Published : 19 Jun 2026, 01:30 AM
সময়মতো নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের শেয়ার লেনদেন বন্ধ থাকার মধ্যে এখন তালিকা থেকেই বাদ পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
বেক্সিমকো গ্রুপের এই কোম্পানিটির সিকিউরিটিজ লেনদেন সাড়ে পাঁচ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। দুই সপ্তাহের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে না পারলে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের তালিকা থেকেই বাদ পড়বে কোম্পানির শেয়ার, অর্থাৎ লেনদেনের অনুমতি বাতিল হবে।
তবে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, এই দুই সপ্তাহের মধ্যে কিছু একটা করতে হবে। যাতে বেক্সিমকো ফার্মা লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকা থেকে বাদ না পড়ে।
বৃহস্পতিবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বেক্সিমকো ফার্মা লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে ‘ডিলিস্টেড’ হলে ইমেজ নষ্ট হবে। ভবিষ্যতে আর কোনো কোম্পানি বিদেশের স্টক মার্কেটে তালিকাভুক্ত হতে সমস্যা হবে। তাই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে আমরা একটা সমাধানের চেষ্টা করছি।”
“আশা করছি ভালো কিছু হবে।”
মাসুদ খান বলেন, “গতকাল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের লন্ডনে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের ছয়জন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী আমাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়টির সম্মানজনক সমাধানের উদ্যোগ নিতে একটি চিঠি দিয়েছে। আমরা সে মোতাবেক কিছু করার উদ্যোগ নেব।”
নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে ব্যর্থ হওয়ায় চলতি বছরের ২ জানুয়ারি থেকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে (এআইএম) বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিট (জিডিআর) বা শেয়ার লেনদেন স্থগিত করা হয়।
গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক ডিসক্লোজারে বেক্সিমকো ফার্মা জানায়, এআইএম রুল-১৯ অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব নির্ধারিত সময়সীমা, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী সময়মতো প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় ২ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে লন্ডনের বাজারে কোম্পানিটির জিডিআর লেনদেন বন্ধ থাকবে।
সেই ঘোষণা অনুযায়ীই গত সাড়ে পাঁচ মাস ধরে লন্ডনে পুঁজিবাজারে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হচ্ছে না।
ওই সময় কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ হল-পরিচালনা পর্ষদের সভা আয়োজন করতে না পারা। বেক্সিমকো ফার্মার বোর্ডে বিএসইসি কর্তৃক ৯ জন অতিরিক্ত স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে উচ্চ আদালতে একটি মামলা চলমান রয়েছে।
বর্তমানে উচ্চ আদালত ছুটিতে থাকায় এবং বেঞ্চ পুনর্গঠনের কারণে মামলাটির নতুন করে শুনানি প্রয়োজন হবে। এ অবস্থায় ২০২৬ সালের জানুয়ারির আগে এ বিষয়ে কোনো রায় পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানায় কোম্পানিটি। আদালতের রায় ছাড়া পর্ষদ সভা করে আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তবে লন্ডনের বাজারে শেয়ার লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও দেশের দুই পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ার লেনদেন স্বাভাবিক নিয়মেই চলবে বলে জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।
পাশাপাশি স্থগিতাদেশ চলাকালেও এআইএম-এর বিধি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় সব ধরনের তথ্য প্রকাশ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কোম্পানিটি।
২০০৫ সাল থেকে লন্ডনের এআইএম তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করেছিল। এরপর থেকে পরবর্তী প্রান্তিক ও বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর পর্ষদ সভার মাধ্যমে আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন ও প্রকাশ করা গেলে লন্ডনের বাজারে পুনরায় শেয়ার লেনদেন শুরু হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে বেক্সিমকো ফার্মা।
এ বিষয়ে মাসুদ খান বলেন, “এই দুই সপ্তাহের মধ্যেই আদালতের অনুমোদন নিয়ে বিশেষ সাধারণ সভার (ইজিএম) আয়োজনের ব্যবস্থা করে ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে সমস্যাটির সমাধান হবে।”
এ বিষয়ে জানার জন্য বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহকে ফোন করলেও তিনি পরিচয় শুনে কেটে দেন।
এআইএম রুলস ফর কোম্পানিজ-এর ১৯ ধারা অনুযায়ী, এআইএম তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানিকে তার অর্থবছর শেষ হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন ও হিসাব প্রকাশ করতে হয়।
৪১ ধারা অনুযায়ী, কোনো সিকিউরিটিজ (শেয়ার বা অন্যান্য তালিকাভুক্ত আর্থিক উপকরণ) যদি টানা ছয় মাস ধরে লেনদেনের জন্য স্থগিত অবস্থায় থাকে, তাহলে সাধারণত লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ তাদের লেনদেনের অনুমোদন বাতিল করে দেয়, যদি স্থগিত থাকার মূল কারণগুলো সমাধান না করা হয়।
আগামী ২ জুলাই সেই ছয় মাসের সময়সীমা শেষ হবে। এই ছয় মাসের সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে যে, যদি কোম্পানিটি নিয়ম মেনে চলার অবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে শেষ পর্যন্ত এআইএম থেকে শেয়ার লেনদেনের অনুমোদন বাতিল করা হবে।
তবে শেয়ারধারক যারা তাদের শেয়ারের মালিকানা বজায় থাকবে।
ভবিষ্যতে পুনরায় বাজারে ফিরে আসতে চাইলে সাধারণত নতুন করে কোম্পাটিকে তালিকাভুক্তির (লিস্টিং) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট তালিকাভুক্তির সব শর্ত ও বিধি মেনে চলতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটেই বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের লন্ডনে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের ছয়জন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিএসইসি চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তারা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ যেন বকেয়া আর্থিক বিবরণীগুলো (ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট) অনুমোদন করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সেই অনুরোধের পরিপেক্ষিতেই বিএসইসি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে বলেছেন মাসুদ খান।