আমার ভাবনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও উন্নয়নে ‘কিছু অমীমাংসিত বিষয়’

অসীম ডিও
Published : 24 April 2022, 05:03 PM
Updated : 24 April 2022, 05:03 PM
দেশে প্রতিবার আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস পালিত হয়ে আসছে। তাতে কতটুকু কী হয়েছে জানি না। আমি নিজে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার নিয়ে কাজ করছি খুব বেশি দিন হয়নি। এই নাতিদীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতায় আমার ভাবনায় জমা হয়েছে বেশ কিছু কথা।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনের (২০১৩) আলোকে প্রণীত বিধিমালা এবং জাতীয় কর্মপরিকল্পনা কতখানি বাস্তবায়ন হয়েছে তা আজও অনেক বড় একটি প্রশ্ন। এই আইনের আওতায় গঠন করা শহর পর্যায় থেকে উপজেলা, জেলা ও জাতীয় সমন্বয় কমিটি এক প্রকার অকার্যকরই থেকে গেছে। সরকারি, বেসরকারি, সুশীল সমাজ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন সমূহের সমন্বিত, বড় ও কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনও পর্যন্ত আমার জানা মতে নেই।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্বোধনের ক্ষেত্রে শব্দচয়নেও অনেক বিতর্ক রয়ে গেছে। কেউ সম্বোধন করছেন 'বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তি বা শিশু', কেউ বা সম্বোধন করছেন 'ভিন্ন ভাবে সক্ষম', কেউ বলছেন 'অক্ষম' আবার সরকার বলছেন 'সুবর্ণ নাগরিক'।

অথচ জাতিসংঘের  প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদ এবং দেশীয় আইনে যে শব্দ স্বীকৃত তা যথাযথ মর্যাদা ও আবেগ দিয়ে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অনেক পক্ষেরই অনীহা লক্ষ্য করা যায়। শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে এই বিশৃঙ্খলার অবসান হওয়া উচিত।

৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবস হিসেবে পালন করা উচিৎ। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই দিবসকে 'প্রতিবন্ধী দিবস' হিসেবেই পালন করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের উচিৎ এই দিবসকে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবস হিসেবে পালন করা।

নীতি কাঠামো বিবেচনায় বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অনেক আদর্শ নীতিমালা ও আইন ইতোমধ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের অবস্থা খুবই সঙ্গীন।

বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, দুর্যোগ প্রশমন সংক্রান্ত নীতিমালা যেমন সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক, ঢাকা ঘোষণা, জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন সংক্রান্ত নীতিমালা –  কোথায় নেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তির কথা। এই সব নীতিমালা আর নীতিকাঠামোর সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে প্রান্তিক প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী ও তাদের সংগঠনসমূহ উন্নয়নের অংশীদার হতে পারছে না।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কেন্দ্রিক সরকারের উন্নয়ন কৌশল অনেক বেশি ভাতা নির্ভর রয়ে গেছে। কল্যাণ সাধনের দর্শনকে ছেড়ে অধিকার ভিত্তিক উন্নয়নের দর্শনকে ধারণ করার কাজটি আমাদের সরকার এখনও করে উঠতে পারেনি। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর নামমাত্র অংশই এই প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ থাকে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর যে কৌশলপত্র বাংলাদেশ সরকার করেছে তার যথাযথ বাস্তবয়ন করা জরুরি।

প্রতিবন্ধী শিশু ও শিক্ষার্থীদের জন্য একীভূত শিক্ষা নিয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো উপসংহারে পৌঁছানো যায়নি এখনও। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ একীভূত শিক্ষার কথা বললেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তার ধরণ, সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া, শিক্ষা জীবনের সকল স্তরকে বিবেচনায় রাখা ইত্যাদি বিষয় এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে বলে মনে করি।

প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের বেশ কিছু কর্মসূচি সুফল আনছে ঠিকই। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষায় একীভূত শিক্ষার বিষয়টি আরও মনোযোগের দাবিদার বলে মনে করছি।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিসংখ্যান নিয়েও জটিল একটি পরিস্তিতি বাংলাদেশে তৈরি হয়ে আছে। সরকারের একেক সংস্থা একেক রকম পরিসংখ্যান দিয়ে থাকেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ কেউ বলেন ১০ শতাংশ, কেউ আবার বলেন ১৫ শতাংশ। আমাদের পরিসংখ্যান বিভাগ বলে এক কথা তো সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় বলে আরেক কথা। পরিসংখ্যান নিয়ে এই জটিল পরিস্থিতি থেকে আমাদের খুব শিগগিরই উত্তরণ হওয়া জরুরি।

এভাবে আরও অনেক বিষয় যেমন কর্মসংস্থান, কারিগরি শিক্ষা, প্রবেশগম্যতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ইত্যাদি বিষয়ে কিছু কিছু অগ্রগতি থাকলেও মোটা দাগে উদযাপন করার মত তেমন কোনো অর্জন নেই। এর পেছনে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি, বেসরকারি, সুশীল সমাজ, ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন সমূহের দ্বিধা ও সমন্বয়হীনতাই অনেক বেশি দায়ি বলে আমি মনে করি।

এর বাইরেও আরও অনেক বিষয় রয়ে গেছে যেগুলো নিয়ে কাজ করা খুবই জরুরি। এসব বিষয়সমূহ আমার অভিজ্ঞতা থেকে নিজস্ব চিন্তার খোড়াক। অনেকেই হয়ত দ্বিমত করতে পারেন। তবে প্রতিবন্ধী মানুষ বিশেষ করে প্রান্তিক প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য সুন্দর আগামী নিশ্চিত করতে হলে সরকারি, বেসরকারি, প্রাইভেট সেক্টর, সুশীল সমাজ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন সবাইকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।
অমীমাংসিত বিষয়  নিয়ে পদ্ধতিগত ও গঠনমূলক বিতর্ক, উত্তরোত্তর গবেষণা ও চর্চার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে হবে। তাছাড়া সকলের বসবাসযোগ্য সোনার বাংলা গড়া অথবা টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জন আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক