‘নিউটন’ কি শুধু এক সরকারি চাকুরের আখ্যান?

তন্ময় সাগর
Published : 23 May 2020, 04:50 PM
Updated : 23 May 2020, 04:50 PM

এর আগে বেশ কয়েকবার দেখতে বসেও দেখা হয়নি। শেষ পর্যন্ত  সিনেমাটা পুরো দেখা হলো। তারপর থেকেই ভাবছি 'নিউটন' কি শুধুই এক কর্তব্যনিষ্ঠ ক্ষেপাটে সরকারি কর্মচারীর আখ্যান? না কি  রাজনীতির নেতিবাচক ভাবমূর্তিরও বয়ান?

হিন্দু মাইথোলজির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দণ্ডকারণ্য। সেই দণ্ডকারণে প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে ভোট নিতে যাওয়া অতি সময়নিষ্ঠ সরকারি কর্মচারী নিউটন কুমারের গল্প নয় এই 'নিউটন' ।

ভোট কেন্দ্রে পৌঁছে স্কুলঘর বা পাশের বাড়ি-ঘর পোড়া, বিধ্বস্ত দেখতে পায় নিউটন কুমার। কে পোড়াতে পারে? এর উত্তর কৌশলে এড়িয়ে যায় আত্মা সিং। কে পুড়িয়েছে তাতে কী যায় আসে? আত্মা সিং ভারতীয় আর্মির কমান্ডার সেখানকার। ভোট গ্রহণের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তারই।

আত্মা সিং শুরু থেকেই নিউটন কুমারকে নিরুৎসাহিতই করেনি শুধু, রীতিমত ভয় দেখিয়ে আসছিলো যেন সেখানে ভোট নিতে যাওয়া না হয়। প্রিজাইডিং অফিসার নিউটন কুমারের আদেশ পদে পদে লঙ্ঘন করছিলো ভারতীয় বাহিনী। মাওবাদী বা নকশালবাদীদের হামলার আশংকা ব্যক্ত করা হচ্ছিল বার বার ।

যদিও নিউটন কুমারের উপলব্ধি ছিল উল্টো। কোনো আশংকাই সে বোধ করেনি। নিজের দায়িত্ব পালন করাকেই একমাত্র কাজ হিসেবে জেনেছে সে। মাওবাদী জুজুর ভয় দেখিয়ে ভারতীয় বাহিনীর দ্বারাই ভয়ের আবর্ত তৈরি করে রাখা হয়েছে নিউটন কুমারের ভাবনা ছিল এমনই।

এস্টাব্লিশমেন্ট কীভাবে মিডিয়াকে ধোঁকা দেয়, মিডিয়া কীভাবে এস্টাব্লিশমেন্টের কাছে বোকা বনে যায় তার চমকপ্রদ কিন্তু নগ্ন রুপের দেখা মেলে নিউটনে।

শেষে এসে নিউটন কুমারের অস্ত্রধারণ অতি নাটকীয় লেগেছে। নিউটন কুমারের ভাষায় শুধুমাত্র ডিউটি পালনের জন্য কেউ অস্ত্র ধরছে, এটা বাড়াবাড়ি। নিউটন কুমার ঘড়ির কাঁটায় সময় মেনে দায়িত্ব পালন করেন। তার পুরস্কার রাষ্ট্রীয় এস্টাব্লিশমেন্ট তাকে দিয়েছে বৈকি; মানপত্র ধরিয়ে দিয়েছে। পুরুস্কার সে আরো একটা পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে গণধোলাই। বাহিনীগুলোর সম্মতির বাইরে গেলে অতিকর্তব্য পরায়ন কাউকেও যে ধোলাই না দিয়ে ছাড়া হয় না, ছাড় পায় না, তারই হিসেব নিউটন কুমারের ধোলাই।

ছত্রিশগড়ে চলমান মাওবাদী সংকটে সরকারের এস্টাব্লিশমেন্টের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ নিউটন কুমার স্থানীয় নারী মালকো নেতামের সাথে চিন্তাগত সাযুজ্য খুঁজে পায়। নিপীড়িত সেই নারীর মত সেখানকার আদিবাসীদের দুঃখ-দুর্দশার কারণ বুঝলেও, অক্ষম অসহায় নিউটন কুমার আফসোস ও অক্ষম ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব রোবোটিকভাবে পালন করে যায়।

বিশাল ব্যায়ের নির্বাচন যে আদতে একটা প্রহসন তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হয়েছে সিনেমায়। ভুয়া অ্যাম্বুশ করে শুধু নিউটন কুমারের দায়িত্ব পালন করাকেই বাধাগ্রস্ত করা হয়নি, ভোট দিতে আসা অসহায় সরল আদীবাসীদের সাথে শঠতাও করা হয়েছে।

তবে বাস্তবে  নিউটন চলচ্চিত্র শুধু ছাড়পত্রই পায়নি,  এর নির্মাণে ছত্রিশগড়ের বনমন্ত্রী, কালেক্টরেট, পুলিশের দপ্তর, সাবেক নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় রাজনৈতিক দল সবাই সহযোগিতা করছে। কেন করেছে? আর ওদের সেন্সরবোর্ড এতো সাহস পায় কোথায়? যারা বানায় তারাই বা কোথায় পায় এতো সাহস?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক