Published : 04 Dec 2025, 12:45 AM
এনইআইআর কার্যকর হতে বাকি আর মাত্র ১২ দিন; এখনো সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় আসতে পারেননি হ্যান্ডসেট বাজারের বড় অংশীদার ‘গ্রে মার্কেটে’র ব্যবসায়ীরা।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মোবাইল আমদানিতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তার পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে কেউ কোনো কথা বলছে না, অথচ কয়েকশ কোটি টাকার অবিক্রিত ফোন রয়েছে তাদের হাতে।এসব হ্যান্ডসেটের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আছেন গ্রে মার্কেটের কয়েক হাজার ব্যবসায়ী।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর দেশে কার্যকর হতে যাচ্ছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্ট্রার বা এনইআইআর। মোবাইল হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের এই বাধ্যবাধকতা কার্যকর হওয়ার পর কেবল সরকার অনুমোদিত বৈধ হ্যান্ডসেটই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে পারবে।
তবে ১৬ ডিসেম্বরের আগে নেটওয়ার্কে সচল থাকা কোনো হ্যান্ডসেটই বন্ধ করা হবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।
এনইআর চালুর ফলে বিপদে পড়তে যাচ্ছে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা হ্যান্ডসেটের ব্যবসা বা ‘গ্রে মার্কেট’।
সরকারি হিসেবেই দেশের বর্তমান হ্যান্ডসেটের বাজারে গ্রে মার্কেটের হিস্যা ৬০ শতাংশের বেশি। আর গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বলে থাকেন, তাদের হিস্যা ৯০ শতাংশের বেশি।
দেশে স্মার্টফোন আসার পর থেকে গত এক যুগের বেশি সময় ধরে সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নাকের ডগায় গড়ে ওঠা এই বাজার এখন বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ঢাকা শহরে বড় বড় সব বিপণী বিতানে রয়েছে তাদের সুসজ্জিত ‘শো রুম’।

বিগত আওয়ামী সরকারের আমলেও এনইআইআর চালুর চেষ্টা করে পরে পিছু হটে টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। এবারও সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় মাঠে নেমেছে ‘গ্রে মার্কেট’।
তাদের ভাষ্য, ‘গুটি কয়েক লোককে সুবিধা দিতে’ গ্রে মার্কেটের কয়েক লাখ লোকের রুজি-রুটি নিয়ে টান দিচ্ছে সরকার। গ্রে মার্কেটে ‘টানা পার্টির’ হ্যান্ডসেটের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে দেশের বাজারে দাম বেড়ে যাওয়াসহ ‘মনোপলি’র শঙ্কাও করছেন এনইআইআর এর বিরোধিতাকারী গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে বিটিআরসি এবার এনইআইআর চালু করতে জোট বেঁধেছে দেশীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীদের সঙ্গে। মোট ১৭টি কোম্পানি এখন দেশে ফোন তৈরি করছে। তাদের কাছ থেকেই টাকা নিয়ে এই দফায় এনইআইআর বাস্তবায়নে নেমেছে সরকার।
সরকার ও দেশীয় উৎপাদনকারীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা যেন বৈধ পথে মোবাইল আমদানি করতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি দেশের বাজারে এরই মধ্যে যে ফোনগুলো এসেছে, সেগুলো বৈধ করার ব্যবস্থা করা হবে।
তবে সরকার ও তাদের মিত্র স্থানীয় মোবাইল উৎপাদনকারীদের কথায় আস্থা রাখতে পারছেন না গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। তারা টানা কর্মসূচি ও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
বুধবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের সচিবালয়ের অফিসে কক্ষে এনবিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়য়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং বিটিআরসির মধ্যে ‘বৈধভাবে মোবাইল ফোন আমদানির শুল্কহার কমানোর বিষয়ে’ সভা হয়েছে। সেই সভায় মোবাইলের আমদানি শুল্ক কমানোর পাশাপাশি মোবাইল উৎপাদন খাতেও ভ্যাট ও কর কমানোর সিদ্ধান্ত হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় স্মার্টফোনের বৈধ আমদানি শুল্ক ‘উল্লেখযোগ্য হারে’ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে বৈধ পথে মোবাইল আমদানির শুল্ক প্রায় ৬১ শতাংশ।
আমদানি শুল্ক কমালে বাংলাদেশের ১৩-১৪টি কারখানায় উৎপাদন করা মোবাইলের শুল্ক-ভ্যাটও কমাতে হবে, তা না হলে কোম্পানিগুলোর বিদেশি বিনিয়োগ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আমদানি এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের শুল্ক কমানো এবং তা সমন্বয় নিয়ে বিটিআরসি এবং এনবিআর যৌথভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে একাধিকবার বসেছে এবং দ্রুততার সাথে কাজ শুরু করেছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

সেখানে বলা হয়, “আলোচনার ফলাফল দেশের ডিভাইস ইন্ডাস্ট্রির অনুকূল আসবে বলে মন্ত্রণালয় বিশ্বাস করে।”
তবে বিশ্বাস রাখতে পারছেন না গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। তারা এর মধ্যেই সংবাদ সম্মেলন, কয়েক দফা মানববন্ধন এবং সড়ক অবরোধের মত কর্মসূচিও পালন করেছেন। তাদের কর্মসূচি থামাতে তাদের শীর্ষনেতাসহ মুখপাত্রকে মধ্যরাতে ডিবি পরিচয়ে ধরে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরে অবশ্য ডিবি তাদের ছেড়ে দিয়েছে।
দেশের ‘আন অফিসিয়াল’ মোবাইল বিক্রেতাদের সংগঠন মোবাইল বিজনেস কমিউনিটির সভাপতি মো. আসলাম বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কোথায় কী হচ্ছে আমাদের তো কেউ কিছু জানাচ্ছে না। কোথাও আমাদের ডাকা হচ্ছে না, আমাদের সঙ্গে এখনো কেউ বসেইনি।”
এর মধ্যেই দেশের বাজারে ঢুকে পড়া অবিক্রিত ফোনগুলোর বৈধতা দেওয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হলেও সেরকম কোনো উদ্যোগ এখনো শুরু হয়নি বলেন জানান মো. আসলাম।
তিনি বলছেন, “আমাদের সাথে কোন আলোচনা হয়নি। আমাদের কোন রোডম্যাপ দেয়নি, এদিকে বাকি আছে আর মাত্র ১২দিন।”
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় অবশ্য বলেছে, ১৬ ডিসেম্বরের আগে বাজারে অবৈধভাবে আমদানি করা স্টক ফোনগুলোর মধ্যে যেগুলো আইএমইআই নম্বর আছে, সেগুলোর তালিকা বিটিআরসিতে জমা দিয়ে ‘হ্রাসকৃত শুল্কে’ সেগুলোকে বৈধ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ নিয়ে এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে ‘ক্লোন’ ফোন এবং ‘রিফারবিশড’ ফোনের ক্ষেত্রে এই সুবিধা দেওয়া হবে না।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতদিন যে ফোনগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটি আইএমইআই নম্বরে অনেকগুলো করে ফোন তৈরির প্রবণতা রয়েছে। এগুলোকেই ক্লোন ফোন বলা হচ্ছে।
বিটিআরসি জানিয়েছে, ১৫টি এক বা ১৫টি ৯ এরকম একেকটি আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে কয়েক লাখ করে ফোন তৈরি হয়েছে। এগুলোকে নতুন করে জায়গা করে দিতে চায় না সরকার।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর মধ্যেই বিপুল পরিমাণে ক্লোন ফোন বাজারে রয়েছে। সেই ফোনগুলোর ভবিষ্যত নির্ধারণ না হলে তারা তা মেনে নেবেন না এবং এই ক্ষতি অনেক খুচরা ব্যবসায়ী পোষাতেও পারবেন না।
গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ী নেতা মো. আসলাম বলেন, “হ্যান্ডসেটের মার্কেটে আমাদের মার্কেট শেয়ার হচ্ছে ৯০ শতাংশ। আর আমরা যে প্রডাক্টটা বিক্রি করে আসছি, সেটাকে এখন উনারা বলছেন অবৈধ। অথচ আমরাও ট্যাক্স-ভ্যাট দিয়ে ব্যবসাটা করতে চেয়েছি।
“১০ থেকে ১৫ লাখ ব্যবসায়ী রয়েছে এখন এই ব্যবসায়। পুরো দেশেই তো আমাদের প্রোডাক্ট যায়। এখন সরকার আমাদের কথা না শুনেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল।”