দুধের ননী খাচ্ছে কে

“বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেখানে ভুসির দাম আটার চেয়ে বেশি,” বললেন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান হোসেন।

ফয়সাল আতিকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 Nov 2022, 07:48 PM
Updated : 14 Nov 2022, 07:48 PM

সংসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন ঢাকার পীরের বাগের বাসিন্দা নার্গিস আক্তার। কিন্তু গত কয়েক মাসে দুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাচ্চাদের নিয়ে তিনি কষ্টে পড়ে গেছেন।

চার বছর আর তিনমাস বয়সী দুই সন্তানের এই মা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, “বাসায় বাচ্চা আছে, বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি আছে। দিনে অন্তত আধা লিটার দুধ তো লাগে। এখন আড়াইশ মিলির দুইটা প্যাকেট কিনতে লাগে ৫০ টাকা, মাসে দেড় হাজার টাকা। এই বাজারে এত খরচ করে তো পেরে উঠছি না।”

ভোক্তা অধিকার রক্ষায় সরব সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের বাজার মনিটরিং প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত জুলাইয়ের পর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সব কোম্পানির তরল দুধের দাম লিটারে ১০ টাকা করে বেড়ে ৯০ টাকায় উঠেছে। আর ২৫০ মিলিলিটারের প্যাকেটগুলোর ২৫ টাকা করে বিক্রি হওয়ায় প্রতি লিটারের দাম পড়ে যাচ্ছে ১০০ টাকা।

কিন্তু খামারিরা বলছেন, দুধের দাম বাড়লেও তাদের লাভ হচ্ছে না। বিভিন্ন অজুহাতে গত কিছুদিনে গো-খাদ্যের দাম বেড়েছে লাগামহীন। তাতে দুধ উৎপাদনে খরচ বাড়লেও সে অনুযায়ী দাম তারা পাচ্ছেন না। লাভের বড় অংশ যাচ্ছে বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর পকেটে।

অন্যদিকে দুধ বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো বলছে, গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে খামারিদের কাছ থেকে আগের চেয়ে বেশি দামে দুধ কিনতে হচ্ছে। জ্বালানি তেল ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খুচরা দোকান ও বিপণনকর্মীদের লাভের ভাগও বাড়াতে হয়েছে।

এসব বিষয়কেই দুধের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তুলে ধরছে কোম্পানিগুলো। সমবায়ভিত্তিতে পরিচালিত সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা ছাড়াও প্রাণ, ইগলু, আড়ং, আকিজ, আফতাবসহ আরও কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি জাতীয় পর্যায়ে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য বিপণন করে।

গত জুলাই থেকে চার মাসে এসব কোম্পানির প্যাকেটের দুধের দাম ধাপে ধাপে লিটারে অন্তত ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তরল দুধের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গত এক বছরে আমদানি করা গুঁড়ো দুধের দামও বেড়েছে কেজিতে অন্তত ২৫ শতাংশ।

আমদানি করা এ্যাংকর, ডানো, ডিপ্লোমা, রেডকাউ, নিডো ব্র্যান্ডের দুধের মূল্য বিশ্লেষণ করে ক্যাব বলছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি কেজি এ্যাংকর ব্র্যান্ডের দুধ ৬৮০ টাকায় বিক্রি হলেও অক্টোবরে তা বিক্রি হয়েছে ৮৫০ টাকায়।

একইভাবে ডানোর দাম ৬৮০ থেকে বেড়ে ৮৮০ টাকা, ডিপ্লোমার দাম ৬৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৮৮০ টাকা, নিডোর দাম ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে ৮৯০ টাকা, রেডকাউয়ের দাম ৬৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৮৭০ টাকা হয়েছে।

গুঁড়োদুধের চট্টগ্রামভিত্তিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এমএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন মিন্টু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বর্তমানে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানি করা গুঁড়োদুধের বাজার চাপে আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দুধের দাম কিছুটা কমলেও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের বাজার এর সুফল পাচ্ছে না।

“হিসাব করে দেখা গেছে, ডলারের দাম বাড়ার কারণে প্রতিকেজি গুঁড়ো দুধের দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছে। এক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে ছোট কোম্পানির তুলনায় বড় কোম্পানিগুলো দাম বেশি বাড়িয়েছে।”

দেশে গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে খামারিদের তরফ থেকে দুধের বাড়ানোর জন্য ‘চাপ আসে’ জানিয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সে কারণে প্রাণের তালিকাভুক্ত খামারিদের জন্য কালেকশন প্রাইস বাড়াতে হয়েছে। এর বাইরে চলমান জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খুচরা পর্যায়ে, ডিলার পর্যায়ে ও ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়েও মার্জিন বাড়াতে হয়েছে। এই খরচগুলো আমরা সমন্বয়ের চেষ্টা করেছি।”

একই ধরনের বক্তব্য এসেছে দেশীয় আরেক কোম্পানি ব্র্যাক ডেইরির তরফে।

ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের সিনিয়র ডিরেক্টর মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ বৃদ্ধির কারণে আড়ং ডেইরি ২৩ অগাস্ট থেকে দুধের দাম লিটার প্রতি ১০ টাকা বাড়িয়েছে। গবাদি পশুর খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষক পর্যায়ে দুধের উৎপাদন খরচ বেড়েছে।

“তাই কৃষক পর্যায়ে কাঁচা দুধের দাম প্রতি লিটারে ৩ টাকা ৮০ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাঁচামাল- যেমন প্যাকেজিং, কার্টন এবং খুচরা জিনিসপত্রের দাম বাজারে ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দুগ্ধ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ খাতে খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।”

দাম বৃদ্ধির কারণ তুলে ধরতে গিয়ে তিনি এও বলেন, “বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দুধ শীতলীকরণ ক্ষেত্র এবং প্রক্রিয়াজাত কারখানায় আগের তুলনায় অধিক সময় জেনারেটর ব্যবহৃত হচ্ছে।

“জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধিতেও এই খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারের এই পরিস্থিতিতে নতুন মূল্য নির্ধারণে বাধ্য হচ্ছে আড়ং ডেইরি।”

আড়ং ডেইরির স্ট্যান্ডার্ডাইজড দুধ প্রতি ৫০০ মিলির প্যাকেট ৫০ টাকা, ১০০০ মিলির প্যাকেট ৯০ টাকা এবং পাস্তুরিত দুধের দাম প্রতি ৫০০ মিলির প্যাকেট ৫২ টাকা এবং ১০০০ মিলির প্যাকেট ৯৫ টাকা করা হয়েছে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

মাঠের চিত্র কী?

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ১৫২ লাখ টন দুধের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১০৬ লাখ টনের বেশি। এর ৯০ শতাংশ গরুর দুধ। সারা দেশে বাণিজ্যিক খামারের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। 

দেশে তরল দুধের উৎপাদন গত ১০ বছরে বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। এই ধারা বজায় থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশ দুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারবে বলে সরকারের প্রত্যাশা।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে মিল্কভিটার অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক আজিজুর রহমান জানান, তার জেলায় শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া; পাবনার বেড়া ও ভাঙ্গুড়া উপজেলার তালিকাভুক্ত ৭০০ সমবায় সদস্য প্রতিদিন শাহজাদপুরে অবস্থিত মিল্কভিটায় দুধ দেন।

এছাড়াও শাহজাদপুর পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের ১৮টি চিলিং প্ল্যান্ট পয়েন্ট আছে। সেখান থেকেও দুধ সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে সমবায় সমিতির সদস্যরা প্রতিদিন ৪০ হাজার লিটার দুধ দেন। অন্য মাধ্যম থেকে আসে আরও ৪০ হাজার লিটার। দাম দেওয়া হয় প্রতি লিটারে ৪৬ টাকা।

শাহজাদপুর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মারুফ হোসেন জানান, শাহজাদপুরে ৩২২টি প্রাথমিক দুগ্ধ সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব সমিতির গরু থেকে প্রতিদিন ২ লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হয়।

পোতাজিয়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপানকারী সমবায় সমিতির সভাপতি শহিদ আলী জানান, পোতাজিয়া দুগ্ধ সমবায় সমিতির সদস্য সংখ্যা ২৯৫ জন। এখান থেকে প্রতিদিন ৮ হাজার লিটার দুধ দেওয়া হয় মিল্কভিটায়।

এছাড়াও মিষ্টির দোকান, চায়ের দোকান ও বাসাবাড়িতে প্রতি লিটার ৫০ থেকে ৫২ টাকায় দুধ বিক্রি করেন খামারিরা।

সিরাজগঞ্জ শহরের বাজার স্টেশন এলাকার সম্পা সুইটস অ্যান্ড কনফেকশনারির মালিক প্রদীপ কুমার ঘোষ জানান, ব্যাপারী ও খামারিদের কাছ থেকে ৫৫ টাকা লিটার দামে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ মণ দুধ কেনেন তিনি।

বাজার স্টেশন এলাকার চায়ের দোকানি শহিদুল ইসলাম বলেন, ব্যাপারীদের কাছ থেকে ৫৫ টাকা লিটার দামে তিনি প্রতিদিন ২০ কেজি দুধ কেনেন।

আর সদর উপজেলার শিয়ালকোল গ্রামের কেরামত আলী জানালেন, গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে গৃহিণীদের কাছে তিনি ৬০ টাকা লিটার দামে দুধ বিক্রি করেন।

সেই দুধ পাস্তুরিত হয়ে কোনো কোম্পানির লোগোওয়ালা প্যাকেটে ঢুকলেই পাড়ার দোকান থেকে কিনতে লাগছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা।   

নজরদারি নেই

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ডেইরি খাতের কোনো পর্যায়ে কত দাম হওয়া উচিত- এ বিষয়ে সরকারি কোনো নজরদারি নেই। বিশেষ করে গত এক বছরে বেশ কিছু গোখাদ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে ৫০ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়ানো হলেও সেজন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হয়নি।

“তীর, ফ্রেশ, বসুন্ধরা, এসিআই, আকিজের মতো বড় বড় ব্র্যান্ড ও কোম্পানিগুলো গোখাদ্যের বাজারে একক নিয়ন্ত্রণ করলেও সরকারের কোনো সংস্থা তাদের দামের যৌক্তিকতা দেখছে না।”

সারা বিশ্বেই গোখাদ্যের দাম বাড়লেও সেই তুলনায় দেশে একটু বেশি বেড়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেখানে ভুসির দাম আটার চেয়ে বেশি। গম ভুসি, ডাবলি ভুসি, মুগ ডালের ভূসির দাম গত এক বছরে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। চালের কুড়ার কেজি ১১ টাকা থেকে বেড়ে ২০ টাকায় উঠেছে।

“কুড়া ছিল সবচেয়ে কম দামি, এখন সেটা হাতের নাগালের বাইরে। খৈল, সয়ামিল, দাম এক বছর আগে ৪২ টাকা ছিল, সেটা ৬৫ টাকায় উঠে গেলো; এখন আবার সেটা ৫৫ টাকায় এসেছে। সাইলেজ ৮ টাকা থেকে দাম বেড়ে ১২ টাকায় উঠে গেছে।

দুধের দাম বাড়লেও তাতে খামারিদের কোনো লাভ হয়নি বর্ণনা করে ইমরান বলেন, “বিপণন কোম্পানিগুলো দুধের খুচরা মূল্য অনেক বাড়ালেও খামারিদেরকে আগের মতোই দিচ্ছে, ক্ষেত্র বিশেষ ২/৩ টাকা বাড়িয়েছে।

“অথচ গোখাদ্যের দাম ৪০ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। আগে দুধের দাম লিটারপ্রতি ৪০ টাকা থেকে ৪৫ টাকার মধ্যে ছিল। গত ছয় মাস ধরে ৪২ টাকা থেকে ৪৭ টাকার মধ্যে কিনে তারা। অথচ বাজারে খুচরা মূল্য বেড়েছে লিটারে অন্তত ২০ টাকা।”

তবে বাংলাদেশ ডেইরি ডেভেলপমেন্ট ফোরামের প্রচার সম্পাদক মোতাসিম বিল্লাহ বললেন, দুধের দাম বাড়লেও তা খরচ বৃদ্ধির বিবেচনায় ‘অতটা বেশি নয়’। বিশ্বব্যাপী গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের পুষ্টি চাহিদা বিবেচনায় দুগ্ধখাতে ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকারের উচিত গোখাদ্যের দাম কমানো।

“সাধারণত এক লিটার দুধ উৎপাদন করতে আগে ৫০ শতাংশ খরচ খাদ্যে হত। এখন খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই বাবদ মোট খরচের ৭০ শতাংশ চলে যাচ্ছে বলে আমরা দেখতে পেয়েছি। গোখাদ্যের ওপর মনিটরিংটা তুলনামূলকভাবে কম। এখানে সঠিক দামে বিক্রি করা হচ্ছে কি না সেটা সরকারের দেখা উচিত।”

ফোরামের হিসাবে, দেশে মাথাপিছু দৈনিক ২৫০ মিলিলিটার দুধের চাহিদা থাকলেও দেশীয় জোগান থেকে আসছে ১৮০ মিলিলিটার থেকে ২০০ মিলিলিটার পর্যন্ত। চাহিদার বাকি অংশ বাইরে থেকে আনতে হয়। সেজন্য প্রতিবছর ৫০০০ কোটি টাকার গুঁড়ো দুধ আমদানি করতে হচ্ছে। 

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি ইসরাইল হোসেন বাবু]

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক