Published : 15 Jun 2026, 06:08 PM
নোয়াখালী সদরের শ্রীপুর-সোনাপুর গণহত্যা দিবস ১৫ জুন। একাত্তরের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গুলি করে শ্রীপুর, সোনাপুর, মধ্যম করিমপুর ও খ্রিস্টান পাড়ার পূর্ব অংশে অর্ধশতাধিক মানুষকে হত্যা করে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় অসংখ্য বাড়িঘর ও দোকানপাট।
ভয়াল সেই স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন স্বজন হারা অনেকেই। যাদের মধ্যে কারো কারো শরীরে এখনো রয়ে গেছে হানাদার বাহিনীর গুলির ক্ষত। এখনো কারো চোখে ভেসে ওঠে সেদিন বাড়িঘর ছেড়ে প্রাণভয়ে মাইলের পর মাইল পথ পালিয়ে বেড়ার স্মৃতি।
তবে স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও নিহতদের সঠিক তালিকা এবং শহীদ পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহায়তা করা হয়নি বলে অভিযোগ স্বজন হারানো পরিবারগুলোর।
মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে যাদেরই অবদান আছে, রাষ্ট্র হিসেবে প্রত্যেকটা মানুষেরই সেই সময়ের স্বীকৃতি পাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন নোয়াখালী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোমায়রা ইসলাম। এ বিষয়ে সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্যে গণহত্যার কারণ
একাত্তরের এপ্রিলের প্রথম দিকে সোনাপুরে নোয়াখালী স্টেশনের চাকরিরত বিহারী এক স্টেশন মাস্টারকে তার সরকারি বাসায় স্থানীয় কয়েকজন যুবক হত্যা করেন। এ খবর চলে যায় পাকিস্তানি সেনাদের কাছে।
এ ছাড়া আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম প্রধান আসামি ফ্লাইট সার্জেন্ট জহুরুল হকের বাড়ির সোনাপুর গ্রামে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেওয়া ১৯৬৭ সালে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার হন তিনি। ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে বন্দি অবস্থায় পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন তিনি।
সার্জেন্ট জহুরুল হকের বাড়ির পাশে সোনাপুর ও শ্রীপুর গ্রামে তৎকালীন ছাত্রলীগের অনেক নেতার বাড়ি ছিল। যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এসব কারণে পাক হানাদার বাহিনী সোনাপুর-শ্রীপুর গ্রামে আগে থেকেই হামলা পরিকল্পনা করে বলে ধারণা স্থানীয় বাসিন্দাদের।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা জাহেদ হোসেন ও জহির উদ্দিন বলেন, একাত্তরের এপ্রিলের দিকে মুক্তিযোদ্ধারা জেলা পুলিশের অস্ত্রাগার নিজেদের দখলে নিয়ে নেন। এরপর শ্রীপুর গ্রামের জাহেদ হোসেনের ভাইদের মধ্যে একজন অস্ত্রগুলো ট্রাকে করে কোম্পানীগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেন।
যার কারণে পাক হানাদার বাহিনী শ্রীপুরে প্রবেশের সময় প্রথমেই ট্রাকের সহকারী ইয়াসিনসহ জাহের হোসেনের তিন ভাইকে গুলি করে হত্যা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে বর্বরতার চিত্র
শ্রীপুরের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ইব্রাহিম খলিল (৭৫)। একাত্তরের ১৫ জুন বেলা ৩টার দিকে পাক আর্মি গ্রামে প্রবেশ করে তার সহোদর দুই ভাই ও চাচাসহ পাঁচজনকে ঘর থেকে টেনে বাইরে নিয়ে গুলি করে। ঘটনাস্থলে মারা যান বড় ভাই ও চাচা। পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকেন তিনি। হানাদার বাহিনী চলে যাওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেদিন অল্পের জন্য বেঁচে ফেরেন তিনি।
ইব্রাহিম খলিল বলেন, “আমাকে বাড়ি থেকে টেনে এনেছে। ঘরে আমি ছাড়াও আমার আরও দুই ভাই আর আমার চাচাসহ পাঁচজন ছিলাম। ঘরের সামনে থেকে গুলি করা শুরু করে। প্রথম গুলি আমার গায়ে লাগে। এরপর আরও গুলি হয়। ঘটনাস্থলেই আমার চাচা মারা যান।
“তারা চলে গেলে আমি এবং আমার বড় ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। আমার বড় ভাই সেদিন রাতেই হাসপাতালে মারা যান।”

সেদিনের চার বছরের শিশু জহির উদ্দিনের স্মৃতিতে আজো অমলিন সেই ভয়াল ঘটনা। অন্য চার ভাই বোনদের সঙ্গে টানা পাঁচ কিলোমিটার পথ দৌড়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে ওঠেন তারা।
জহির উদ্দিন বলেন, “ওইদিন চার বছর এক মাস সাত দিন আমার বয়স। আমার দাদা তখন হিন্দু এক লোকের রেখে যাওয়া কিছু ঘটিবাটি দিতেছিলেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতেছি।
“এমন সময় পাকিস্তানি আর্মিরা আহম্মদিয়া স্কুলের মাঠে এসে আমাদের প্রতিবেশী তোলা চাচা এবং ওনাদের গাড়ির হেলপার ইয়াছিনকে প্রথমে গুলি করে হত্যা করে। পরে স্কুলের পেছনে তাদের বাড়িতে ঢুকে ওনাদের বড় ভাই আলী হোসেন ও আলী করিমকে হত্যা করে অন্যা বাড়িতে প্রবেশ করে।
“আমার মামা আমাদের ভাই-বোন তিনজনকে বাড়ি থেকে একশ গজ এগিয়ে দেন। ফেরার পথে তাকে ওখানেই গুলি করে হত্যা করা হয়। আমার যে দাদা ঘটিবাটি নামিয়ে দিচ্ছিলেন, তাকেও গুলি করা হয়েছিল কিন্তু উনি মারা যাননি।”
সেখান থেকে মামা বাড়ির দিকে যাওয়ার দুঃসহ সেই স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় জহির উদ্দিনকে। তিনি বলেন, “প্রায় চার সাড়ে চার কিলোমিটার পথ দৌড়াতেছি। তিন থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার দৌড়ে মামার শ্বশুর বাড়ির দিকে গেলে মামিকে ওখানে দেখি।
“মামি তখন আমাদের গিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা দেখালে আমরা পেছনে ফিরি। এর আগে আমরা কেবল সামনে দিকে দৌড়াতেছি।”

তবে সেদিনের শহীদদের সঠিক তালিকা না করার কারণে পরিবারগুলোর মধ্যে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছে বলে জানান তিনি।
শহীদ পরিবারগুলো আরও স্বীকৃতি না পাওয়ায় আক্ষেপ করে জহির উদ্দিন বলেন, “একাত্তরের ১৫ জুন যেসব লোক মারা যান; তার মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়টি পরিবার অন্য এলাকায় যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন বলে মুক্তিযুদ্ধের সনদ নেন এবং তারা ভাতাও পান। বাকি যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবার ভাতা পান না।
“তারা বছরে একবার স্বাধীনতা দিবসে এক-দুইশ টাকার পুরস্কার পেয়ে থাকেন। ওই পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করতেছে। পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তি যখন মারা যায়, তখন সেই পরিবারের কি হাল হতে পারে আপনারা জানেন।”
একাত্তরের এইদিন শ্রীপুর গ্রামের সৈয়দ আহমদের ছেলে চার ছেলের মধ্যে আলী হোসেন, আলী করিম ও আলী হায়দারকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। তবে বেঁচে যান সেই সময় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া জাহেদ হোসেন।
তিনি বলেন, স্থানীয় রেলওয়ে স্টেশনের এক বিহারী স্টেনোগ্রাফারের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আসার তথ্য পেয়ে হানাদার বাহিনী শ্রীপুরের চারদিকে ঘিরে ফেলে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাযজ্ঞ চালায়। এলাকার চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি তাদেরকে সহায়তা করে বলে জানান জাহেদ হোসেন।
সেদিনের সাত বছরের শিশু হেলাল উদ্দিনের বাবাকে সোনাপুরে এবং বাড়িতে এক দাদাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রাণ ভয়ে তারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেন। পরদিন সকালে বাড়ি ফিরে বাবার লাশ দেখেন পান।
হেলাল উদ্দিন বলেন, “হানাদার বাহিনী যখন আমাদের গ্রামে আক্রমণ করে তখন আমার বয়স সাত বছর। আমি অনেকটাই দেখেছি। আমার এলাকার অনেক মানুষ মেরে ফেলেছে তারা। মুক্তিযোদ্ধা দেখেও মেরেছে, অমুক্তিযোদ্ধা দেখেও মেরেছে।

“গান পাউডার দিয়ে বাড়িঘর ও অনেক গাছ জ্বালিয়ে দিয়েছে। মাঠে কাজ করা ট্রাকের ড্রাইভার, হেলপারকেও মেরে ফেলেছে ওরা। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম শুনেছে তাদেরকেও মেরেছে; যারা মুক্তিযোদ্ধার সহকারী তাদেরকেও মেছে। সোনাপুর বাজারে আগুন দিয়েছে।”
বাঙালি রাজাকাররা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের বাড়িতে এসে এক দাদাকে মেরেছে ওরা। তখন আমরা জীবন বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে এক জায়গায় আশ্রয় নিয়েছি। কিছুক্ষণ পরে শুনলাম, আমার বাবাকেও মেরে ফেলেছে।
“তখন আমরা শোকাহত, কি করব। এরপর বলেছে, যারা এলাকার বাইরে ওদের লাশ ক্যাম্পে নিয়ে যাবে। এরপর সকালে বাবার লাশ নিয়ে আসছে। সরাসরি গোরস্তানে দাফন করা হয়।”
সেদিন অন্যদের সঙ্গে হত্যা করা হয় মোশাররফ হোসেন বাবলুর বাবাকেও। অসহায় পরিবারটি এখন চরম কষ্টে দিনযাপন করছে।
মোশাররফ বলেন, “আব্বু মারা যাওয়ার পর আমার আম্মু সরকার থেকে দুই হাজার টাকা ও ২০ কেজি চাল পেয়েছেন। এরপর প্রায় ৫৫ বছর কোনো কিছু পাইনি। কিছুদিন আগে আমরা মুক্তিযোদ্ধা অফিস থেকে উপহার পেয়েছি।”
মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে অবদান আছে, এমন মানুষের স্বীকৃতি পাওয়া প্রয়োজন জানিয়ে ইউএনও হোমায়রা ইসলাম বলেন, “এখানে যদি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কোনো পরিবার থেকে থাকে, সেইসব শহীদ পরিবারের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হবে। প্রশাসনের তরফ থেকে কিছু করার থাকলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।”
স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়ার আগেই শ্রীপুর-সোনাপুরে গণহত্যার সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার পাশাপাশি শহীদ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।