Published : 02 Aug 2025, 08:21 AM
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ক্যাম্পাসে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, তা অনুসন্ধানে ১৮টি তদন্ত কমিটি করলেও ১৭টিরই প্রতিবেদন হাতে পায়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ছাত্র সংগঠনের কোনো কোনো নেতা মনে করেন, এক বছরেও তদন্ত সম্পন্ন করতে না পারাটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ‘চরম ব্যর্থতা’।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত বছরের ৫ অগাস্টের পর অন্তত ১৮টি তদন্ত কমিটি হয়।
এসব কমিটির মধ্যে রয়েছে— জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শিক্ষক-কর্মকর্তা শনাক্তে কমিটি; ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিয়োগ ও পদোন্নতি বিষয়ক তদন্ত কমিটি; বিগত ১৬ বছরের ‘ইমেরিটাস ও সুপারনিউমারি’ অধ্যাপক নিয়োগ সংক্রান্ত কমিটি এবং কর্মকর্তাদের বৈষম্যের শিকার হওয়ার ঘটনা খতিয়ে দেখার কমিটি।
কর্মচারীদের সঙ্গে বৈষম্য খতিয়ে দেখতে; জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উপর হামলাকারী শনাক্তে এবং বৈষম্যের শিকার শিক্ষকদের বিষয়েও হয় আলাদা তদন্ত কমিটি।
মোর্তুজা মেডিক্যাল সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির ধরন বিষয়ক তদন্ত কমিটি, ডিবিএ ডিগ্রি সংক্রান্ত সত্যানুসন্ধান কমিটি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগদানে আইনগত জটিলতা নিরসনে রিভিউ কমিটিও গত এক বছরে করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এসব কমিটির তদন্তে কোনো অগ্রগতি আছে কিনা, সে বিষয়ে বলতে পারছে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুন্সী শামসুদ্দীন আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কমিটিগুলো কাজ করছে। প্রতিবেদন কখন দেবে বলতে পারছি না। এটা আমাদের তদন্ত শাখা আছে, তারা বলতে পারবে।”
তদন্ত শাখার প্রধান ডেপুটি রেজিস্ট্রার আইয়ুব আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে চাননি।
তদন্তের অগ্রগতি জানতে একাধিক কমিটির সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়, যাদের কেউ কেউ ‘কাজ চলমান’ থাকার কথা বলছেন।

ক্যাম্পাসে রাজনীতি চর্চার ধরন ও প্রকৃতি যাচাইয়ের জন্য করা কমিটির সদস্য অধ্যাপক শামীম রেজা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই একটা খসড়া প্রস্তুত করেছি। শিগগিরই জমা দেব।”
জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শিক্ষক-কর্মকর্তা যাচাই বিষয়ক তদন্ত কমিটির প্রধান কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, এ কমিটির কোনো অগ্রগতি নেই। আমরা অনেকের কাছে তথ্য চেয়েছিলাম; তেমন সাড়া পাইনি। আমরা এখন বিভাগের চেয়ারম্যানদের পাশাপাশি সাদা দলকে চিঠি দেব, তারা যেন তথ্য প্রমাণসহ আমাদের কাছে তথ্য পাঠায়।
কর্মকর্তাদের বৈষম্যের শিকার হওয়ার বিষয়ে যে তদন্ত কমিটি হয়, সেটির আহ্বায়ক হিসেবে আছেন ফার্মেসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক সেলিম রেজা, যিনি আইন বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আনা অভিযোগও তদন্ত করছেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাকে দুটি কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা পাঁচ দিন আগে একটার প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। আরেকটার কাজ চলছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬ বছরের ‘ইমেরিটাস ও সুপারনিউমারি’ অধ্যাপক নিয়োগ সংক্রান্ত কমিটির সদস্য হিসেবে আছেন মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক এবিএম শহিদুল ইসলাম।
তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে কথা বলতে এ অধ্যাপককে তার কার্যালয়ে গিয়েও পাওয়া যায়নি। সাড়া মেলেনি একাধিকবার ফোন দিয়েও।
বিগত ১৬ বছরের শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি তদন্তে যে কমিটি করা হয়েছে, তার প্রধান হিসেবে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক তাজমেরী এস ইসলাম। এ কমিটির অগ্রগতি জানতে একাধিক বার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি।
সম্মানীতে ব্যয় ১০ লাখ
বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালক দপ্তর বলছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পর যে ১৮টি তদন্ত কমিটি হয়েছে, তাতে ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে কমিটির সদস্যদের সম্মানী বাবদ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুন্সী শামসুদ্দীনও ১০ লাখ টাকা ব্যয় হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে কোন কমিটিতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলতে পারেননি।
তিনি বলছেন, “সামনে প্রয়োজন হলে টাকা আরও নিতে হতে পারে। তবে মোট কত টাকা লাগতে পারে, সে বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।”

প্রতিবেদন দেওয়া কমিটি নিয়েও বিতর্ক
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চলতি বছরের ১৭ মার্চ ১২৮ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যদিও এ প্রতিবেদনকে ‘পূর্ণাঙ্গ’ মনে করছেন না ছাত্র সংগঠনের কোনো কোনো নেতা।
১৫ জুলাই থেকে ৫ অগাস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে এসব শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ কমিটি ছাত্রলীগের ১২৮ জনকে বহিষ্কার করলেও তাদের প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। তারা ফ্যাসিবাদের অবসান করতে পারেনি।”
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের সদস্য সচিব জাহিদ আহসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গ নয়। যারা নারীদের প্রকাশ্যে হামলা করেছে, তাদেরকে চিহ্নিত করা যায়নি।
“অনেককে লুকিয়ে লুকিয়ে পরীক্ষা নিয়ে আলাদাভাবে পাস করার সুযোগ করে দিয়েছে। এটা জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া কিছুই না।”
এ কমিটির প্রতিবেদনকে ‘অসম্পূর্ণ’ দাবি করে এ বছরের মার্চে ‘ছায়া তদন্ত কমিটি’ গঠন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী।
কমিটির সদস্য রেজোয়ান আহমেদ রিফাত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তে অনেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর নাম বাদ পড়েছে। মেয়েদের হলে যারা হামলা করেছে, তাদের কোনো নাম নেই।
“মহসিন হলের কোনো ছাত্রলীগ কর্মীর নাম নেই। আমরা মনে করি, তাদের এ প্রতিবেদন সম্পূর্ণ নয়। তাই আমাদের এ ছায়া তদন্ত কমিটি করা। আশা করি, আগামী মাসের মধ্যে এর প্রতিবেদন প্রকাশ করব।”
এ কমিটির সদস্যরা বলছেন, প্রতিবেদন জমা দিলেও তারা এ নিয়ে এখনও কাজ করছেন। সেখানে কারো নাম বাদ পড়লে তা অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
কমিটির সদস্য আইন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুফন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা যে প্রতিবেদন দিয়েছি, সেটা নিয়ে আবারও কাজ শুরু করেছি। আমরা তো কারো নাম ইচ্ছে করে দিয়ে দিতে পারি না। যাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছি, তাদের নাম দিয়েছি।”

যা বলছে ছাত্রসংগঠনগুলো
জুলাই আন্দোলনের এক বছর পরও তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ছাত্রসংগঠন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের সভাপতি এস এম ফরহাদ বলেন, “এক বছরেও প্রতিবেদন দিতে না পারাটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা। এ দায় ভার তাদের আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের সদস্য সচিব জাহিদ আহসান বলেন, “এটা প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা। এক বছর পরও ফ্যাসিবাদী ও তাদের দোসরদের বিচার করতে না পারাটা অভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা করা।”
ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান বলেন, “গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রশাসনিক কাঠামো, সেখানে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফলে ফ্যাসিবাদের বিদায় হলেও তাদের ‘অর্গানগুলো’ এখনো বিভিন্নভাবে বিদ্যমান। তাই ১৮টি তদন্ত কমিটি হলেও সেগুলো থেকে কোনো ফল আসেনি।”
ঢকা বিশ্ববিদ্যালয় বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি নূজিয়া হাসিন বলেন, “৫ অগাস্টের পর আমরা চেয়েছিলাম সংস্কার ও বিচার। কিন্তু আমরা দেখেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সে সংস্কার ও বিচারের নামে আমাদের মুলা ঝুলিয়েছে। তাই ১১ মাসে ১৮টি তদন্ত কমিটি আমাদের সামনে প্রতিবেদন হাজির করতে পারেনি, যা এ প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা।”
যা বলছে প্রশাসন
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ বলেন, আমাদের বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন হাতে চলে এসেছে। কয়েকটি আমরা ইতোমধ্যেই সিন্ডিকেটে পাস হয়ে এসেছে। বাকিগুলো আসছে।”
উপাচার্যের ভাষ্যমতে, প্রতিবেদন দেওয়া কমিটিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে করা তদন্ত কমিটি, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজির আহমেদের পিএইচডি ডিগ্রি সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি এবং ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের বিষয়ে করা তদন্ত কমিটি।
তবে একাধিক সিন্ডিকেট সদস্য বলছেন, ৫ আগস্টের পর গঠিত তদন্ত কমিটিগুলো মধ্যে একটি বাদে আর কোনো প্রতিবেদেন সিন্ডিকেটে আসেনি।