বাংলাদেশের দূতকে ডেকে ফের আরাকান আর্মি ও আরসাকে দুষল মিয়ানমার

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, মিয়ানমারের এ ধরনের বক্তব্য ‘গতানুগতিক’।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 20 Sept 2022, 04:57 AM
Updated : 20 Sept 2022, 04:57 AM

ইয়াঙ্গনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নিয়ে সীমান্তে মর্টার হামলার দায় আরাকান আর্মি ও আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) ওপর চাপিয়েছে মিয়ানমার সরকার।

একইসঙ্গে বাংলাদেশের ভেতরে আরাকান আর্মি ও আরসার ‘ঘাঁটি’ থাকার অভিযোগ তুলে সেগুলোর তদন্ত ও অপসারণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সোমবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মনজুরুল করিম খান চৌধুরীকে ডেকে নিয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক উ জাউ ফিউ উইন।

এরপর রাতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফেইসবুক পেইজে এক বিবৃতিতে সেই বৈঠকের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়।

সেখানে বলা হয়, ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের তুলে ধরা বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে গোলাগুলির বিষয়ে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে ইয়াঙ্গনের অবস্থান তুলে ধরেছেন মহাপরিচালক ফিউ উইন।

“মহাপরিচালক বলেছেন, আরাকান আর্মি ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরসা ১৬ সেপ্টেম্বর বিপি-৩১ নম্বরের বর্ডার গার্ড পুলিশের তাউংপিও চৌকিতে মর্টার হামলায় চালায়, যার মধ্যে তিনটি মর্টার বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে পড়ে।

“তিনি আরও ব্যাখ্যা করেছেন, আরাকান আর্মি ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরসা পুনরায় একই অস্ত্র ব্যবহার করে এবং ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর তারিখে বিপি-৩৪ নম্বরে বর্ডার গার্ড পুলিশের তাউংপি্উ চৌকি আক্রমণ করে, যেখানে নয়টি মর্টার শেল এসে পড়ে বাংলাদেশের মাটিতে।”

Also Read: নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে আতঙ্ক, ঝুঁকিপূর্ণদের ‘তালিকা হচ্ছে’

Also Read: মিয়ানমারের গোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে, হতাহতের খবর

Also Read: মিয়ানমার থেকে গোলা আসা বন্ধ না হলে জাতিসংঘে তুলব: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “বাস্তব ঘটনা তুলে ধরে মহাপরিচালক বলেছেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান আন্তরিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে অব্যাহতভাবে এ ধরনের হামলা চালিয়ে আসছে আরাকান আর্মি ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরসা।

“মহাপরিচালক বলেছেন, সীমান্ত নিকটবর্তী এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি মিয়ানমার সবসময় দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি মেনে চলে এবং বাংলাদেশসহ সব দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে শ্রদ্ধা জানায়।”

বিবৃতিতে বলা হয়, সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমার একজোট হয়ে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন মহাপরিচালক। এবং এক্ষেত্রে বাংলাদেশের দিক থেকে ‘সম্পূর্ণ ও একই ধরনের সহযোগিতা’ পাওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

“বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি ও আরসা সন্ত্রাসীদের পরিখা ও ঘাঁটি থাকার তথ্য ৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে কূটনৈতিক মাধ্যমে বাংলাদেশকে জানানোর কথা রাষ্ট্রদূতকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মহাপরিচালক। এবং এক্ষেত্রে সরেজমিন তদন্ত এবং সেসব স্থাপনা ও ঘাঁটি ধ্বংসে প্রয়োজনীয় ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমারের আহ্বান তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।”

বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন ঘটনাবলির ‘বাস্তব তথ্য’ দিয়ে একটি আন-অফিসিয়াল পেপার এদিন রাষ্ট্রদূতের কাছে হস্তান্তর করেছে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সেখানে বলা হয়েছে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে গোলাগুলির ‘সত্যিকারের ভাষ্য’ ১৮ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। আর সেটা কূটনৈতিক মাধ্যমে ৭ সেপ্টেম্বর ও ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে।

Also Read: মিয়ানমার সীমান্তে বিজিবিতেই আস্থা রাখছে সরকার

Also Read: রোহিঙ্গা সঙ্কটের ৫ বছর: আটকে প্রত্যাবাসন, চিন্তা বাড়াচ্ছে জন্মহার

মিয়ানমারের দিক থেকে আরাকান আর্মিকে দায়ী করে এর আগে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে বলে রোববার জানিয়েছিলেন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল খুরশেদ আলম। ইয়াঙ্গনের ওই বক্তব্যকে ‘গতানুগতিক’ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন তিনি।

সীমান্তে গোলাগুলির ঘটনায় ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর চতুর্থবারের মত তলব করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নে খুরশেদ আলম সেদিন বলেছিলেন, “তাদের গতানুগতিক একটা উত্তর আছে যে, এটা আমাদের এখান থেকে হয়নি, এটা আরাকান আর্মি করছে। এটাই তারা বলতে থাকে। তারা এই রকম দোষও দেয় যে, আরাকান আর্মি আমাদের এখান থেকে যায়। উনাদের একটা বক্তব্য আছে যে, এগুলো হয়ত আরাকান আর্মির গোলাগুলি হতে পারে।

“আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, আপনাদের দেশের অভ্যন্তর থেকে যা কিছু আসুক না কেন, সেটা আপনাদের দায়িত্ব। সেটা আপনারা দেখবেন। আমাদের এদিকে যাতে কিছু না আসে, সেটা আপনারা নিশ্চিত করবেন। এটা করার জন্য যা কিছু করার দরকার, আপনারা পদক্ষেপ নেবেন।”

সীমান্তের ঘটনাকে এখনও ‘দুর্ঘটনা’ হিসাবে দেখছেন জানিয়ে নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা খুরশেদ সেদিন বলেছিলেন, “আসলে যেহেতু এটা একটা দুর্ঘটনা বলা যায়… আমরা নিশ্চিত করতে পারতেছি না যে, এ গুলিটা কে করেছে।

“গুলিটার গায়ে লেখা আছে মিয়ানমার আর্মি। মিয়ানমার বলছে, এ গুলিগুলো চুরি করে আরাকান আর্মি নিয়ে গেছে। তারা এ গুলিগুলো করতেছে। যাতে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের একটা দূরত্বের সৃষ্টি হয়। এ রকম একটা জায়গায় অ্যাকচুয়ালি কে দায়িত্ব নেবে, সেটা নিরূপণ করা খুবই কঠিন কাজ। তবে আমরা চেষ্টা করছি।”

২০১৭ সালের অগাস্টে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। সব মিলিয়ে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার অধিকাংশই সীমান্ত জেলা কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে রয়েছেন।

তাদের ফেরত নিতে দুই দেশের সরকার চুক্তিবদ্ধ হলেও পাঁচ বছরেও প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি, আর সেজন্য মিয়ানমারকেই দায়ী করে আসছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

এর মধ্যে গত অগাস্টের মাঝামাঝি সময়ে মিয়ানমারের রাখাইনদের সংগঠন আরাকান আর্মির সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীর নতুন করে সংঘাত শুরু হয়।

শুরুর দিকে বাংলাদেশের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু, কোনার পাড়া, উত্তর পাড়া ও বাইশফাঁড়িসহ বিভিন্ন সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের গোলাগুলির খবর আসছিল। পরে পুরো নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে তা ছড়িয়ে পড়ে।

ওই এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই দিনে ও রাতে থেমে থেমে গোলাগুলি চলছে। মাঝে মধ্যে হেলিকপ্টার ও জেট ফাইটার থেকেও ছোড়া হচ্ছে গোলা।

গত শুক্রবার রাতে মিয়ানমার থেকে আসা গোলা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিস্ফোরিত হলে একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন। ওইদিন সকালেই ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে ‘মাইন’ বিস্ফোরণে এক বাংলাদেশি যুবকের পা উড়ে যায়।

এর আগে গত ২৮ অগাস্ট দুপুরে বান্দরবানের ঘুমধুমের তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমার থেকে দুটি অবিস্ফোরিত মর্টার শেল এসে পড়ে। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের দুটি যুদ্ধবিমান ও দুটি ফাইটিং হেলিকপ্টারে গোলা বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে এসে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে সীমান্তে বিজিবিকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। তবে সীমান্তে এখনই সেনা পাঠানো হচ্ছে না বলে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক