Published : 27 Aug 2025, 12:16 AM
ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসছাড়া হওয়ার পর এক বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। তবে ‘গণরুম’ তৈরি করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধ্য করা কিংবা গেস্টরুমে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এখনও তাজা শিক্ষার্থীদের মনে।
এখন আবাসিক হলে সিট বণ্টনের দায়িত্ব নিয়ম অনুযায়ী হল প্রশাসনের হাতে। গেস্টরুমে নির্যাতনের ঘটনাও অতীত।
আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে অন্যান্য প্যানেলের মত ছাত্রদলও বলছে, ‘গেস্টরুম ও গণরুম সংস্কৃতি’ ক্যাম্পাসে আর ফিরতে দেবে না তারা।
কিন্তু ছাত্রদলের অতীত ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেও পাওয়া গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
গত কয়েক দশকে যে দল যখন ক্ষমতায় থেকেছে তাদের ছাত্র সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন হয়েছে বিতাড়িত। কিন্তু ‘গণরুম’ আর ‘গেস্টরুম সংস্কৃতি’ শব্দদুটো সব আমলেই কলঙ্কের মত লেগে থেকেছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কপালে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শিক্ষার্থী আছে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। আবাসন সঙ্কটের কারণে প্রতিটি হলেই সৃষ্টি হয়েছিল ‘গণরুমের’, যেখানে মেঝেতে টানা বিছানা পেতে প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে থাকতে হত। কারা এসব কক্ষে থাকবে তার নিয়ন্ত্রণ থাকত ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাদের হাতে।
সেই নেতারাই হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য চালু করেছিলেন ‘গেস্টরুম সংস্কৃতি’। এর অংশ হিসেবে ‘জুনিয়র’ শিক্ষার্থীদের হলের গেস্টরুমে ডেকে নিয়ে ‘সিনিয়ররা’ ক্যাম্পাস ও হলে চলাচলের ‘আদব-কায়দাও’ শেখাতেন, যা ‘র্যাগিং’ বা নির্যাতনের রূপ নিত।
ছাত্রলীগ আমলে হলের গেস্টরুমগুলো হয়ে উঠেছিল ‘টর্চার সেল’। অবশ্য ছাত্রলীগ নেতারা বলতেন, তারা গেস্টরুমে সবার সাথে বসে ‘মতবিনিময়’ করতেন, অন্য কিছু না।
সাবেক ছাত্ররা বলছেন, কেবল ছাত্রলীগ নয়, অতীতে ছাত্রদল যখন হলগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখনও গণরুমের রাজনীতি দেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
২০০১ সালের পরের পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র (বর্তমানে উন্নয়নকর্মী) শরিফুল হাসান বলেন, “সেসময় থেকে দেখেছি, ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল একসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে নির্যাতন চালিয়েছে। হলে থাকতে হলে রাজনীতি অত্যাবশ্যক করে তুলেছে।
“এটা আমার দেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কালো অধ্যায়। যেখানে দুই গ্রুপের সমান ভূমিকা ছিল ছাত্র রাজনীতির নামে নিপীড়নের সংস্কৃতি চালু করার ক্ষেত্রে।”

তবে এ অভিযোগ মানতে নারাজ এবারের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে জিএস পদপ্রার্থী তানভীর বারী হামীম। তিনি বলছেন, এরকম কোনো ইতিহাস তার ‘জানা নেই’।
ডাকসু ভোটের মাধ্যমে ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ ছাত্রদলের হাতে গেলে তারা অতীতের মত আবারও ‘গেস্টরুম-গণরুম সংস্কৃতি’ ফেরাবে কি না, সেই শঙ্কা জেগেছে কারও কারও মনে।
কেউ কেউ আবার ভাবছেন, আবাসিক হলে শিক্ষকরা এখনকার মত নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলে, তেমন কিছু করা সম্ভব হবে না।
‘গেস্টরুম ও গণরুমের’ বিরোধিতায় শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ থাকাকেও বড় প্রভাবক হিসাবে মানছেন তারা।
অমর একুশে হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আলতাফ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা গত এক বছর ছাত্রদলকে দেখিনি। তারা অনেক সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু গত কয়েকদিন দেখছি তারা পেশী শক্তি দেখাতে চায়। নির্বাচনের আচরণবিধি মানছে না। প্রশাসন তাদের আলাদা সুযোগ দিচ্ছে। তারা দল বল নিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। রিডিংরুমে ঢুকে পড়ছে।
“এসব দেখে আমার মনে হয় কখনো যদি গণরুম সংস্কৃতি ফেরে, সেটা ছাত্রদলের হাতেই ফিরবে। আবার হল কমিটিও দিয়েছে। সেক্ষেত্রে তারা ক্ষমতায় গেলে প্রভাব বিস্তার করবে না সেটার ভরসা কি?”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মাসুম আহমেদ বলেন, “ছাত্রদল যেমন পেশী দেখাচ্ছে, তেমনি অন্য ছাত্র সংগঠন যে পিছিয়ে আছে এমন না। এখন কেউ কাউকে মানছে না। তবে ছাত্রদল হল কমিটি দিয়ে তাদের যে শক্তি আছে সেটি বুঝিয়েছে।
“আমরা তো হলে আর রাজনীতি চাই না। কেউ গুপ্ত রাজনীতি করুক আমরা সেটাও চাই না। ছাত্রদল রাজনীতি করুক এটাতে আমাদের কোনো বাধা নেই। তবে তারা হলে কমিটি দিয়ে আবার পুরনো সংস্কৃতি ফেরত আনতে চায়, সেটা তো বোঝা যায়।”
তবে মেয়েদের হলগুলোতে এখন ছাত্রলীগের সময়ের মত কারো প্রভাব নেই বলে জানিয়েছেন কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী।
শামসুন্নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান বলেন, “আমাদের হলে কারো আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ–সেটা ছাত্রদল, বাগছাস কিংবা শিবির, কারো নেই। কেউ এখানে রাজনৈতিক প্রভাব দেখালে তাকে শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ করবে।”
তবে বেগম রোকেয়া হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলছেন, “এখানে অরাজনৈতিক বলে কেউ নাই। তবে আমরা চাই না কেউ আধিপত্য করুক। কেউ গণরুম তৈরি করুক। আমরা চাই, সবাই থাকুক। কেউ যেন আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতিয়ার বানিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল না করে।”
ছাত্রদল কীভাবে শিক্ষার্থীদের কীভাবে আশ্বস্ত করবে–এই প্রশ্নে জিএস পদপ্রার্থী তানভীর বারী হামীম বলেন, “যারা আমাদের নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছে, তাদের আমরা বলতে চাই, আমরা এর আগে যারা ছাত্রলীগের হয়ে গণরুম-গেস্টরুম নিত, তারা এখন নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে। তাই, শিক্ষার্থীদের সচেতন করতেই আমাদের এই বক্তব্য। আমরা কোনো প্রকার গণরুম-গেস্টরুম চাই না।”
ছাত্রদলের পক্ষে প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, “প্রশাসন যে ছাত্রশিবিরকে ডাকসু নির্বাচনে সুযোগ দিল, সেটাই প্রশাসনের বড় পক্ষপাতমূলক আচরণ। তারা এর আগে যে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, সেটা ডাকসুর গঠনতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক।”
যা বলছে অন্যান্য প্যানেল
‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী আল সাদী ভূইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “শিয়ালের কাছে যদি মুরগি পাহারা দিয়ে বলেন শিয়াল মুরগি খাবে না, সেটাতো আসলে হয় না। আমরা আসলে তাদের (ছাত্রদলের) কথায় আশ্বস্ত হতে পারছি না।
“আমরা দেখলাম কয়েকদিন আগে তারা হলে নিজেদের কমিটি দিয়েছে। আমাদের যে ১৬ জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি, সেটা ব্রেক করেছে। তাহলে তারা যে সামনে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে রাজনীতি করবে না তার ভরসা কী?”
তিনি বলেন, “সামনে রাজনৈতিক সরকার এলে সব প্রভোস্ট, প্রক্টর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিবর্তন হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা কেমন, আপনারাই জানেন ও দেখেছেন।”
গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমর্থিত প্যানেল ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংসদের’ ভিপি পদপ্রার্থী আব্দুল কাদের বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থান গণরুম-গেস্টরুম কালচারের অবসান ঘটেছে। সেটা আমরা জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করব। ছাত্রদল সেক্ষেত্রে তাদের যে বিগত দিনের কর্মকাণ্ড, তা ঢাকতে এখন গণরুম বিলুপ্তি নিয়ে ইশতেহার দিচ্ছে।
“আমরা দেখেছি ১৯৯০ সালে ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। পরে ১৯৯১ সালে আবার ডাকসু নির্বাচন না দিয়ে গণরুম-গেস্টরুম কালচার ফিরিয়ে আনল। তাদের সেই পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে তারা হয়ত বা বলছে এসব কথা। কিন্তু আমার মনে হয় না, তারা সামনে এসব মানবে।”
ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ এর জিএস পদপ্রার্থী এস এম ফরহাদ বলেন, “গণরুম-গেস্টরুম কালচার তো ছাত্রদলের প্রযোজনায় তৈরিকৃত প্রজেক্ট; পরবর্তীতে ছাত্রলীগ সেটির মালিকানা নিয়ে তত্ত্বাবধান করেছে।
“শিক্ষার্থীরা গত বছর জুলাইয়ে এই কালচারের কবর রচনা করেছে। নতুন করে বিলুপ্ত করার কিছু নাই। ছাত্রদল সর্বোচ্চ এইটুকু বলতে পারে বা কমিটমেন্ট দিতে পারে–গণরুম, গেস্টরুম কালচার অতীতে তারা এনে থাকলেও ভবিষ্যৎে তারা আর আনবে না।”
পুরনো খবর
হলে হলে ছাত্র সংগঠনের কমিটি: ঢাবিতে মধ্যরাতে বিক্ষোভ মিছিল
করোনাভাইরাস: গণরুম-সমাবেশে শঙ্কা ঢাবিতে
শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভিসির বাড়ির সামনে 'গণরুমের নেতা' সৈকত
ঢাবিতে ছাত্রলীগের 'গেস্টরুমে' অচেতন শিক্ষার্থী, তদন্তে কমিটি