহাড়ি-বাঙালি যেন এক কাতারে বিবেচনা করা হয়।”
ক্যাচিংহ্লার আশা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যতের নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা ক্যাম্পাসে আদিবাসী সংস্কৃতি রক্ষা এবং বিভিন্ন ভাষার সংরক্ষণে ইনস্টিটিউট তৈরিতে উদ্যোগী ভূমিকা রাখবেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে প্রায় ৮০০ আদিবাসী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। যাদের বেশিরভাগই চাকমা। ভৌগলিক দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের কাছে হওয়ায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি।

চারুকলা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী নেউমা মারমার মতে, আদিবাসী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বুলিংয়ের শিকার হন মাতৃভাষায় কথা বলার সময়। কথায় কথায় তাদের ‘কোটার’ খোঁটা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নিজে মেধার ভিত্তিতে ভর্তি হয়েছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সবকিছুতেই আমাদের ভাষা, সংষ্কৃতি নিয়ে কটূক্তি করা হয়। আমরা চাই, যারা আমাদের প্রতিনিধি হবেন, তারা যেন কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ না করেন।”
মনোবিজ্ঞান বিভাগ ২০২৪ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র জিনাস চাকমা বলেন, “আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যারা আমাদের পক্ষে কথা বলবেন। বৈষম্যের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাদের সমঅধিকার নিয়ে কথা বলবেন।”