Published : 16 May 2026, 07:32 PM
প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখায় কয়েক হাজার কোটি টাকার বেশি ‘অর্থ আত্মসাতের’ সঙ্গে কোনো ব্যবসায়ী নয়, ব্যাংকের কর্মকর্তারাই জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন রপ্তানিমুখী ২৬ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরা।
শনিবার দুপুরে রাজধানী ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে এসে ব্যাংকটির বিপুল এ ‘অর্থ আত্মসাতের’ ঘটনায় নাম আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা এ অভিযোগ করেন।
তাদের দাবি, তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে ‘ভুয়া হিসাব’ খুলে ব্যাংকাররাই লেনদেন করেছেন; ‘অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে ব্যাংকের শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জড়িত’।
রাজধানীর পল্টনে ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে এসব ব্যবসায়ী প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখায় বিশেষ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বের করার দাবি জানান।
একইসঙ্গে তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবগুলোতে হওয়া লেনদেনের বিবরণীও চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখায় ‘ভুয়া রপ্তানি আদেশের’ নামে ব্যাক-টু ব্যাক এলিসির বিপরীতে সম্প্রতি ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি পাচারের খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে এমন অনিয়ম ধরা পড়েছে বলে খবরে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তের পর এলসিগুলো করার সঙ্গে নাম আসা রপ্তানিমুখী ২৬টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করে দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা না থাকার দাবি করে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ‘ডয়েস ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় রপ্তানিমুখী ২৬ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ‘অচল’ করে দেওয়ায় কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
‘‘প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালকসহ কতিপয় দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং প্রধান কার্যালয়ের দুর্নীতিপরায়ণ ও অসাধু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসাজশে আমাদের ২৬টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, তা কেবলমাত্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অসত্য ও ভিত্তিহীনই নয়; বরং নিজেদের দুর্নীতি ঢাকার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে হয়রানি, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও সুনামহানির উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করে সুকৌশলে আমাদের প্রতিষ্ঠানের উপর চাপানো হয়েছে।’’
প্রিমিয়ার ব্যাংকের ওই শাখায় ২০১৭ সাল থেকে এই ২৬টি প্রতিষ্ঠানের নামে ‘ভুয়া’ ব্যাংক হিসাব চালু করে ‘ভুয়া রপ্তানি বিলের’ বিপরীতে অর্থপাচার ও লেনদেন করা হচ্ছে বলে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবর হয়। এসব বিষয় ২০২৩ সাল পর্যন্ত জানত না ২৬ প্রতিষ্ঠানের কেউ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের তাদের এ বিষয়টি জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে আরিফুর রহমান বলেন, ‘‘২০১৭ সাল হতে প্রিমিয়ার ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অবৈধভাবে নিজেরা ব্যক্তিগতভাবে এবং ব্যাংককে লাভবান করার উদ্দেশ্যে উক্ত প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া আইডি সৃষ্টি করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে একাধিক ভুয়া ও জাল সেলস এর বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়। সেখানে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন করা।’’
ব্যাংক হিসাব অচল হওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, ‘‘একটি এলসির বিপরীতে একাধিক ব্যাক টু ব্যাক এলসির করে প্রতিষ্ঠানসমূহের সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে, অনুমতি ব্যতিরেকে চলতি হিসাবে টাকা জমা করে ওই টাকা দিয়ে ১২ থেকে ১৫ টাকা অতিরিক্ত দরে ডলার কেনা হয়। পরে অতিরিক্ত টাকা সমন্বয় করা হয়নি। এই টাকা এখন আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচেছ।’’
আরিফুর রহমান বলেন, ‘‘আমাদের ২৬টি কারখানার প্রত্যেকে কত ডলারের আর টাকা লেনেদন করতে পারবে তার একটা লিমিটি (সীমা) দেওয়া আছে। আমার প্রতিষ্ঠানের লিমিট ৫০ কোটি টাকা। সেখানে ৩০০ কোটি টাকা খেলাপি দেখানো হচ্ছে। আমি তো লিমিট ক্রস করিনি, ক্রস করতে বলিনি। এটাতো ক্রস করার সুযোগ নাই। ব্যাংক করেছে।’’
২০২৪ সালে এসব অনিয়ম বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ধরা পড়ার তথ্য দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘‘তখন আমাদের জানায় ব্যাংকের বকেয়া টাকার পরিমান প্রতিষ্ঠানসমূহের ঋণসীমার থেকে কয়েকগুণ বেশি, যা সম্পূর্ণ বেআইনি, অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক।’’
বিষয়টি জানার পর ব্যাংকের কাছ থেকে সব লেনদেনের তথ্য বিবরণী চেয়েও পাওয়া যায়নি দাবি করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সব প্রতিষ্ঠানই চায় একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত দেনা নিরূপণ করা হোক।
আরিফুর রহমান বলেন, ‘‘২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যাংক কর্তৃক প্রতিটি প্রতিষ্ঠনের অনুকূলে অনুমোদিত লিমিটে এ ধরনের কোন দায়-দেনা ছিল না। কিন্তু বিগত ২০২৪ সালে হঠাৎ করে কিভাবে এত পরিমাণ দায় তৈরি হলো? সেই প্রশ্নের উত্তর ব্যাংক দিচ্ছে না।’’
সংবাদ সম্মেলনে মেহরাব ফ্যাশন লিমিটেডের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহরাব বিন হাসিব, জননী ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গৌতম পোদ্দারসহ ২৬ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।