Published : 26 May 2026, 01:23 AM
বড় এক জোড়াসহ তিনটি গরু নিয়ে জামালপুর থেকে রাজধানীর দিয়াবাড়ি হাটে এসেছেন খামারি মো. মামুন। তিন দিন হয়ে গেল, একটি গরুও বিক্রি হয়নি।
বড় জোড়ার দাম ৮ লাখ এবং অন্যটির দাম চাওয়া হচ্ছে ৩ লাখ টাকা। তবে গ্রাহকরা এর আশপাশেও দাম বলছেন না।
মামুন বলেন, ‘‘গরুর দাম চাইতেছি ৪ লাখ, কিন্তু ক্রেতারা বলে আড়াই লাখ। এই দামে গরু বিক্রি করা সম্ভব নয়। একটা গরু পালতেই ৩ লাখ টাকার মত খরচ হয়েছে।’’
মামুন একা নন, হাটের বেশির ভাগ ব্যাপারির অবস্থা এরকম। খামারি ও ব্যাপারিরার বলছেন, এবার হাটে ‘অনেক বেশি’ গরু এসেছে। সেই তুলনায় দাম নেই।
এরমধ্যে বৃষ্টির কারণে অনেক গ্রহক হাটে আসতে পারছে না। যারা আসছেন, তারা ‘ন্যায্য দামও’ বলছেন না বলে বিক্রেতাদের ভাষ্য।
ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, এখনো হাটের দুদিন আছে, তাই ব্যাপারিরা দাম ছাড়ছে না। তারা সর্বোচ্চ দাম ধরে রেখে বেশি লাভের আশায় গরু ছাড়ছেন না।
সোমবার উত্তরার দিয়াবাড়ি হাটে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত মাঠের বাইরেও ১৬ নম্বর সেক্টরে যাওয়ার রাস্তার দুই পাশে গরু বাঁধা।
এছাড়া মেট্রো স্টেশনের নিচে এবং মেট্রো লাইনের দুই পাশে গরু নিয়ে দাঁড়িয়েছেন ব্যাপারিরা। মূল হাটে মাঠের ভেতরে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় ক্রেতারা রাস্তার মধ্যেই গরু দেখছেন বেশি।
বড় গরু ‘দর্শনীয়’, চাহিদা বেশি ছোট ও মাঝারির
হাটেরর ইজারাদাররা বলছেন, হাটে গত কয়েক দিনে প্রায় এক লাখ গরু-ছাগল এসেছে; আরো আসছে।
তবে এখন পর্যন্ত বড় গরুর ক্রেতা কম। বিক্রি যা হচ্ছে, তার মধ্যে ছোট ও মাঝারি গরুই বেশি। তবে বৃষ্টির কারণে অনেক ক্রেতা আসতে পারছে না বলে ব্যাপারিদের ধারণা।
বগুড়া থেকে সাতটি গরু নিয়ে দিয়াবাড়ির হাটে এসেছেন সিদ্দিক মিয়া। তিনি বললেন, “দুদিন হল এসেছি। এখনো সেভাবে গ্রাহক নেই। আজ থেকে হাট জমে উঠবে মনে করেছিলাম। কিন্তু বৃষ্টিতে সেটাও হয়ে উঠছে না।”
সিদ্দিকের সাতটি গরুর মধ্যে সবচেয়ে ছোটটি ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাকি ছয়টি গরুর দামই দুই লাখের বেশি চাইছেন। কিন্তু ক্রেতারা দাম শুনে আর কথা বাড়াচ্ছেন না।
কুষ্টিয়া থেকে আটটি গরু নিয়ে এসেছেন ব্যাপারি মো. হাসেম। তিনি বলেন, ‘‘গতকাল আইচি, এখনো বিক্রি হয়নি। পানি পানি মানুষ আইতে পারতেছে না। যারা আহে তারাও ভালো দাম কয় না। খুব কষ্টে আছি গরু লিয়া।’’
জামাল হোসেন নামের একজন ব্যাপারি বললেন, তিনি এসেছেন পাঁচ গরু নিয়ে। এখনো বিক্রির খাতা খুলতে পারেননি।
“আমার গরুর ওজন ৬ থেকে ৭ মণ হবে। তাই দাম চাচ্ছি ২ লাখের বেশি, কিন্তু ক্রেতায় বলে দেড় লাখ টাকা। এভাবে দাম বললে গরু বিক্রি করা সম্ভব না।”
সোমবার এই হাটে গরু কিনতে এসেছিলেন বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তা গাজী ফোরকান। তার পর্যবেক্ষণ হল, বাজারে প্রচুর গরু আছে, কিন্তু বিক্রেতারা কেউ দাম ছাড়ছে না।
“এখনো দুদিন হাট আছে। আজ হাট ঘুরে দেখলাম চাম বেশ চড়া। তারপরও পছন্দ হলে একটা কিনে নিয়ে যাব।”

রাস্তা জুড়ে গরুর হাট, সরালো ডিএনসিসি
উত্তরা সেন্টার মেট্রো স্টেশনের নিচ থেকে দুই পাশের দীর্ঘ রাস্তা জুড়ে পশু নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ব্যাপারিরা। তাতে যান চলাচলা বিঘ্নিত হচ্ছিল, সাধারণ যাত্রীরাও ভোগান্তিতে পড়ছিলেন।
মেট্রো রেলের যাত্রী আসফাকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মেট্রো চলাচল বন্ধ করে দিয়ে হাট বসিয়ে দেক এলাকা জুড়ে। এখানে পুলিশ, র্যাব সবাই আছে কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।”
শেষ পর্যন্ত বিকাল ৩টার পর অভিযান চালিয়ে এসব পশু সরিয়ে দেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান।
খামারিরা বলছেন, সকাল থেকে আকাশ খারাপ থাকায় এবং বৃষ্টির কারণে অনেকে মেট্রো স্টেশনের নিচে গরু নিয়ে দাড়িয়ে ছিলেন। হাটের কিছু স্বেচ্ছাসেবকও তাদের নিচে দাঁড়ানোর জন্য বলেছিলেন।
পাবনার খামারি রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি হাটের মোড়ে আসার পরই দেখি আকাশ খারাপ। শুনলাম হাটের ভেতরে অনেক পানি, তাই ভেতরে না গিয়ে স্টেশনের নিচে অনেকের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলাম।”
তবে হাটের ইজারাদারের সহকারী চান মিয়া বললেন, তারা কখনোই মেট্রো স্টেশনের পাশে কাউকে দাঁড়াতে বলেননি।
“বরং মাইক দিয়ে বার বার আমরা সেখান থেকে গরু সরিয়ে হাটের ভেতরে নিয়ে আসার কথা বলেছি। কিন্তু অনেকে কথা শুনছেন না।”
উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দিয়াবাড়ি পশুর হাটের নির্ধারিত সীমানার বাইরে মূল সড়কে বিক্রির জন্য কোরবানির পশু রাখা হয়েছে দেখতে পেয়ে প্রশাসক দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের নিয়ে সেখান থেকে সব ধরনের কোরবানির পশু সরিয়ে দেন এবং রাস্তা যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার নির্দেশ দেন।
পশুর হাটের ইজারাদারকে তাৎক্ষণিক ফোন করে ঘটনাস্থলে আসতে বলেন প্রশাসক। পরে ইজারাদারকে সড়কে হাট না বসানোর নির্দেশ দেন তিনি।
নির্দেশনা অমান্য করা হলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা করারও নির্দেশ দেন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান।
হাট জুড়ে পানি, অব্যবস্থাপনার অভিযোগ
এবার রাজধানীতে সর্বোচ্চ দামে ইজারা হওয়া হাট হল দিয়াবাড়ি পশুর হাট। পাঁচ দিনের জন্য ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকায় উত্তরা দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন বউ বাজার এলাকার এই হাট ইজারা পেয়েছেন এস এফ করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী মো. শেখ ফরিদ হোসেন।
তবে আলোচিত এই হাট জুড়ে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি সুপেয় পানি, লাইট এবং খাবারের সংকটের কথা বলছেন ব্যাপারি ও খামারিরা।
জামালপুরের আবু হোসেন ১৩টি গরু নিয়ে হাটে এসছেন। তিনি বলেন, “আমি তিন দিন হল হাটে আছি। আসার পর থেকে গরুকে খাওয়ানোর পানি আর নিজেদের খাবার নিয়ে ঝামেলায় আছি। খুবই অল্প দোকান, দামও বেশি।”

হোসেন বলেন, “গত দুদিন গরুর জন্য খাবার পানির চরম সংকট ছিল। এখন আবার আকাশের পানিতে (বৃষ্টি) গরু নিয়ে আমিও খুব কষ্টে আছি। এভাবে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। পানির মধ্যে থাকা যায় নাকি?”
খোরশেদ ইসলাম নামের আরেকজন ব্যাপারি বলেন, “বৃষ্টি নামার পর থেকে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অনেক কিছু চাইলে দেরিতে পাচ্ছি। এভাবে পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না।”
বিক্রেতাদের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে ইজারাদারের সহকারী চান মিয়া বলেন, “আমরা প্রায় ২ হাজার ভলেন্টিয়ার নিয়েছি। সবাই মাঠে কাজ করছে। কিন্তু বৃষ্টি হলে আমরা কী করতে পারি? তবে যাদের যা প্রয়োজন, আমরা সেটা যথাসাধ্য মেটানোর চেষ্টা করছি।”
রাস্তা ও স্টেশনের নিচে গরু রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা মাইক নিয়ে বার বার বলতেছি মেট্রো স্টেশনের নিচে থেকে গরু সরিয়ে ফেলতে, কিন্তু কথা শুনছে না তারা।”
আর উত্তরার ১৬ নম্বরে সেক্টরে যাওয়ার রাস্তায় গরু রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই রাস্তায় আমরা গরু রাখি। এভাবেই হাট ইজারা নেওয়া হয়েছে।”
গরুর মালা বিক্রি দিনে ৩ হাজার টাকার
কোরবানির গরুর মালার চাহিদা আগের চেয়ে বেড়েছে। সোমবার হাটের প্রবেশ পথে এবং হাসিল ঘরের পাশে মালা বিক্রেতাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। হাঁটের মধ্যেও অনেকে ঘুরে ঘরে মালা বিক্রি করছিলেন।
আনার হোসেন নামের একজন মালা বিক্রেতা জানালেন, তিনি এসেছেন নারায়ণগঞ্জ থেকে।
“আমি গত দু বছর ধরে মালা বিক্রি করি। এখন দিনে প্রায় ২ হাজার টাকার কাছাকাছি বিক্রি হচ্ছে। তবে ঈদের দুদিন আগে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়।”
নাইম ইসলাম নামের আরেকজন মালা বিক্রেতা বললেন, “আজ বৃষ্টি, তাই সেভাবে বিক্রি হচ্ছে না। তবে গত দিন ভালো বিক্রি হয়েছে। আশা করি ঈদের আগের দুদিন ভালো বিক্রি হবে।”