Published : 13 Jul 2026, 12:47 AM
পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের আড়তের পেছনের গলিটি হল ঈশ্বরচন্দ্র ঘোষ স্ট্রিট, যা কলাপট্টি নামে পরিচিত। এখানকার কলার আড়তে আসে পাবনা, ফরিদপুর, নরসিংদী থেকে কাঁচা সাগর কলা ও চম্পা কলা।
আগের দিন সকালে বায়না দিয়ে গেলে, ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যেই তারা কলা পাকিয়ে সরবরাহ করে।

শুধু বাদামতলীর এই আড়তেই নয়, কারওয়ান বাজার, তেজতুরি বাজার, যাত্রাবাড়ী ও টঙ্গীর আড়তে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কাঁচা কলা পাকিয়ে সরবরাহ করে আসছেন আড়তদাররা।
প্রচলিত পদ্ধতি কলাসহ অন্য ফল পাকানো যায়। কিন্তু রাতারাতি পাকানো হচ্ছে কীভাবে?
দ্রুত কলা পাকানোর বিষয়ে বাদামতলীর কলাপট্টির কয়েকজন শ্রমিক বলছিলেন, তারা রাসায়নিক ব্যবহার করেন। কেউ কেউ রাসায়নিক ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেছেন, প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করেন বলে তাদের দাবি।
কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে কেন পাকানো হচ্ছে কলা? এই কলা খেলে কী ধরনের শারীরিক সমস্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারে মানুষ?
বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কলা পাকাতে রাইপেন ব্যবহার করা হয়। এটি এক ধরনের হরমোন। এতে থাকে ইথোফেন নামের রাসায়নিক পদার্থ। সীমিত মাত্রায় এর ব্যবহার অনুমোদিত। তবে তা ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে।
এছাড়া নিষিদ্ধ কীটনাশক ডিডিটিও ব্যবহার করা হয় কলায়।
জনস্বাস্থ্যবিদ বলছেন, রাসায়নিক ব্যবহারের ধীরে ধরে কিডনি, লিভারসহ মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কয়েক ঘণ্টায় পেকে যাচ্ছে কলা
রাসায়নিক ব্যবহারের বিষয়ে কলা আড়তের শ্রমিকরা বলছেন, কাঁচা কলা অন্ধকার বদ্ধ ঘরে স্তুপ করে রাখা হয়, যেখানে সেই স্তুপের ওপর রাসায়নিক মেশানো পানি ছিটিয়ে দেওয়ার পর ত্রিপল বা মোটা চট দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়, যাতে বাতাস ঢুকতে না পারে। এতে এক রাতের মধ্যে কলায় হলুদ রং চলে আসে।
বুধবার সকালে কলা কিনতে বাদামতলীর কলাপট্টিতে আসেন রাজধানীর পল্টন মোড়ের ব্যবসায়ী আবু সালেক। সেখানেই তার সঙ্গে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কথা হয়।
তিনি বলেন, “এটা নতুন কিছু নয়। শুধু কলা নয়, সব ফল-পেঁপে, কলা, আম সব কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো হচ্ছে।
“কেমিক্যাল না দিলে দ্রুত পঁচে যায়। এটা ছাড়া কলাও সুন্দর লাগে না। দাগওয়ালা, কালো স্পটেরগুলো তো কাস্টমাররা কিনেন না।”
কলাপট্টির আড়তদার মের্সাস সাঈদ এন্টারপ্রাইজের সামনে চকচকে হলুদ কলার স্তুপ দেখা যায়, এগুলো বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে। পেছনে রয়েছে সবুজ কাঁচা কলা।
সাঈদ এন্টারপ্রাইজের বিক্রয় কর্মী শোয়েবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কলার সংখ্যা বেশি হলে একদিন আগেই অর্ডার করতে হবে। যেমন ধরেন, কেউ যদি ৪০০ বা ৪৫০ কলা নেয় তাহলে আগের দিন সকালে বায়না দিয়ে যেতে হয়।”
একদিনের মধ্যে কীভাবে কলা পাকানো হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা দুপুরে বা সন্ধ্যায় পলিথিন দিয়ে পাকায় দিই। ভিতরে হিট দিলে হাওয়া তৈরি হয়। সকালেই পেকে যায়।”
কোনো রকম রাসায়নিক ব্যবহারের কথা স্বীকার করেননি তিনি।
শোয়েবুর বলেন, “পলিথিন দিয়ে ঢাইক্যা আমরা ‘স্টোভ’ করি, মানে আগুন দিই। তবে ওইটা (রাসায়নিক দিয়ে পাকানো) বিভিন্ন জায়গায় হয়। কেমিক্যালের সঠিক নামটা বলতে পারি না।
“আগে হইতো এইখানে। ড্রামের ভেতর ওষুধ থুইয়্য পানি দিয়া ধুইত। এখন ওরকম নাই। দেওয়া হয় না ওইটা। বড় বড় আড়তে হয় এগুলো। এখন আমরা পলিথিন দিইয়্যা ঢাইক্যা ভিতরে স্টোভ ধরাই দিই। ভিতরে হিট হইয়া ওগুলো পাইক্যা যায়।”
আরেকটি কলার আড়তের শ্রমিক রসুল মিয়া রাসায়নিক ব্যবহার করে কলা পাকানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “ওষুধ ছাড়া পাকে না। কেউ কেউ ড্রামে চুবায়। কেউ ওষুধ মেশানো পানি ছিটিয়ে মোট পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে রাখে।”
সাঈদ এন্টারপ্রাইজের আড়তের পাশে একটি পরিত্যক্ত ভবনে নিচ তলায় কাঁচা কলার স্তুপ। সেটা দেখিয়ে রসুল বলেন, “এসব কলা একদম কাঁচা। যখন অর্ডার আসবে পাকানো হয়। ছয় থেকে সাত ঘণ্টা আগে অর্ডার করলে আমরাই পাকিয়ে দিই।”

কলা বেচাকেনায় পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আসল পাকানো কলা আর রাসায়নিক মেশানো পানি ছিটিয়ে পাকানো কলা হাতে ধরলেই বুঝতে পারেন তিনি।
“আসল পাকনা কলার খোসা পাতলা। ভিতরে গোটা গোটা থাকবে না।”
টঙ্গীর চেরাগ আলী বাসস্ট্যান্ডে নেমে মহাসড়কের পূর্ব পাশের খাঁ-পাড়া রোডে রয়েছে শরীফ কলার আড়ত। আরেকটু ভেতরে (হেঁটে গেলে ১০ মিনিটের মতো) গেলে আরেকটি কলার আড়তের দেখা মেলে। খাঁ-পাড়া রোডের মুখ থেকে পুর্ব দিকে সোজা ভেতরে কিছু দূর গেলে দক্ষিণ দিকের রাস্তাটি মোল্লা বাড়ি রোড নামে পরিচিত। মোল্লা বাড়ি রোড ধরে সোজা এগোলেই মোল্লা সুপার মার্কেট। এই মার্কেটের ঠিক পেছনেই রয়েছে চেরাগ আলী কলার আড়ত।
ঢাকা উত্তর ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের একটি বড় কলার বাজার চেরাগ আলী এলাকা। বিকালে উত্তরবঙ্গ থেকে ট্রাকে করে কাঁচা ও অপরিপক্ক কলা এখানকার আড়তগুলোতে আসে।
গেল ৭ জুলাই সন্ধ্যায় এ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খাঁ-পাড়া রোডের মোল্লা মার্কেটের পেছনে কলার আড়তে কাঁচা ও অপরিপক্ক কলা স্তুপ করে রাখা। সেখানো ছিটানো হচ্ছে আঁশটে গন্ধযুক্ত পানি।
এই এলাকায় কলা পাকানোর সঙ্গে যুক্ত এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিকালে কাঁচা কলা স্তুপ করা হয়। ড্রামের পানিতে কেমিক্যাল মিশাই। এরপর কলার ছড়াগুলো চুবিয়ে রাখি। তারপর পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। চামড়া হলুদ হয়ে গেলে সকালে দোকানো রাখা হয়।”
খাঁ-পাড়া রোডের কলার আড়তদার আফজাল হোসেন কলায় রাসায়নিক মেশানোর কথা স্বীকার করে বলেন, “কলার চাহিদা বেশি থাকে। কম সময়ের মধ্যে কলা পাকানোর জন্য কিছু কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়।”
কারওয়ান বাজারের ফলপট্টি এবং তেজতুরিবাজার রেললাইনের পাশে কলার আড়ত রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে মাঝরাতেই এখানে ট্রাকে করে কলা আসে।
এখানে জায়গার স্বল্পতা থাকায় আড়তদাররা ট্রাকেই কলার ওপর রাসায়নিক ছিটিয়ে দেন। অনেক সময় কাঠের বড় বড় বাক্সের ভেতর রাসায়নিক ছিটিয়ে দিয়ে ভেতরটা ‘গ্যাস চেম্বার’ বানিয়ে ফেলছেন।
রবিবার ও সোমবার রাত ১০টায় তেজতুরি বাজারের একটি আড়তে গিয়ে দেখা গেছে, পেছনে ছোট্ট চায়ের দোকান, ওপরে সাইনবোর্ডে লেখা টিএম ফ্যাশন মার্ট। চায়ের দোকানের পাশে জানালাহীন একটি অন্ধকার গুদাম। ওই গুদামে সবুজ কাঁচা কলার স্তুপ।
চা দোকানি কলার স্তুপ দেখিয়ে বলেন, “সব কাঁচা। গাছ পাকনা একটাও পাবেন না। সকালেই এসে দেখবেন সব হলুদ হয়ে যাবে।”
আড়তে কাজ করা মধ্য বয়সী শ্রমিক বেলাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ড্রামের পানিতে ঔষধ দিই। নানা রকম ওষুধ থাকে। মালিক দেয়। আমরা ব্যবহার করি। গুদামে পানি ছিটায় দিই।”
“অর্ডার বেশি থাকলে রাইতেই ট্রাকে কেমিক্যাল মেশানো পানি দিয়ে টেকে দিই। যে ট্রাকগুলো বারোটার মইধ্যে এখানে ঢুকে, বেশি করে পানি দিয়ে পলিথিন দিয়ে টেকে রাখলেই সকাল হইতে হইতে পেকে যায়।”
কলার আড়তে যে রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলো কী? ভোক্তা অধিকার মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করে আড়তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও রাসায়নিক মেশানো বন্ধ হচ্ছে না।

কলা পাকাতে কী দেয়?
সম্প্রতি রাজধানীর কয়েকটি কলার আড়তে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে বাদামতলী, কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ীতে ইথোফেন ও রাইপেন দিয়ে ফল পাকানো প্রমাণ পেয়েছে সরকারের এই বিভাগটি।
রাসায়নিক দিয়ে ফল পাকার পাকানোর দায়ে বিভিন্ন আড়তদারকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক (নগরী) মোহাম্মদ আবদুস সালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পুরান ঢাকার বাদামতলীতে অনুমোদনহীন কিছু কেমিক্যাল পেয়েছি। যেখানে কলার আড়ত থাকে, ওখানে কলার স্তুপের ভিতর লুকানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। সরজমিনে পেয়েছি ইথোফেন ও রাইপেন দিয়ে কলা পাকানো হচ্ছে।
“এসব কলা অপরিপক্ক। অপরিপক্ক ফলে পানির সঙ্গে রাসায়নিক মিশিয়ে ছিটানো হচ্ছে। এগুলো আমরা পেয়েছি। জরিমানাও করেছি। সেই কলাগুলো ধ্বংস করেছি।”
তিনি বলছেন, কৃত্রিমভাবে কলা পাকানো হয় মূলত বাদামতলী, যাত্রাবাড়ী ও কারওয়ান বাজারে।
আবদুস সালাম বলেন, “ইথোফেন ও রাইপেন একট কৌটার মধ্যে রাখা তরল ওষুধ। এটা দিলে সবুজ রং দ্রুত হলুদ হয়ে যায়। বেশিমাত্রায় ছিটালে অল্প সময়ে পেকে যাচ্ছে। রাতেই ছিটিয়ে দিচ্ছে, সকালেই পাকা কলা সে বিক্রি করছে। ১২ ঘন্টার চেয়েও অল্প সময়ে এগুলো পাকানো হচ্ছে।”
কারওয়ান বাজারে ও যাত্রাবাড়ীর অভিযানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, “অভিযান টিম দেখার পরে তার লুকিয়ে ফেলে। কারওয়ান বাজার আড়তে সন্দেহ হওয়ায় গুদামের ভেতরের সব কলা সরিয়ে ফেললাম। কলার স্তুপের মাঝখানেই এসব কীটনাশক আমরা পাই। গুদাম ঘরগুলো থেকে ইথোফে-রাইপেন উদ্ধার করেছিলাম।
“যাত্রাবাড়ীতেও একই ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে। ওখানে ড্রাম পেয়েছিলাম। ড্রামের ভেতর কেমিক্যালগুলো পানি দিয়ে মেশানো হচ্ছে। ড্রাম থেকে ছোট ছোট বোতলে নেওয়া হয়। ছিটানোর যন্ত্র দিয়ে এগুলো ছিটিয়ে কলা পাকানো হচ্ছিল।”

যাত্রাবাড়ী একতা ফল মার্কেটে অভিযানকালেও রাইপেন, ইথিলিন ও ক্যালসিয়াম কার্বাইডের মিশ্রণ ছিটিয়ে অপরিপক্ক কাঁচা কলা পাকানোর প্রমাণ পায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (মেট্রো) আবদুস সালাম মেসার্স হাওলাদার এন্টারপ্রাইজকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে।
ভোক্তা অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার সহকারী পরিচালক হাসানুজ্জামান অভিযানে ধান চাষে ব্যবহৃত কীটনাশক দিয়ে কলা পাকানোর প্রমাণ পাওয়ার কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, “ঢাকার বিভিন্ন আড়তে অভিযানে গিয়ে দেখেছি, একটা চেম্বারের মধ্যে কলা ঢুকিয়ে কেমিক্যাল দিয়ে আটকে দেওয়া হচ্ছে। তখন কলাটা ২৪ ঘন্টার মধ্যে পেকে যাচ্ছে। কেমিক্যাল বেশি ব্যবহার করলে আরো দ্রুত পাকছে। এসব কেমিক্যালের মধ্যে ধান গাছে ব্যবহার করা কীটনাশক ব্যবহার করার প্রমাণ পেয়েছি।”
হাসানুজ্জামান বলছেন, ফল পাকানোর অনুমোদিত কিছু পদ্ধতি রয়েছে। সেসব পদ্ধতি ব্যবহার করলে সমস্যা হবে না।
“ফলটা যখন গাছে থেকে কেটে নিয়ে আসে তাতে আর কীটনাশক ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা কীটনাশক ব্যবহার করেছে।”
কলা পাকানোর অনুমোদিত পদ্ধতির মধ্যে প্রচলিত পদ্ধতির কথা বলছিলেন ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তা আবদুস সালাম।
প্রচলিত পদ্ধতির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “অনেক সময় কোনো কিছু দিয়ে ঢেকে রাখলে গরমে কলা পেকে যায়। আরেকটা পদ্ধতি হলো হারিকেন জ্বালিয়ে গুদামে তাপ তৈরি করেও পাকানো যায়। এটা আইনগতভাবে কোন সমস্যা নেই।
“অভিযানে দেখতে পাচ্ছি, সময় বেশি লাগে বলে অধিক মুনাফার আশায় এসব পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন না ব্যবসায়ীরা।”
প্রচলিত পদ্ধতি থাকতে কেন রাসায়নিক ব্যবহার করে কলা পাকানো হচ্ছে, তার কয়েকটি কারণ বলেছেন ব্যবসায়ীরা।
বাদামতলীর কলা ব্যবসায়ী আলমগীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় দ্রুত কলা পাকানোর জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
“প্রাকৃতিকভাবে কলা পাকতে যেখানে চার থেকে ছয়দিন লাগে, কেমিক্যাল ব্যবহারে তা মাত্র ১০ থেকে ১২ ঘণ্টায় পেকে যায়। এছাড়া কেমিক্যাল দেওয়া কলার রঙ সুন্দর ও দাগহীন হয়। ফলে সাধারণ ক্রেতারা আকৃষ্ট হয়।”
টঙ্গীর চেরাগ আলীর কলা আড়তের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের ভাষ্য, “কাঁচা অবস্থায় কলা পরিবহন করলে তা নষ্ট বা গলে যায় না। তাই কাঁচা কলা নিয়ে আসা হয়।”

হরমোন ও নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-বারির ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মসিউর রহমান বলেন, কলা পাকাতে মূলত ইথোফেন ব্যবহার করা হয়। তবে বেশি পাকায় ধোঁয়া দিয়ে। বড় মাটির ঘরের মধ্যে কলাগুলো সাজায়। তার মাঝখান খড় দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এখান থেকে ধোঁয়া বের হয়। কোনটাই বৈধ পদ্ধতি নয়। ধোঁয়া দিয়ে পাকালে ক্ষতির পরিমাণটা কম হয়। কারণ ধোঁয়ার মধ্যে তেমন ক্ষতিকর উপাদান থাকে না।
কলা পাকাতে ইথোফেন কতটুকু ব্যবহার করা যাবে, নাকি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষেধ? জবাবে ড. মসিউর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইথোফেনের ডোজ ২০ পিপিএম দিয়ে যদি পাকায় তাহলে ততটা ক্ষতি হয় না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এর চেয়ে অনেক বেশি দিয়ে দেন।
“সারা দুনিয়ায় ইথোফেনের গ্যাস তৈরি করে ফল পাকায়। কিন্তু ধোঁয়ার পরিবর্তে ইথোফেন গ্যাস দিয়ে যদি পাকায় তাহলে ক্ষতি কম হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ইথোফেন গুলিয়ে পানির মধ্যে ডুবিয়ে দেয়।”
২০ পিপিএম বলতে প্রতি ১ মিলিয়ন ভাগ পানিতে ইথোফেনের ঘনত্বের মাত্রা ২০ ভাগ বা ১ লিটার পানিতে ২০ মিলিগ্রাম ইথোফেনের অনুপাতকে বোঝায়।
ইথোফেন গ্যাস তৈরি করাও সহজ, এ কথা তুলে ধরে এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, “বাটির মধ্যে ইথোফেন মেশানো তুলা রাখলে তুলা থেকে আস্তে আস্তে গ্যাস তৈরি হয়। নির্দিষ্ট জায়গায় বা ঘরের মধ্যে চারটা বা পাঁচটা ইথোফেন মেশানো তুলার দলা ঝুলিয়ে রাখলেই গ্যাস তৈরি হয়। এতেই কাজ হয়ে যায়। কিন্তু সেটা না করে বাংলাদেশে ছিটানো হয়। এটাতে ক্ষতি বেশি হয়। গ্যাস হলে ক্ষতি হয় কম হয় কারণ বাড়তি গ্যাস বাতাসে উড়ে যায়।”
ইথোফেন ব্যবহারে যতটুক স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা জনমুখে চালু আছে, ততটা হয় না তুলে ধরে তিনি বলেন, “ইথোফেন ছিটানোর কারণে ক্যান্সার হওয়ার যে কথা চালু আছে এধরনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। তবে কলার স্বাদ নিম্নমানের হয়। পুষ্টিগুণ কম হয়। চামড়া কালো হয়ে যায়। স্বাস্থ্যগত ক্ষতি আমরা যতটা বলি ইথোফেন দিয়ে ততটা হয় না।”
কাঁচা কলা দ্রুত পাকাতে ও চকচকে হলুদ করতে পোকা মারার কীটনাশক ডিডিটিও (‘ডাইক্লোরো ডাইফিনাইল ট্রাইক্লোরোইথেন) ব্যবহার করা হচ্ছে। এই নিষিদ্ধ কীটনাশক খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে এসিডিটি, বিপাক ক্রিয়া, মস্তিষ্কে অক্সিজেন পরিবহনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মসিউর রহমান বলেন, “ধানের কীটনাশক ডিডিটিও ফল পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা এক ধরনের পাউডার। এটা স্বাস্থ্যের জন্য আসলেই ক্ষতিকর। পানির সঙ্গে এটা মিশিয়ে কলা স্তুপ করে কাপড় ও পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

রাসায়নিকে পাকানো কলায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি
রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কলা পাকিয়ে ব্যবসায়ীদের মুনাফা হচ্ছে, কিন্তু এসব কলা খেয়ে মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ার কথা বলেছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. মোমিনুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কলায় (রাসায়নিক) বেশি ব্যবহার হচ্ছে। পেঁপেও এভাবে পাকানো হচ্ছে। এসব খেয়ে কিডনি, লিভার বিকল হওয়ার ঝুকি আছে। বদহজম, পেটের পীড়াও হচ্ছে। ‘স্লো পয়জনিং’ এরও শিকার হচ্ছে।
এসব ওষুধ দিয়ে পাকানো কলার খোসা শিশুর স্পর্শ এলে কোনো বিষক্রিয়ার ঝুঁকি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এসব কলার খোসা মুখে দিলে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি রয়েছে। খাইলে সমস্যা হবে। স্পর্শ করলে কোন সমস্য নেই।”
প্রতিকারের উপায় হিসেবে তিনি সচেতনতার ওপর জোর দেন।
ডা. মোমিনুর রহমান বলেন, “জনগণকে সচেতন হতে হবে। যারা এ ধরনের কাজ করে, তাদের বিরুদ্ধ সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাশে একজন করতেছে, আমি চোখ বন্ধ করে থাকলাম, তাহলে হবে না।”
“সেইসঙ্গে সরকারকে আরো কঠোর আইন তৈরি ও প্রয়োগ করতে হবে।”
পুরনো খবর:
ফলে রাসায়নিক মেশানোয় জড়িতদের শাস্তি দাবি
জরিমানায় কাজ হচ্ছে না, ভেজাল মিললে জেল: মেয়র খোকন
নিম্নমানের শিশু খাদ্য ও প্রসাধনী বিক্রি, দুই দোকানকে ৬ লাখ টাকা জরিমানা