Published : 08 Jan 2026, 02:03 AM
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনেও নিরঙ্কুশ জয়ের ধারা বজায় রেখেছে ইসলামী ছাত্রশিবির; প্রথমবার আয়োজিত ভোটেই সাফল্য দেখিয়েছি ছাত্র সংগঠনটি।
এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আয়োজিত সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সংসদের নেতৃত্ব গেল শিবিরের হাতে।
ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসুর জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠনটি।

এক বছরের কমিটিতে ভোট হওয়া ২১ পদের মধ্যে ভিপি, জিএস ও এজিএস এর পাশাপাশি সম্পাদক পদের আটটি এবং পাঁচটি সদস্য পদে জয় পেয়েছে শিবিরের নেতৃত্বাধীন প্যানেল।
ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার পরিষদের প্যানেল জয় পেয়েছে তিনটি সম্পাদক পদ এবং একটি সদস্য পদে। আরেকটি সদস্য পদে জয়ী হয়েছেন একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
জকসুর নেতৃত্বে আসা ভিপি রিয়াজুল ইসলাম ও জিএস আব্দুল আলিম আরিফ দুইজনই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও সেক্রেটারি।
ভোট গ্রহণের একদিন পর বুধবার রাতে ঘোষিত ফলে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত রিয়াজুল আইন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
তিনি ৮৭০ ভোটের ব্যবধানে ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার পরিষদের প্রার্থী একেএম রাকিবকে হারান। ছাত্র অধিকার পরিষদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সভাপতি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুললেও শিবিরের জয়ের জোয়ার রুখতে পারেননি।

ভিপি পদে লড়াই জমলেও শিবিরের প্যানেলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আব্দুল আলিম আরিফ জয় পেয়েছেন বড় ব্যবধানে। আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগ ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী জয় পেয়েছেন ৩৪৯৭ ভোটে।
তবে শিবিরের প্যানেলের সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মাসুদ রানাকেও জয় পেয়ে শক্ত বাধা পেরোতে হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে তার জয়ের ব্যবধান ছিল ৯৪৩ ভোট।
জকসুর শীর্ষ এ তিন পদেই শিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ছাত্রদল-ছাত্রঅধিকার সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা।
সাম্প্রতিক কয়েক মাসে একের পর এক অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচনে তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে না পারলেও জকসুতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দেয় ছাত্রদল নেতৃত্বাধীন প্যানেল। মাঝপথে ভোট বর্জন করে চলেও যায়নি। ভিপি ও এজিএস পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইও করে।

চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনের অবসান হলে দীর্ঘ বিরতির পর আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদে ভোটের আয়োজন করা হয়।
সবকটি নির্বাচনে চমক দেখিয়ে শিবির জয় পায়। এর আগে অনুষ্ঠিত দেশের চারটি বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সংসদের নেতৃত্ব তাদের হাতে যায়।
ভোটে তাদের সামনে এককভাবে কোথাও দাঁড়াতে পারেনি কোনো সংগঠন। পাত্তা পায়নি বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) জয়ী হওয়ার মাধ্যমে তাদের জয়জয়াকারের শুরু হয়। ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ২৮ পদের মধ্যে ২৩টিতে জয় পায় শিবিরের নেতৃত্বাধীন প্যানেল।
এরপর অনুষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদে (জাকসু) সংগঠনটি ভিপি পদে হারলেও ২৫টি পদের মধ্যে ২০টিতেই জয় পায়।
প্রায় তিন যুগ পর চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও নিরঙ্কুশ জয় পায় ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। চাকসুর ভিপি ও জিএসসহ কেন্দ্রীয় সংসদের ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টিতে এবং রাকসুর ২৩টি পদের মধ্যে ভিপি, এজিএসসহ ২০টি পদে জয় পায় সংগঠনটির প্রার্থীরা।
প্রথমবারই শিবিরের জয়জয়কার
দুই দফায় পেছানোর পর মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ হয়; গণনার প্রাথমিক বিপত্তি পেরিয়ে পরদিন বুধবার মাঝরাত পেরিয়ে ফল ঘোষণা করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোস্তফা হাসান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে একেক পদের ফল ঘোষণার সময় সমস্বরে স্লোগান দিচ্ছিলেন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। জয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন পাশে থাকা নেতাকর্মীরা।
এ জয়ের মাধ্যমে কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দুই দশক পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কেন্দ্রীয় সংসদের ভোটে জয়ী হয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করবেন রিয়াজুল ও আরিফ।
ভিপি পদে জয়ী শিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের রিয়াজুল পেয়েছেন ৫৫৫৮ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার পরিষদের রাকিব পেয়েছেন ৪৬৮৮ ভোট।
৫ হাজার ৪৭৫ ভোট পেয়ে জিএস নির্বাচিত হয়েছেন শিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের আরিফ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী খাদিজাতুল কুবরার ভোট ২ হাজার ২২৩টি। আরিফ জয়ী হয়েছেন ৩২৫২ ভোটে।
অপরদিকে এজিএস পদে শিবিরের মাসুদ রানা ৫০২০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের আতিকুর রহমান তানজিল পেয়েছেন ৪০২২ ভোট। তিনি ৯৯৮ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন।
‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ নামের এ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী রাকিব ও এজিএস প্রার্থী তানজিল প্রথম ভাগের ঘোষণা করা কেন্দ্রগুলোর ফলাফলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ছিলেন। পরের কেন্দ্রগুলোর ফলে তারা পিছিয়ে পড়েন। প্রথম থেকেই লড়াইয়ে ছিলেন না জিএস খাদিজাতুল কুবরা।
কেন্দ্রীয় সংসদের ফল ঘোষণার পর একমাত্র হলের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নির্বাচনের ফলও ঘোষণা করা হয়।
নির্বাচনে মোটাদাগে চারটি প্যানেল অংশ নেয়। এরমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় মূলত শিবির ও ছাত্রদল প্যানেলের প্রার্থীদের মধ্যে। নির্বাচনে ভিপি পদে লড়েন ১২ জন, জিএসে ৯ জন এবং এজিএস পদে আটজন।
ছাত্রদের হল না থাকায় নির্বাচন হয় শুধু নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলের ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে। ১৩ জন প্রতিনিধি নির্বাচনে হল সংসদে ভোটার ছিলেন ১২৪২ জন।
সবশেষ ভোট কবে
জগন্নাথ পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ পাওয়ার আগে কলেজ থাকাকালে মোট ১৪ বার ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। এর মধ্যে সর্বপ্রথম নির্বাচন হয় ১৯৫৪-৫৫ শিক্ষাবর্ষে। সবশেষ ১৯৮৭-৮৮ শিক্ষাবর্ষে অর্থাৎ ১৯৮৭ সালে ছাত্রসংসদের ভিপি নির্বাচিত হন মো. আলমগীর সিকদার লোটন ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন জাহাঙ্গীর সিকদার জোটন।
২০০৫ সালে কলেজ থেকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫’ এ ছাত্র সংসদ সম্পর্কিত কোনো ধারা না থাকায় প্রতিষ্ঠার পর একবারও জকসু নির্বাচন হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অন্য চার বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এখানেও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি ওঠে। শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের মুখে গত ২৮ অক্টোবর জকসু নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। ৫ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। শুরুতে ভোটগ্রহণের জন্য ২২ ডিসেম্বর দিন ঠিক করা হলেও ভূমিকম্পে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় ৮ দিন পিছিয়ে তা ৩০ ডিসেম্বর করা হয়।
সেদিন সাড়ে ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত প্রথম জকসুর ভোট হওয়ার কথা ছিল। এদিনই ভোর ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মারা যান। পরে ভোট স্থগিত করা হয়।
প্রথম ভোটের উচ্ছ্বাস
বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দুই দশক পর মঙ্গলবার প্রথমবার আয়োজিত জকসু নির্বাচনে ভোট দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা। তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া ভোট হয় শান্তিপূর্ণভাবে।

ভোট চলাকালে দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান দুই প্যানেলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগও ছিল। এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্যানেলগুলোর নেতারা। তবে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মত এখানে ভোট চলাকালে বা শেষে ভোট বর্জন করতে দেখা যায়নি।
বিকাল ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালট বাক্সগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে নিয়ে যাওয়ায় হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ছয়টি ওএমআর (অপটিকাল মার্ক রিকগনিশন) মেশিনে প্রথমে কেন্দ্রীয় সংসদের ভোট গণনা শুরু হয়। কিন্তু গণনার তথ্যে গড়মিল দেখা দেওয়ায় মাঝে দীর্ঘ সময় ভোট গণনা বন্ধ থাকে।
পরে প্রতিদ্ব্ন্দ্বী প্যানেলগুলোর নেতাদের নিয়ে বৈঠক শেষে গভীর রাতে আবার শুরু হয় গণনার কাজ। প্রথম চার বিভাগের ফল প্রকাশ করতে করতে সকাল হয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯টি কেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে বিকাল ৪টায় শেষ হয়। এবার মোট ভোটার ছিলেন প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার শিক্ষার্থী। কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদে প্রায় ৬৫ শতাংশ ও হল শিক্ষার্থী সংসদে প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দেন নির্বাচন কমিশনার জুলফিকার মাহমুদ।
পুরনো খবর