Published : 05 Apr 2026, 05:40 PM
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটে পড়ে সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে যে নতুন সময়সূচি ঠিক করে দিয়েছে, সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত রোববার থেকে তা অনুসরণ করতে শুরু করেছে পুরোদমে।
তবে দোকান, মার্কেট, বিপণি বিতানের জন্য নির্ধারিত সময় নিয়ে পাড়া মহল্লার দোকানিদের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। মুদি দোকান, লন্ডি, সেলুনের মত দোকানেও ওই সূচি মানতে হবে কি না, সে বিষয়ে দোকানিরা নিশ্চিত নন।
তারা বলছেন, সরকার নতুন সময়সূচির বিষয়টি মাইকিং করে অথবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে প্রচার করলে ‘ভুল-বোঝাবুঝি’ দূর হবে।
অন্যদিকে রাজধানীর বড় বিপণি বিতানগুলোর (শপিংমল) দোকানদাররা বলছেন, সকাল বা রাত যখনই তারা দোকান খোলা রাখেন না কেন, একই পরিমাণ বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখতে হয়। বিদ্যুত খরচ সব সময় একই রকম থাকে।
ফলে সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে না; বরং সন্ধ্যার ক্রেতা হারিয়ে ব্যবসায় লোকসান দিতে হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর নয়া পল্টন, মতিঝিলি, সেগুন বাগিচা, রাজধানী সুপার মার্কেট ও যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন এলাকার দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে এমন প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে ৯টা থেকে ৪টা করা, মার্কেট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও রয়েছে।

সে অনুযায়ী রোববার দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কাজ চলে।
তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, দোকান মালিক সমিতির আবেদন বিবেচনা করে দোকান-মার্কেট খোলা রাখার সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টার পরিবর্তে ৭টা পর্যন্ত দোকান, মার্কেট ও শপিংমল খোলা রাখা যাবে।
কিন্তু আরামবাগ এলাকার মুদি ও কনফেকশনারি পণ্য বিক্রেতা জি-মার্ট এর স্বত্বাধিকারি সাদ্দাম সিনহা বুঝতে পারছেন না, তাকেও সন্ধ্যার সময় দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যেতে হবে কি না।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমি তো কনফিউজড হয়ে আছি। সরকার বলেছে, খাবারের দোকান খোলা থাকবে। আমি তো খাবারের বিভিন্ন উপাদান বিক্রি করি। আমি কোন তালিকায়? আমাদের তো কোনো সংগঠন বা সমিতি নাই যে জানাবে।’’
তার ধারণা, সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়সূচি শপিংমলের জন্য প্রযোজ্য, পাড়া মহল্লার জন্য না।
বিষয়টি খোলাসা করতে এলাকাভিত্তিক মাইকে প্রচার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে জানানোর পরামর্শ রেখে তিনি বলেন, “পুলিশ তো এখনো আসেনি। তাই ভালো করে জানিও না।”

সাদ্দামের মত পাড়া মহল্লার বেশিরভাগ দোকানির কাছে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। যাত্রাবাড়ীর শনির আখাড়ার প্লাস্টিক পণ্য বিক্রেতা জামাল তালুকদারের সঙ্গে কথা বলেও তা বোঝা গেল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “হেউডা তো বড় বড় শপিং মলের জন্য হইবে। আমরা এলাকার দোকানদার। আমাগো জন্য সেই নিয়ম না।”
সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করতে আপত্তির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “সকালে তো বিক্রি-বাট্টা হয় না। মানুষ-জন অফিস থেকে ফেরার সময়ে কিনে নিয়ে বাড়ি যায়। স্বামী-স্ত্রী মিলে সন্ধ্যা থেকে আসতে শুরু করে। এখন ৬টায় বন্ধ করলে তো বিক্রি অনেক কমবে, দোকান খরচা উঠাইতে পারুম না।”
রাজধানী সুপার মার্কেটের কাপড়ের দোকানের বিক্রেতা ইয়াসিন আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিক্রি তো করি সন্ধ্যায়। সরকারের নিয়ম মানা দরকার আছে, কিন্তু আমাগো বিষয়টাও বুঝতে হইব। সবাই বিকালে কিনতে আসলে আমরা কি করুম।”
মতিঝিলে পুরুষদের চুল কেটে দেওয়ার সেলুন চালানো শিমুল দাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকারের নিয়ম তো মানতেই হবে। সবাই মানলে আমরাও মানব। সমস্যা হইল, যারা চুল কাটতে ও শেভ করতে আসে, সবাই তো অফিস শেষে আসে। আমাদের সকালে আরো বেশি সময় বন্ধ রাখলেও সমস্যা নাই।”
এভাবে সময় বেঁধে দিয়ে সরকারের লক্ষ্য পূরণ কতটা হবে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেন নয়া পল্টনের বিপণি বিতান চায়না টাউনের বিসমিল্লাহ কসমেটিকসের স্বত্বাধিকারী নাহিদ ইসলাম।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের শপিং মল সকাল ৯টায় খুললেও আমরা খুলি ১০টার দিকে। কাস্টমার তো আসে আরো পরে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সমান সমান বাতি ও এসি চলে।

“মার্কেটের ভেতরে ঢুকলে তো আপনি বুঝতে পারবেন না দিন নাকি রাত। আমাদের জন্য সব সময় একই লাইট জ্বালায়ে রাখতে হয়। দেরিতে দোকান খুলে রাত পর্যন্ত চলতে দিলে আমরা ব্যবসাটা করতে পারতাম।”
একই কথা বললেন স্বল্প দূরত্বে থাকা আরেকটি বিপণি বিতান সিটি হার্ট শপিং মলের পোশাকের দোকান লাবিব ফ্যাশনের দোকানি মহিদুল ইসলাম।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সকালে ৯টার বদলে ১১টার সময়ে খুলে রাত ৮টা পর্যন্ত বেচাবিক্রি করতে দিলে তাদের জন্য ভালো হত।
“ঈদ ভাঙা বাজার আমাদের। এখনো বিক্রি শুরু হয়নি, দোকান খোলা রাখতে হয় তাই খুলি। সকালে খুললেও বিকেল ২-৩টা পর্যন্ত বউনি হয় না অনেক সময়। আমাদের বিক্রি হয় সন্ধ্যা থেকে। তাই সন্ধ্যার সময়ে দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে দিলে ভালো হয়, নইলে লস টানতে হবে।”
চায়না টাউন শপিং মলের জেসমিন শপে পোশাক, খেলানা, প্রসাধনী ও হাত ব্যাগ বিক্রি হয়। দোকানি আবু তাহের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, “সকালে তো কোনো কাস্টমার আসে না। মাঝে মাঝে পাই। সকালে বন্ধ রাইখা বিকালে চালু করতে হবে।”
শপিং মলে থাকা দোকানগুলোকে সমিতির পক্ষ থেকে সরকারি বার্তা জানিয়ে দেওয়া হলেও পাড়া মহল্লা ও সংগঠন না করা দোকানদারদের কাছে কে পৌঁছে দেবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সেগুন বাগিচা কাঁচাবাজারের দোকানি মাসুদ মিয়া বলেন, “অফিস থেকে ফিরে সবজিসহ অন্যান্য কেনা-কাটা করতে সবাই সন্ধ্যার সময়ই আসে। এখন তারা আগে আসলে বিক্রি ঠিক থাকবে, না হলে দোকান থেকে না কিনে ভ্যান থেকে কিনবে। তাতে আমাদের লস।”