মাসে ১৪,৫০০ টাকা বেতন, ছেলের এসএসসির ফরমও পূরণ করতে পারেননি পোশাক শ্রমিক নাসিমা
দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে পোশাকশ্রমিকদের একটি অংশ এখন ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। তবে মালিকদের বক্তব্য, মজুরি বাড়াতে হবে শিল্পের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে।
আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে ভোর শুরু হয় কারখানার বাঁশির শব্দে। নাসিমা আক্তারের দিন শুরু হয় তারও আগে। সংসারের কাজ সেরে ছুটতে হয় কারখানায়। সেখানে তিনি সুইং অপারেটর। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মেশিনের সামনে বসে একটার পর একটা পোশাক সেলাই করেন।
দীর্ঘ সময় মেশিনের সামনে বসে কাজ করতে করতে শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা সমস্যা। পিঠের ব্যথার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চোখের ক্লান্তি। শরীরও আর আগের মতো সায় দেয় না।
এত পরিশ্রমের পর মাস শেষে তার হাতে আসে মাত্র ১৪ হাজার ৫০০ টাকা।
ছয় সদস্যের সংসারের খরচ চলে এই টাকায়। বৃদ্ধ বাবা-মা, ছোট ভাই-বোন এবং নিজের সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্বও তার কাঁধে। চাল, ডাল, তেল, সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং বাড়িভাড়া মেটাতেই প্রায় পুরো বেতন শেষ হয়ে যায়।
এরপর জরুরি প্রয়োজনেও খরচ করার মত টাকা থাকে না। সংসারের এই টানাপড়েনের প্রভাব পড়ছে সন্তানদের ভবিষ্যতেও।
বড় মেয়েকে টাকার অভাবে কলেজে ভর্তি করাতে পারেননি নাসিমা। মেজো ছেলের এবার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও ফর্ম ফিলাপের টাকা জোগাড় করতে না পারায় তার পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। টাকার অভাবে ছোট ছেলেকে ভর্তি করিয়েছেন মাদ্রাসায়। সেখানেও তার পড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নাসিমা।
তিনি বলেন, “মাস শেষে যে সাড়ে ১৪ হাজার টাকা বেতন পাই, তা হাতে পাওয়ার আগেই বাজারের বাকি আর ঘরভাড়ায় শেষ হয়ে যায়।”
কয়েক বছর আগে দুর্ঘটনায় তার রিকশাচালক স্বামী শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এরপর সংসার চালানোর পুরো দায়িত্ব নিতে হয় নাসিমাকে।
"ছেলেমেয়েদের একটু ভালো খাবার বা খাতা-কলম কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও অনেক সময় থাকে না," বলতে বলতে গলা ভারী হয়ে আসে নাসিমার। তিনি বলেন, "সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে একবারও সন্তানদের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে পারি না।"
ছয়টি প্রাণের দায়িত্ব একা কাঁধে নিয়ে প্রতিদিন তাকে এক অনিশ্চিত লড়াই করতে হচ্ছে। তাই ‘বাধ্য হয়ে’ আন্দোলনে নামার কথা বললেন নাসিমা।
বড় মেয়েকে কলেজে ভর্তি করাতে না পেরে তার জন্য একটা কাজ জোগাড় করতে বিভিন্ন কারখানায় ঘুরেছেন তিনি। কিন্তু টাকা ছাড়া কেউ চাকরি দিতে চায় না বলেও অভিযোগ করলেন।
সারামাস জুড়ে পরিশ্রমের পর এমন অর্থকষ্ট কেবল নাসিমার নয়। গাজীপুর, আশুলিয়া ও সাভারসহ দেশের অধিকাংশ পোশাক শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান এমনই।
মূল্যস্ফীতির বাজারে এই অঙ্কের বেতনে একজন শ্রমিকের পক্ষে কোনোরকম জীবিকা চালানোই কষ্টকর, সেখানে পুষ্টির জোগান কিবা সন্তানের ভালো শিক্ষা তাদের কাছে আকাশকুসুম চিন্তা।
টানাপড়েনের এই জীবনে বছরের পর বছর চাকরি করেও ভবিষ্যতের জন্য কোনো সঞ্চয় জমে না; সে কথাই বলছিলেন লাইলী বেগম।
আশুলিয়ার জামগড়ার একটি পোশাক কারখানার অপারেটর তিনি। ১৩ বছর ধরে সেখানে কাজ করছেন। এত বছরেও এক টাকা সঞ্চয় করতে পারেননি।
লাইলী বলেন, “কারখানার মালিকরা আমাদের নির্যাতন করে না। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, এই সামান্য ১৫ হাজার ৫০০ টাকা বেতন দিয়ে কিছুই হয় না।
“বেতনের পুরোটা চাল আর বাসাভাড়াতেই চলে যায়। বাচ্চারা অসুস্থ হলেও টাকার অভাবে ভালো ডাক্তার দেখাতে পারি না।"
স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে ফেলে রেখে চলে গেছেন। এক ছেলে, এক মেয়ে আর অসুস্থ মাকে নিয়ে লাইলীর সংসার। সেই সংসারে একমাত্র উপার্জনকারী তিনি।
"টাকার অভাবে মায়ের চিকিৎসাও করতে পারছি না। আমাদের বেতন না বাড়লে এই সামান্য টাকায় কীভাবে চলব? ন্যূনতম ত্রিশ হাজার টাকা পেলে এই বাজারে মোটামুটি চলা যাবে। তাই বাধ্য হয়ে আমরা বেতন বাড়ানোর আন্দোলনে নেমেছি।"
তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে। ওই সিদ্ধান্ত ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়।
তখন নিম্নতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছিল। অর্থাৎ মজুরি বেড়েছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে কয়েকদিন ধরেই রাজধানী ঢাকাসহ সাভার ও আশুলিয়ায় এবং গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন।
আন্দোলন ও সহিংসতার মধ্যে রোববার সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটির হিসাবে, এতে প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কাজ করতে পারেননি।
সোমবারও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন ও উৎপাদন বন্ধের খবর পাওয়া গেছে। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
৩০ হাজার টাকাই কেন?
মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘদিন ধরেই শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে। ২০২২ সালের অগাস্ট থেকে মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম ছিল।
এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে গত জুলাই মাস থেকে। ১১ বছর পর চালু হওয়া এই কাঠামোয় বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়ে দ্বিগুণ বা তার বেশি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। স্বাভাবিকভাবে বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।
অন্যদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে তৈরি পোশাক শিল্পে। জ্বালানির মূল্য ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানি কার্যাদেশ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও মালিকদের একাংশ বলছেন, শিল্পের বর্তমান সক্ষমতা বিবেচনা না করে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি কার্যকর করা কঠিন।
এমন বাস্তবতায় পোশাক শ্রমিকরা কেন ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছেন?
গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া চৌধুরীবাড়ি এলাকার প্যানাসিয়া গার্মেন্টসের অপারেটর লাকি বর্তমানে ওভারটাইমসহ মাসে ২১ হাজার ৯০০ টাকা আয় করেন। কিন্তু দুই সন্তানসহ চার সদস্যের সংসার চালাতে তাকে প্রতি মাসেই ঋণ করতে হয়।
লাকি বলেন, “কোনো কোনো মাসে বেতন দিতে দেরি হলে পাওনাদারদের তাগাদা শুনতে হয়। বাড়িওয়ালার ভাড়ার জন্যও কথা শুনতে হয়।”
নিজের মাসিক খরচের হিসাব দিয়ে তিনি বলেন, দুই সন্তানের পড়াশোনার জন্য ৩ হাজার টাকা, বাড়িভাড়া ৪ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিল ৪০০ টাকা এবং বাজার খরচ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাগে। এ ছাড়া শিশুদের দুধের জন্য খরচ হয় আরও ৩ হাজার টাকা।
“খরচ মেটাতে গিয়ে আমাদের নাভিশ্বাস উঠে যায়। তাই আমাদের বেতন বাড়ানো দরকার,” বলেন তিনি।
৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি কেন, জানতে চাইলে লাকি বলেন, “মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা হলে কোনোমতে জীবনযাপন করা সম্ভব হবে। এর নিচে হলে সংসার চালানো সম্ভব হবে না। প্রতি মাসেই ঋণের বোঝা টানতে হবে।
“আবার বেশি বেতন দাবি করছি না। বেশি বেতন দিতে হলে মালিকপক্ষের সমস্যা হবে। তারা নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে পারবে না। পরে অচলাবস্থা দেখা দেবে।”
প্রায় একই কথা বললেন আলেয়া টেক্সটাইল মিলসের অপারেটর মো. শাকিল আহমেদ। ওভারটাইমসহ ২১ হাজার ৩০০ টাকার মত আয় হয় তার। এ বেতনে স্ত্রী সন্তানসহ বাবা-মায়ের খরচ চালাতে গিয়ে তার হিমশিম খেতে হচ্ছে।
“দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় খরচ আরও ৮-১০ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। তাই আমাদের বেতন বাড়ানো দরকার। বেতন ৩০ হাজার টাকা হলে ন্যূনতম চাহিদা মেটানো সম্ভব।”
গাজীপুর মহানগরীর নাওজোর এলাকার মাস্টার্স চ্যাম কারখানার নিটিং সুপারভাইজার মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের মূল বেতন ১৫ হাজার ৩০০ টাকা। ওভারটাইমসহ আরও প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। তাই আরিফুলও ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি জানালেন।
‘যুক্তিসঙ্গত’ মজুরি বৃদ্ধির পক্ষে মালিকরা
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় নিয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির উদ্বেগ ছিল। তবে গত কয়েক মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে পোশাক রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময়ের মধ্যে কার্যাদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে রপ্তানিকারকদের।
এর মধ্যে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন ও সহিংসতার কারণে কার্যাদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন মালিকদের কেউ কেউ। তাদের ভাষ্য, শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে, তবে তা হতে হবে ‘শিল্পের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে’।
১৮ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান রয়েছে স্পারো গ্রুপে। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, “এটার একটা যুক্তিসঙ্গত সমাধান লাগবে। এর জন্য প্রথমত শিল্পের সক্ষমতা থাকতে হবে।”
একজন অদক্ষ শ্রমিককে কীভাবে ৩০ হাজার টাকা বেতন দেওয়া সম্ভব, সেই প্রশ্ন তুলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়টি সামনে আনেন তিনি।
শোভন বলেন, “ভিয়েতনামের সঙ্গে আমাদের মজুরির পার্থক্য ৩০ ডলার। কিন্তু ভিয়েতনামের সর্বনিম্ন মজুরির শ্রমিকের দক্ষতা আর বাংলাদেশের একজন শ্রমিকের দক্ষতার পার্থক্যটাও বিবেচনা করতে হবে। কাজেই ৩০ হাজার টাকা বেতন একেবারেই অবাস্তব।”
তাহলে কত টাকা মজুরি হওয়া যুক্তিসঙ্গত? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, মালিকপক্ষ মজুরি বোর্ডে তাদের তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করবে। সরকার ও শ্রমিক প্রতিনিধিরাও নিজেদের তথ্য-উপাত্ত দেবেন। তিন পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতেই মজুরি নির্ধারণ করা উচিত।
রোববার পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান এ বোর্ডের চেয়ারম্যান।
মজুরি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে মালিকদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেলেন শোভন ইসলাম।
তিনি বলেন, “বর্তমান বাস্তবতায় এক পয়সা বেতন বাড়ানোর ক্ষমতাও কোনো মালিকের নেই। কিন্তু বেতন তো কিছু বাড়াতে হবে। এখন কতটুকু বাড়ানো সম্ভব, শিল্পের কতটুকু সক্ষমতা আছে, সরকার আমাদের কোনো ধরনের ভর্তুকি বা সহায়তা দেবে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।”
ওভারটাইমসহ বর্তমানে কোনো শ্রমিকের মাসিক আয় ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকার কম নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
একই ধরনের ভাষ্য শাশা ডেনিমস, শাশা গার্মেন্টস ও শাশা টেক্সটাইলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদের।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক এই সভাপতি বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পোশাকের চাহিদা কমছে। পাশাপাশি ভারত, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও চীনের মতো দেশেও উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।
“ফলে বাংলাদেশের কার্যাদেশ কমছে। এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কোনো প্রান্তিকে দেখা যায়নি। শিল্প এখন একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সারা বিশ্বেই ভোগ কমছে।
“এর মধ্যে আন্দোলন এবং এসব হচ্ছে খালি বাংলাদেশে। অন্য ম্যানুফ্যাকচারিং কোনো দেশে হচ্ছে না। সো, বায়াররা কিন্তু অর্ডার সরিয়ে নেবে।”
এমন বাস্তবতায় সরকারকে ‘যৌক্তিক’ সিদ্ধান্ত নিতে হবে মন্তব্য করে শামস বলেন, “আমরা সবকিছু বুঝতেছি, শ্রমিকদের লিভিং কস্ট বেড়ে গেছে। তাদের বেতনও লাগবে। বাট গভমেন্ট শুড বি র্যাশনাল।”
দক্ষ শ্রমিকদের বেতন বেশি
শামস মাহমুদ বললেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দক্ষ শ্রমিকদের তুলনামূলক বেশি বেতন দিয়ে ধরে রাখতে হয়।
তার ভাষ্য, পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের বিভিন্ন গ্রেড রয়েছে। নতুন ও অনভিজ্ঞ শ্রমিকেরা সাধারণত সর্বনিম্ন মজুরির কাঠামোয় নিয়োগ পান। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বেতনও বাড়ে।
“একজন নতুন শ্রমিক, যার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তাকে আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়োগ দিই। এর ওপরের গ্রেডগুলোর বেতন অনেক বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০ হাজার, ৬০ হাজার, এমনকি ৭০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। একটি কারখানার মোট শ্রমিকের ৫ থেকে ১০ শতাংশ থাকেন এই প্রবেশপর্যায়ের শ্রমিক।”
শামস মাহমুদ বলেন, “এই মূল বেতন দিয়ে আপনি শ্রমিক ধরে রাখতে পারবেন না। তাই আমরা বেশি বেতন দিই। প্রকাশ্যে যে তথ্য আসছে, সেটিই পুরো বাস্তবতা নয়।”
বাংলাদেশ থেকে দক্ষ শ্রমিকদের জর্ডান ও মরিশাসের মত দেশে চলে যাওয়ার কথাও বলেন তিনি। তাদের ধরে রাখতে মালিকদের আরও বেশি বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দিতে হচ্ছে বলে দাবি করেন।
সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করায় এখন আলোচনার মাধ্যমে দাবি নিষ্পত্তি করা উচিত বলে মনে করেন শামস মাহমুদ। তার মতে, বোর্ডের মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলার সময় সড়কে আন্দোলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
“কারণ এখানে নেগোসিয়েশন হবে, এখানে এক বা দুই মাস টাইম লাগবে, লাগার পরে মজুরি ঘোষণা করবে। সো, এখানে যেটা মনে হচ্ছে এখানে অনেকগুলো এক্সটার্নাল ফ্যাক্টরস কাজ করছে।”
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা, স্থানীয় নির্বাচন ও শহরের ফুটপাত হকারমুক্ত করার মত বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘ভেস্টেড ইন্টারেস্ট’ থাকতে পারে বলে মনে করেন পোশাক খাতের এই উদ্যোক্তা।
এর বাইরেও কারণ থাকতে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা আগেও অনেক সময় দেখেছি যে, যারা বাসা ভাড়া দেয় ওয়ার্কারদেরকে, ওরাও কিন্তু এখানে ইন্ধন জোগায়। কারণ ওদের স্যালারি বাড়লে ওরা (বাড়িওয়ালা) পরের দিন ভাড়া বাড়ায়।
“আসল কথা হল, যেহেতু সরকার মজুরি বোর্ড ঘোষণা হয়েছে। এখন এটা নিয়ে টেবিলে আলোচনা হওয়া উচিত, রাস্তায় না।”
আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক কারণ দেখছেন স্পারো গ্রুপের শোভন ইসলামও। তিনি বলেন, “তাণ্ডবটার কারণ কী? এটার সাথে তো আমার মনে হয় না কোনো মিনিমাম ওয়েজ কিংবা ওয়েজের কোনো ধরনের সম্পর্ক আছে। এটা সম্পূর্ণভাবে একটা রাজনৈতিক সমস্যা।
“এখানে প্রচুর পরিমাণ বাইরের ইন্ধন আছে এবং এখানে প্রচুর পরিমাণ আমাদের ফেডারেশনগুলোর ইন্ধন আছে। আমাদের ৮২টা ফেডারেশন, এরা মুখে যত কথাই বলুক, আমার কাছে স্পেসিফিক প্রুফ আছে যে তাদের অফিসে বসে প্রত্যেকদিন রাতে বেলা এগুলো প্ল্যানিং হয়।”
তবে সবকিছুর পরও যে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো দরকার, সে কথা মানছেন মালিকরা। একইসঙ্গে তারা সতর্ক করে বলছেন, এ খাত চাপে পড়লে দেশের অর্থনীতি আর শ্রমিকরাও বিপাকে পড়বে।
কাজে ফেরার আহ্বান বাবুলের
আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন নতুন মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার।
রোববার বিকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, “শ্রমিক ভাইদের অনুরোধ করছি, আপনারা কাজে ফিরে যান এবং নিয়মিত কাজে যোগ দিন। অন্য কারও উসকানি বা প্ররোচনায় পা দিয়ে নিজেদের শিল্পকারখানা ধ্বংস করবেন না।
“এই শিল্প আপনাদের জন্যও দরকার, সরকারের জন্যও দরকার, মালিকদের জন্যও দরকার। আমরা কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্মঘট ডাকিনি। তারপরও কোনো শ্রমিক অন্যায় বা অপরাধের সঙ্গে জড়িত হলে বিপদে পড়লে শ্রমিক ফেডারেশনগুলোকে পাশে পাবেন না।”
শ্রমিকদের মজুরির দাবি বোর্ডের মাধ্যমে আদায়ের আশ্বাস দিয়ে বাবুল আখতার বলেন, শ্রমিক প্রতিনিধিরা একসঙ্গে বসে আলোচনা করে দাবি আদায়ের চেষ্টা করবেন।
ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “আমাদের আহ্বান থাকবে, আমরা এখন থেকে শিল্পে ফিরে যাব, উৎপাদনে ফিরে যাব, ঘরে ফিরে যাব। আমাদের কর্মস্থলে ফিরে যাব। যারা মজুরি বোর্ড গঠনের পরও ইচ্ছাকৃতভাবে সড়ক-মহাসড়কে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, তারা অবশ্যই শ্রমিকের বন্ধু হতে পারে না।”
মজুরির বিষয়টি মজুরি বোর্ড দেখছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বোর্ডের সদস্যরা শিগগিরই বৈঠকে বসবেন।
“যারা শ্রমিক আন্দোলনের নামে শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত, আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে, তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
