Published : 23 Dec 2025, 01:34 AM
এবারের শীতে কল-কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ গত বছরের তুলনায় ‘ভালো’ থাকলেও বাসাবাড়িতে সংকট কাটেনি।
ঢাকার অনেক আবাসিক এলাকায় গ্যাসের সংকট তীব্র হওয়ার হওয়ার কথা বলেছেন বাসিন্দারা।
আবার কোনো কোনো এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত শীতের তুলনায় এবার তারা বেশি গ্যাস পাচ্ছেন।
গত সপ্তাহের কয়েক দিন ধরে ঢাকার গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) হিসাবে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ ২৫০ কোটি ঘনফুটের বেশি বাড়ানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে আবার স্থানীয় উৎপাদন বছরের ব্যবধানে কমেছে অন্তত ২০ কোটি ঘনফুট।
ফলে বিশ্ববাজার থেকে চড়া দামে গ্যাস আমদানি করে চাহিদার ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে সরকারকে।
প্রতি শীতেই ঢাকার বনশ্রী আবাসিক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায় অথবা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এবার পুরোপুরি বন্ধ না হলেও দিনের বড় অংশ জুড়ে গ্যাসের চাপ কম থাকছে বলে অভিযোগ ওই এলাকার কয়েক বাসিন্দার।
বনশ্রী জি- ব্লকের বাসিন্দা নিগার সুলতানা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শীত শুরু হওয়ার পর গত এক মাস ধরে সকালে ৭টার পর গ্যাস চলে যায়। দুপুর ২টার পর আবার গ্যাসের চাপ বাড়ে। মাঝখানের এই সময়ে চুলায় মিটিমিটি আগুন জ্বলে। এই আগুনে একটা ডিমও ভাজি করা যায় না।”
ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন ইস্কাটনের বাসিন্দা আরিফা বারী। এই শীতে গ্যাসের কোনো সংকট টের পাননি তিনি।
“এবার গ্যাস নিয়ে কোনো সমস্যা লক্ষ্য করিনি। দিন-রাতে গ্যাসের ভালো চাপ থাকছে। এবার শীত এলেও তেমন তীব্রতা নেই। সে কারণে হয়তো এমন হতে পারে,” বলেন আরিফা বারী।

দেশের উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামলেও ঢাকায় খুব একটা তীব্রতা নেই।
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা ফারজানা আফরোজ বলেন, শীতকাল শুরু হলেও এবার তাদের বাসায় গ্যাস থাকছে। তবে আশপাশের অনেক বাসায় দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে বলে তিনি পরিচিতদের অভিযোগ পাচ্ছেন।
বাসাবাড়ির চেয়ে তুলনামূলক বেশি স্বস্তিতে এবার শীতকাল পার করছেন গ্যাসের শিল্প সংযোগের গ্রাহকরা। গ্যাস নিয়ে শিল্প মালিকদের কাছ থেকে এবার তেমন কোনো অভিযোগ না পাওয়ার কথা বলছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন— বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিল্প কারখানায় এখন গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি গত কয়েক বছরের তুলনায় ভালো। কোথাও গ্যাস না থাকার অভিযোগ আমার কানে আসেনি। সরকার চেষ্টা করছে, এর ফলেই আমরা সঠিকভাবে গ্যাস পাচ্ছি, এটা বলতেই হয়।”
“আগে যেখানে গ্যাসের চাপ ৩ থেকে ৪ পিএসআই থাকত, কখনও কখনও শূন্যের কোটায় নেমে আসত, এখন দিনে-রাতে গ্যাসের চাপ ৭ থেকে ৮ পিআআইয়ের মধ্যে থাকছে। আপাতত কোনো অভিযোগ নেই,” বলেন হাতেম।
রপ্তানিমুখী আরেক শিল্প বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে গ্যাসের চাহিদাও কমে গেছে। সাধারণত শীত কালে গ্যাসের চাপ কম থাকে। এবার কারখানাগুলো থেকে তেমনটা শুনিনি।”

কমছে উৎপাদন, বাড়ছে আমদানি
পেট্রোবাংলার নিয়মিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশীয় কূপগুলো থেকে দৈনিক ১৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা যেত। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এসে সেই উৎপাদন দৈনিক ১৬৫ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।
এই সময়ের মধ্যে বেশ কিছু পুরোনো গ্যাসকূপ সংস্কার ও নতুন কূপ আবিষ্কার হলেও অনেক কূপ বন্ধ হয়ে গেছে বা উৎপাদন কমেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বুধবার সারা দেশে প্রায় ২৫৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে পেট্রোবাংলা, যা এক বছর আগে ছিল ২৭০ কোটি ঘনফুট।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে দৈনিক গড়ে ৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “মোটামুটি টানাটানির মধ্য দিয়ে গ্যাস পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করে এই বাড়তি চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে।
“এখন নতুন করে যমুনা সার কারখানাটি চালু করা হয়েছে। তবুও শীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের চাহিদা কম থাকায় অন্যান্য গ্রাহকদের সরবরাহ চালু রাখা যাচ্ছে।”
সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানির জন্য গভীর সমুদ্রে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করেছে।
এসব টার্মিনাল হয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বছরে ৫৬ কার্গো এলএনজি আমদানি হচ্ছে। এর বাইরে ওপেন মার্কেট বা আন্তর্জাতিক খোলা বাজার থেকেও নিয়মিত এলএনজি কেনা হচ্ছে। তবে চলতি বছর খোলা বাজার থেকে অন্য বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এলএনজি আমদানি করেছে সরকার।
পেট্রোবাংলার এই পরিচালক জানান, চলতি বছর মোট ১০৯ কার্গো এলএনজি কিনেছে সরকার, যা গত বছর ছিল ৮৮টি। গতবছর খোলা বাজার থেকে ৩০ কার্গো এলএনজি কেনা হলেও এবছর কেনা হয়েছে ৫৩ কার্গো এলএনজি।
“গ্যাসের দেশীয় উৎপাদন কমছে, সে কারণে আমাদেরকে আমদানি বাড়াতে হচ্ছে। পাশাপাশি গ্যাস কূপ খনন অব্যাহত আছে। বাপেক্সের ৫টি রিগই এখন খননকাজে ব্যস্ত রয়েছে,” বলেন তিনি।