Published : 26 Sep 2025, 01:43 AM
দুর্বল যে পাঁচ ব্যাংক মিলে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, সেখানে আইনি জটিলতাসহ কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। এগুলোর সমাধান না এলে ঝুলে যেতে পারে একীভূতকরণের এই প্রক্রিয়া।
ব্যাংকগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ, আমানতকারী ও পুঁজিবাজারের ব্যাংকগুলোর শেয়ারধারকদের বিষয়গুলো কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, রাজনৈতিক সরকার আসার আগে একীভূতরণ প্রক্রিয়া শেষ করা যাবে কি না, সেসব প্রশ্ন সামনে রেখে আইনি সমাধান খুঁজতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অবসায়ন না হয়ে একীভূত হলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, আমানতকারীদের পুরো অর্থ ফেরত দিতে হবে, এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে হবে সরকারকে।
অন্য দিকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-বিএসইসির নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ পুরোটা সংরক্ষণ করতে হবে।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগের প্রথম ধাপে গত ১৬ সেপ্টেম্বর ব্যাংকগুলোতে প্রশাসক বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে সেদিন মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে প্রশাসক বসানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’’

ব্যাংকগুলোর নাম সবাই জানে, বলছে না বাংলাদেশ ব্যাংক
ইসলামি ধারার যে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার সেসব ব্যাংকের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়।
সংবাদ মাধ্যমে আসা পাঁচ ব্যাংকের নামের বিষয়ে কোনো আপত্তিও করেনি কেউ। এ ব্যাংকগুলো হল-ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। সবগুলো ব্যাংকই দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত।
একীভূতকরণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে ইতোমধ্যে পাঁচ ব্যাংকের পর্ষদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈঠক করেছে।
এসব ব্যাংককে একীভূত করে শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নতুন শরীয়াহভিত্তিক একটি ব্যাংক গঠন করা হবে। ওই ব্যাংকে এসব ব্যাংকের সম্পদ ও দায় হস্তান্তর করা হবে।
এসব ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ও এসআইবিএল মার্জ হতে আপত্তি জানিয়েছে। দুটো ব্যাংকের পরিচালকরা মনে করছেন, সময় দিলে তারা ঘুড়ে দাঁড়াতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত একীভূত ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মূলধন হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকা দেবে সরকার। বাকি ১৫ হাজার কোটি আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে আসতে পারে। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পরিবর্তন হলে ব্যাংক খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে আলোচিত পাঁচ ব্যাংকে আসে নতুন পর্ষদ। তার আগে এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী এস আলমের হাতে।

এ দুই ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় ব্যাংকগুলো থেকে ‘লাখ লাখ কোটি’ টাকা পাচার হয় বলে ভাষ্য গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের। এসব ব্যাংক সংস্কারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠন করে টাস্কফোর্স; আর ‘প্রকৃত’ আর্থিক চিত্র জানতে বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে করা হয় নিরীক্ষা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত নিয়ে তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংকের বিষয়ে তৎপরতা শুরু করেছে পুরো প্রক্রিয়ায় এখনো কোনো কিছুই না জানা বিএসইসি।
সংবাদমাধ্যমে খবর আসার পর ইতোমধ্যে আলোচনায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে তিনটির কাছে একীভূতকরণ নিয়ে জানতে চেয়েছে বিএসইসি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।
সব ব্যাংকই ডিএসইর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে, একীভূতকরণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেয়নি তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫’, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ব্যাংক আমানত বীমা আইন, আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ (খসড়া) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর আইনি বিষয়গুলো পর্যালোচনা শেষে ব্যাংক একীভূতকরণের প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আমানতকারীরা কি পুরো অর্থ পাবেন?
ব্যাংক অবসায়ন না হওয়ায় আমানতকারী ও সাধারণ শেয়ারধারকদের পুরো অর্থ দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গঠিত ‘ওয়ার্কিং কমিটির’ প্রতিবেদন পেয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
একীভূত ও অধিগ্রহণ হলে বা শুধু একীভূত হলেও আমানতকারীরা পুরো অর্থ ফেরত পাবেন আইন অনুযায়ী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “আমানতকারীরা তো এখন দুশ্চিন্তায় আছেন। তাই অনেকেই আমানত তুলে নিতে চাচ্ছেন। যাদের একেবারেই প্রয়োজন নেই, তাদের আমানত না তোলার অনুরোধ করবো। কারণ হচ্ছে, কারো আমানত নিয়ে কোনো টেনশন নেই। ব্যাংক তো বন্ধ হবে না, সব ব্যাংক মিলিয়ে নতুন ব্যাংক হবে। তাদের আমানত তো নতুন ব্যাংকে যাবে, সেখানে থাকবে।’’
তিনি বলেন, “নতুন ব্যাংক তো সরকারের মালিকানায় থাকবে। তাই আমানত নিয়ে দুশ্চিন্তা করা লাগবে না।’’
ব্যাংক অবসায়ন হলে আমানত বীমা আইন অনুযায়ী প্রতি হিসাবের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন আমানতকারীরা।
আরিফ হোসেন বলেন, “ব্যাংক তো অবসায়নে যাচ্ছে না। তাই ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আসবে কেন। আমরা বলেছি, প্রয়োজনে আমানত বীমা তহবিলের সহায়তা নেওয়া হবে, আর কিছুই না। সেখানকার তহবিল আসতে পারে ব্যাংকের প্রয়োজনে।’’

আইনে যা আছে
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯১৯ (সংশোধিত-২০২৩) এর ৫৮ ধারা অনুযায়ী, আমানতকারীদের ক্ষতি হতে রক্ষা, আমানতকারীদের স্বার্থে বা ব্যাংক নীতির স্বার্থে সরকার যেকোনো ব্যাংক ও কোম্পানি অধিগ্রহণ করতে পারে।
৫৮(ই) ধারায় বলা আছে, “তাহা হইলে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহিত আলোচনাক্রমে, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপিত আদেশ দ্বারা, উক্ত আদেশে নির্ধারিত তারিখ হইতে, উক্ত ব্যাংক-কোম্পানী অথবা উহার এক বা একাধিক শাখা অথবা উহার অধীনস্থ কোন প্রতিষ্ঠান, অতঃপর অধিগৃহীত ব্যাংক বলিয়া উল্লিখিত, অধিগ্রহণ করিতে পারিবে।”
একই ধারার ৪ নম্বর উপধারা অনুযায়ী, “কোনো স্কিমের আওতায় যেকোনো ব্যাংক কোম্পানিকে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নিকট হস্তান্তর করতে পারবে সরকার। দুই ক্ষেত্রেই অধিগ্রহণকৃত ব্যাংকের দায়-দেনা সরকার বা গ্রহীতা ব্যাংক বহন করবে।”
ব্যাংক একীভূত করতে এই আইনের পাশাপাশি ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ পর্যালোচনা করছে সরকার।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের ১০(গ) ধারায় ‘সার্বিকভাবে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা’ করতে বলা হয়েছে।
একই ধারার ২ নম্বর উপধারায় ‘ইসলামী ব্যাংকসমূহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক রেজল্যুশনের উদ্দেশ্যসমূহ, প্রয়োজনে, প্রবিধান দ্বারা সুস্পষ্ট করিতে পারিবে’ বলা আছে।
এজন্য ইসালামি তথা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করতে পৃথক নীতিমালা তৈরি করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে, যা এখনো হয়নি।
অপর দিকে, ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রশাসক হতে হবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করতে হবে।
দুটি পত্রিকায় ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার কথা বলা হলেও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। কবে নাগাদ প্রশাসক নিয়োগ হতে পারে সে বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারেননি তিনি।
যা ভাবছে বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা ও ব্যাংকিং খাত সংস্কার গঠিত টাস্কফোর্সের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যাংক একীভূত করতে নতুন একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর নাম ‘ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’ দেওয়ার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
ব্যাংক রেজল্যুশেন অধ্যাদেশ এর ক্ষমতা বলে ব্যাংক একীভূত করতে ‘ব্যাংক পুনর্গঠন রেজল্যুশন তহবিল’ গঠন করা হবে। ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও তাতে মূলধন যোগাবে এই তহবিল।
ব্যাংক একীভূত করতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে আমানত বীমা তহবিল থেকে নেওয়া হবে ১০ হাজার কোটি টাকা।
প্রাথমিকভাবে নতুন ব্যাংক শরীয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের সব সম্পদ ও দায় নিয়ে নেবে।
তারপর সুবিধাজনক সময়ে তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হবে। মধ্যবর্তী সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠা করা ব্যাংককে ‘বিজ্র ব্যাংক’ বলা হয়েছে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে।
অধ্যাদেশের ৩০ ধারায় ‘ব্রিজ ব্যাংকের’ সংজ্ঞায় বলা আছে, “ব্রিজ ব্যাংক অর্থ রেজল্যুশনের অধীন তফসিলি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম এবং কার্যকর পরিচালন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা এবং পরিশেষে তৃতীয় পক্ষের নিকট উহা বিক্রয় করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি ব্যাংক।’’

বিএসইসি কি জানে? কী করতে চায় তারা
পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরু করলেও বিএসইসিকে এখনো সম্পৃক্ত করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার।
একীভূত হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কী হবে সেই উত্তর খুঁজছেন অনেকে।
পুঁজিবাজারের মাধ্যমে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করা মোহম্মাদ ফেরদৌস আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি তো শেয়ার কিনেছি পুঁজিবাজার থেকে। আমার মত কয়েক লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী আছে। কেউ তো পর্ষদে যায়নি, ঋণ নেয়নি বা ব্যাংক পরিচালনা করেনি। আমরা তো বছর শেষে লভ্যাংশ পাওয়ার আশায় বিনিয়োগ করেছি।
“আমাদের তো কোনো দোষ নেই। তাহলে আমরা নতুন ব্যাংকের শেয়ার কেন পাবো না। যদি শেয়ার নাই দেয়, তাহলে ক্ষতিপূরণ দিক।’’
এমন প্রেক্ষাপটে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তরফে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ‘ক্ষতিপূরণ’ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা শুরু করবে বলেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা।
বিএসইসি বলছে, তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংক অবসায়নে না যাওয়ায় ইতোপূর্বে একীভূত হওয়া কোম্পানির শেয়ারধারকদের মত এ ক্ষেত্রেও সমাধান চাইবে তারা।
সেখানে এক প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সময়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আনুপাতিক হারে নতুন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পেয়েছেন।
এজন্য ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ এর ৭৭ নম্বর ধারা অনুসরণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের কাছে বক্তব্য উপস্থাপন করবে, তাও বলছে বিএসইসি।
তারা বলছে, ব্যাংকের সম্পদ ও তহবিল অপব্যবহারের জন্য দায়ী শেয়ারধারকদের বাদ দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার দেওয়ার জন্য দাবি করা হবে।
এ বিষয়ে বিএসইসি মুখপাত্র ও পরিচালক আবুল কালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আইন অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে কমিশন।”
ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশের ‘প্রতারণামূলকভাবে ব্যাংকের সম্পদ অথবা তহবিল ব্যবহার অথবা অপব্যবহারের জন্য দায়ী ব্যক্তিগণ’ শিরোনামে ৭৭ নম্বর ধারায় ‘দায়ী ব্যক্তিগণ’ এর সংজ্ঞায় বলা আছে, “তাহারা, যাহাদেরকে এই অধ্যাদেশের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো আইনের অধীনে অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ তাহাদের কর্ম, নিষ্ক্রিয়তা এবং সিদ্ধান্তের ফলে তফসিলি ব্যাংকের সম্পদ বা তহবিল প্রতারণামূলকভাবে ব্যবহার বা অপব্যবহারের জন্য দায়ী হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছে, যাহার মধ্যে নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণও অন্তর্ভুক্ত-
>> উল্লেখযোগ্য শেয়ার ধারকগণ।
>> পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যগণ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক অথবা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, মুখ্য ব্যবস্থাপনা কর্মীগণ এবং তফসিলি ব্যাংকের অন্যান্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণ, যাহারা স্ব স্ব দায়িত্বের জন্য দায়ী থাকিবেন।
>> ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠান।
>> দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪০৩ এবং ৪০৪-এর বিধান অনুযায়ী অসৎভাবে সম্পত্তি আত্মসাতকারী ব্যক্তি।
>> মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ধারা ২(শ)-এর অধীনে অপরাধকারী ব্যক্তি। অথবা
>> এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক চিহ্নিত অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক বা আইনি ব্যক্তি।
তবে ‘ক্ষতিপূরণ’ দেওয়াটা ‘রাজনৈতিক’ সিদ্ধান্ত হতে পারে মন্তব্য করে বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আর্থিক প্রতিষ্ঠান চলে আইন অনুযায়ী ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চর্চা। ক্ষতিপূরণ দেওয়াটা আর্থিক ব্যবস্থাপনার দিক দিয়ে যায় না। এখানে সম্পদ ও দায় মূল্যায়ন করার পর সে অনুযায়ী আন্তর্জাতিক চর্চাটা সামনে আসে।”
শেয়ারধারকরা কারা সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ শেয়ারধারক বলা হলেও দেখা যাবে অনেক শেয়ারের প্রকৃত মালিক ভিন্ন কেউ। দেখা দরকার এসব শেয়ারের প্রকৃত মালিক কারা। যার নামে শেয়ার কেনা, তার সম্পদ ও কর ফাইলের সঙ্গে সাযুজ্য হয় কি না, তাও দেখা যেতে পারে।’’

যে কারণে ঝুলে যাওয়ার শঙ্কা
একীভূত মানে পাঁচ ব্যাংকের সম্পদ, জনবল, শাখা, ঋণ, আমানত, ব্যবহৃত প্রযুক্তি, মানব সম্পদ নীতিমালা, নিজস্ব চাকুরি বিধিমালা, নিজস্ব বিনিয়োগ নীতিমালা, আমানতকারী, শেয়ারধারক ও দায় দেনাসহ সবকিছু একটিতে রূপান্তরিত করা।
এই প্রক্রিয়ার দুটো দিক রয়েছে মন্তব্য করে জাহিদ হোসেন বলেন, “একটি হচ্ছে একীভূত করার সিদ্ধান্ত, যা সরকার নিয়েছে। এখানে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের নিজস্ব মতামতের সুযোগ নেই। কারণ, তারা তো ব্যাংক চালাতে পারছে না।
“আরেকটি হচ্ছে কারিগরি দিক। খাতভিত্তিক সবগুলোর বিষয়ে পাঁচ ব্যাংকের পাঁচ ধরনের নীতি রয়েছে। সেগুলো মিলিয়ে একটি করতে হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো, যা ‘সিস্টেম’ নামে পরিচিত তা একটি করতে হবে। সম্পদ মূল্যায়ন ও দায়-দেনার প্রতিবেদন তৈরি করে একটি সমন্বিত প্রস্তাব দিতে হবে।”
বিশাল এই কাজটি এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা দরকার, বলছেন এই অর্থনীতিবিদ।
টাস্কফোর্সকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার চাইছে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংক একীভূত করার কাজটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে।
কারণ সামনের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল এই সময়ে ঘোষণা হতে পারে।
টাস্কফোর্স বলছে, ডিসেম্বরের আগে ব্যাংক একীভূত করা জন্য আরো দুটো আইন করতে হবে সরকারকে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘আমানত সুরক্ষা আইন’ তৈরি। এটি বর্তমানে ‘আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ (খসড়া)’ অবস্থায় রয়েছে।
অন্যটি হচ্ছে ‘ডিসট্রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট (ডামা)’ বা দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন। এই আইনের খসড়া এখনো প্রস্তুত করা হয়নি।
এই আইনের মাধ্যমে একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর খেলাপী ঋণগুলো বিক্রি করে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এ দুটো আইন নির্বাচনের আগে তৈরি ও বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে ব্যাংক একীভূত করতে হলে।
সেটি না পারলে নতুন সরকার ব্যাংক একীভূত করার এই পরিকল্পনা মানবে কি না, সেই প্রশ্ন তুলে অথনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “ব্যাংকগুলো যদি এই অবস্থায় থাকে তাহলে সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয় হবে, এগুলো আগামীতে আরো ভোগাবে ব্যাংক খাতকে। কারণ হল-এসব ব্যাংকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহায়তায় যে অনাচার, দুর্নীতি হয়েছে তা গোটা বিশ্বে নজিরবিহীন।
“আগামী নির্বচানের পর নতুন রাজনৈতিক সরকার এলে আর্থিক খাতের শক্তিধর ব্যক্তিরা এ প্রক্রিয়া (মার্জ) বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টাটা করবে তা অমূলক না।’’