Published : 19 Apr 2026, 12:40 AM
সরকারের তরফে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর কথা বলা হলেও বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম বাড়ানোর তিনটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এমন প্রস্তাব করেছে।
তবে বিদ্যুতের দাম এখনই বাড়ানো হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এখনো তো বাড়ে নাই।”
পরে এ বিষয়ে আবার জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বললাম তো এখনো তো বাড়ে নাই।”
সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে তার মন্তব্য, “যখন বাড়বে তখন বলব।”
এমন প্রেক্ষাপটের মধ্যেই শনিবার রাত ১০টার দিকে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

এর ঘণ্টা কয়েক আগে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সরকারের দুই মাস পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে জনস্বার্থে ভর্তুকি বাড়ানোর কথা বলেছিলেন।
জ্বালানি তেলের নতুন দর নির্ধারণের এ সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর ঋণের পরের কিস্তির অর্থ পেতে জোর দেন দরবার চালাচ্ছে সরকার।
পিডিবির জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালক মো. শামীম হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব মন্ত্রীসভা বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে সবশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন খুচরায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পাইকারিতে ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়।
পিডিবির দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে কী আছে
বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার সমন্বয় নিয়ে এপ্রিলের শুরুতে মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপনের জন্য তৈরি মন্ত্রণালয়ের একটি সারসংক্ষেপধর্মী নথিতে বলা হয়েছে, নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী দায়িত্ব নেওয়ার সময় বর্তমান সরকার পরবর্তী দুই বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লে এলএনজি, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিতে শুরু করে। এর জেরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ও সরকারের ভর্তুকিতে চাপ বেড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে পিডিবি গড় পাইকারি ট্যারিফ ইউনিটপ্রতি ৭ দশমিক ৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব করেছে। সেগুলো হলো ৫০ পয়সা বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫৪ টাকা, ১ টাকা বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৪ টাকা এবং ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ দশমিক ২৪ টাকা করা।
নথি অনুযায়ী, এসব প্রস্তাবের সঙ্গে গ্রাহক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট খুচরা মূল্য বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার বিদ্যুতের গড় পাইকারি ট্যারিফ ইউনিটপ্রতি ৭ দশমিক ৪ টাকা নির্ধারণ করলেও তা পিডিবির প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের সমান ছিল না। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়, যা সরকার ভর্তুকি দিয়ে আংশিকভাবে সমন্বয় করে আসছে।
বর্তমান ট্যারিফে বিদ্যুৎ বিক্রি চলতে থাকলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে গ্যাস, তেল ও কয়লা বেশি দামে কিনতে হওয়ায় এই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলেও নথিতে বলা হয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পাইকারি ট্যারিফ ইউনিটপ্রতি ৫০ পয়সা বাড়ালে সরকারের ভর্তুকি ৫ হাজার ২৪৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা কমবে। এক টাকা বাড়ালে কমবে ১০ হাজার ৪৮৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমতে পারে ১২ হাজার ৫৮৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
মন্ত্রণালয়ের যুক্তি, মূল্য না বাড়িয়ে বিদ্যুতের বর্তমান সরবরাহ ধরে রাখতে গেলে ভর্তুকির চাপ দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
এ প্রস্তাব এসেছে এমন সময়ে, যখন টানা কয়েক দিন ধরেই চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকছে।
পিডিবির দৈনিক উৎপাদন বিবরণী বলছে, ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যার পিক আওয়ারে চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট; উৎপাদন ১৪ হাজার ১৯৬ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং ১ হাজার ৮ মেগাওয়াট। ১৪ এপ্রিল চাহিদা নেমে আসে ১৪ হাজার ৭৯৯ মেগাওয়াটে; উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৮০ মেগাওয়াট, লোডশেডিং ৬৮৮ মেগাওয়াট। তবে ১৫ এপ্রিল আবার চাহিদা বেড়ে ১৫ হাজার ৩৯৮ মেগাওয়াটে পৌঁছালে উৎপাদন নেমে আসে ১৩ হাজার ৮৪৯ মেগাওয়াটে; লোডশেডিং বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮২ মেগাওয়াটে।
পিডিবির হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, এ ঘাটতির সবচেয়ে বড় কারণ ছিল গ্যাস সরবরাহে সীমাবদ্ধতা। ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যার পিক আওয়ারে গ্যাসজনিত সীমাবদ্ধতা ছিল ৫ হাজার ৭৪৪ মেগাওয়াট, ১৪ এপ্রিল ৫ হাজার ৬৫৩ মেগাওয়াট এবং ১৫ এপ্রিল ৫ হাজার ৬২২ মেগাওয়াট।
একই সময়ে কয়লা সরবরাহে সীমাবদ্ধতার কারণে ওই সময়ে যথাক্রমে ১ হাজার ৫৫২, ১ হাজার ৬২৩ এবং ১ হাজার ৬০২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হয়। এর বাইরে রক্ষণাবেক্ষণ ও বন্ধ অবস্থার কারণে উৎপাদনের বাইরে ছিল ১ হাজার ৮৪৪, ১ হাজার ৬৭০ এবং ১ হাজার ৭২৬ মেগাওয়াট।
পিডিবির তথ্যে ১৩ এপ্রিল গ্যাস সরবরাহ ছিল ৯০৭ এমএমসিএফডি, ১৪ এপ্রিল ৯২১ এমএমসিএফডি এবং ১৫ এপ্রিল ৯২৮ এমএমসিএফডি। কিন্তু এই সময়েও গ্যাস ও কয়লা ঘাটতির কারণে বড় অংশের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা যায়নি।
দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের মন্ত্রণালয়ের নথিতে বলা হয়, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার কৃচ্ছ্রসাধন, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নানা উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে দেশের সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার সরবরাহ সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে হলেও এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রাখা।
খুচরায় বাড়বে কত?
খুচরা দরের প্রস্তাবে শুন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী লাইফলাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে কোনো মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়নি।
তবে আবাসিক শ্রেণিতে বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এছাড়া বাণিজ্যিক, শিল্প ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও নতুন হার নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
নথিতে দাম বাড়ানোর বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের উদাহরণও টানা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কা আবাসিক, শিল্প ও হোটেল-সেবা খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। সিঙ্গাপুরে জ্বালানির দাম ‘পাস থ্রু’ আইটেম হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সেখাতে বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিউবোর সঙ্গে কারিগরি আলোচনা শেষে বিদ্যুৎ খাতের দক্ষতা বাড়ানো, ভর্তুকি কমানো এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিয়ে মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশ করেছে বলে নথিতে বলেছে।
মন্ত্রণালয়ের রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী পিডিবি প্রস্তাবিত এই তিনটি বিকল্পের মধ্য থেকে একটি এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খুচরা ট্যারিফ বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা নথিতে বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, অনুমোদন মিললে বাল্ক ও খুচরা ট্যারিফ বাড়ানোর বিষয়টি গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বরাবর পাঠানো হবে। এরপর বিইআরসি গণশুনানির মাধ্যমে পাইকারি ও সংশ্লিষ্ট খুচরা ট্যারিফ কার্যকরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ল খুচরায় ৮.৫%, পাইকারিতে ৫%
জ্বালানি-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চিন্তা নেই: প্রতিমন্ত্রী
জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা কমিটি, নীতি নির্ধারণে