চাঁদাবাজ বেশি শিল্পাঞ্চলে, আর কী আছে এসআরবির তালিকায়?
“কার কী রাজনৈতিক পরিচয়, সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়,” বলেন এসআরবির মহাপরিচালক।
দেশের শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক স্থাপনাকে ঘিরেই চাঁদাবাজের সংখ্যা বেশি; পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ের তালিকায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।
সারাদেশে এসআরবির ১৫টি ব্যাটালিয়নের তালিকায় চাঁদাবাজ হিসেবে নাম রয়েছে ৩ হাজার ৫৮৬ জনের। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে কার্যক্রম পরিচালনাকারী দুটি ব্যাটালিয়নের তালিকাতেই রয়েছে ১ হাজার ৬৮ জন।
এসআরবির বিভিন্ন অভিযানে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী নেতাও রয়েছেন। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির ঘটনার মধ্যে চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৈরি এসআরবির ‘ব্যাটালিয়ন অনুযায়ী আলোচিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং ছিনতাইকারীর সামারি’ শীর্ষক তালিকা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
তালিকা তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত করে সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হচ্ছে।
চাঁদাবাজ যেখানে বেশি
এসআরবির তালিকায় চাঁদাবাজের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ অঞ্চল। এ অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা এসআরবি-১১ এর তালিকায় নাম রয়েছে ৫৬৫ জনের।
দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম অঞ্চল, সেখানে দায়িত্ব পালন করা এসআরবি-৭ এর তালিকায় রয়েছে ৫০৩ জন।
এসআরবি-১১-এর আওতায় নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্দিষ্ট কিছু অংশ, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী জেলার বিভিন্ন এলাকা রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে শিল্পকারখানার ঘনত্ব বেশি।
অন্যদিকে, এসআরবি-৭-এর আওতায় রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরসহ পুরো চট্টগ্রাম জেলা, ফেনী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার।
এ দুই ব্যাটালিয়নের তালিকায় থাকা ১ হাজার ৬৮ জন মোট তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজের প্রায় ৩০ শতাংশ।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এসআরবি-১১ ও এসআরবি-৭ এর কমান্ডিং অফিসারদের ফোন করা হলেও তারা ধরেননি।
ঢাকার পাঁচ ব্যাটালিয়নের তালিকায় কত?
রাজধানী ও আশপাশের পাঁচটি ব্যাটালিয়নের তালিকায় চাঁদাবাজ হিসেবে নাম রয়েছে ১ হাজার ২৫৪ জনের। এর মধ্যে উত্তরা, মিরপুর ও কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার দায়িত্বে থাকা তিনটি ব্যাটালিয়নের তালিকায় রয়েছে ১ হাজার ১৭ জন।
উত্তরা, দক্ষিণখান, উত্তরখান, তুরাগ, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, গুলশান, বনানী, ভাটারা, রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্বে আছে এসআরবি-১। এ ব্যাটালিয়নের তালিকায় রয়েছে ৩৯৩ জনের নাম।
মিরপুর, শাহ আলী, পল্লবী, রূপনগর, ভাষানটেক, দারুস সালাম, কাফরুল, ক্যান্টনমেন্ট, সাভার ও মানিকগঞ্জের সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে থাকা এসআরবি-৪-এর তালিকায় রয়েছে ৩৪৭ জন।
কেরানীগঞ্জ ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা এসআরবি-১০-এর তালিকায় রয়েছে ২৭৭ জন।
এ ব্যাটালিয়নের আওতায় রয়েছে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, শ্যামপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর, বংশাল, চকবাজার, কোতোয়ালী, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ।
অন্যদিকে, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, আদাবর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, শেরেবাংলা নগর, নিউ মার্কেট ও হাজারীবাগ এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী এসআরবি-২-এর তালিকায় রয়েছে ২১৫ জনের নাম।
শাহজাহানপুর, পল্টন, খিলগাঁও, সবুজবাগ, রামপুরা, হাতিরঝিল, শাহবাগ ও রমনা এলাকার দায়িত্বে থাকা এসআরবি-৩-এর তালিকায় রয়েছে ২২ জন।
শিল্পাঞ্চলের বাইরে আর যেখানে চাঁদাবাজ বেশি
শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত নয়, এমন এলাকাতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি এসআরবির চাঁদাবাজের তালিকায় রয়েছে।
খুলনা মহানগর ও জেলা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল ও গোপালগঞ্জের দায়িত্বে থাকা এসআরবি-৬-এর তালিকায় রয়েছে ২০০ জনের নাম।
সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গাসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে থাকা এসআরবি-১২-এর তালিকায় রয়েছেন ২৭৭ জন।
এ ছাড়া রাজশাহী অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এসআরবি-৫-এর তালিকায় ২১৬ জন, বরিশাল অঞ্চলে এসআরবি-৮-এর তালিকায় ১৪৯ জন, সিলেটে এসআরবি-৯-এর তালিকায় ১২৩ জন, রংপুরে এসআরবি-১৩-এর তালিকায় ১৮৭ জন, ময়মনসিংহে এসআরবি-১৪-এর তালিকায় ৭০ জন এবং কক্সবাজারে এসআরবি-১৫-এর তালিকায় ৭২ জনের নাম রয়েছে।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে কারা আছেন?
এসআরবির তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযানের পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ও আলোচনায় এসেছে।
সোমবার খিলক্ষেত এলাকায় অভিযান চালিয়ে খিলক্ষেত থানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি শাহিনুর আলম মারফতকে আটক করে এসআরবি। সংস্থাটির তালিকায় চাঁদাবাজ হিসেবে তার নাম রয়েছে।
শুক্রবার খিলক্ষেত থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হাফিজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চাঁদাবাজির অভিযোগে এসআরবি-১ তাকে ধরে আমাদের থানায় সোপর্দ করেছিল। আমাদের এখান থেকে তাকে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। পরে তারাই ব্যবস্থা নিয়েছে।”
একই দিন চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক হন শেরেবাংলা নগর থানা বিএনপির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মিজানুর রহমান স্বপন। তাকে আটক করে এসআরবি-২। পরে তাকে শেরেবাংলা নগর থানায় হস্তান্তর করা হয়।
শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, চাঁদাবাজির অভিযোগে করা একটি পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে স্বপনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
শুক্রবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগকারী ছিল না। তাই পেন্ডিং মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।”
এসআরবি সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, শেরেবাংলা নগর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় স্বপনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদপুরে ছয়তলা গার্মেন্টস নামে পরিচিত একটি পোশাখ কারখানা থেকে চাঁদা আদায়, নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের ‘অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট’ পরিচালনা, আগারগাঁওয়ের নতুন রাস্তা এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজি এবং শেরেবাংলা নগর থানার পাশের সমবায় বস্তিতে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগের বিষয়ে স্বপন ও মারফতের পরিবারের বক্তব্য জানার চেষ্টা করছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
এসআরবির ১৫ ব্যাটালিয়নের এ তালিকায় ‘আলোচিত সন্ত্রাসীর’ সংখ্যা ২ হাজার ২৫৮। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে, ৪০৮ জন। আর ৩৩৯ জনের তালিকা এসেছে ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে। তার পরেই রয়েছে সিরাগঞ্জ অঞ্চল, যেখানে ‘আলোচিত সন্ত্রাসীর’ সংখ্যা ৩২৪।
‘আলোচিত সন্ত্রাসী নেই’ এসআরবি-৩ এর আওতাধীন শাহজাহানপুর অঞ্চলে।
পুলিশের এই বিশেষায়িত ইউনিটের তালিকায় ছিনতাইকারীর সংখ্যা ৫৩৪। এর মধ্যে এসআরবি-২ এর আওতাধীন ঢাকার মোহাম্মদপুর অঞ্চলে রয়েছে ১৩০ জন।
র্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে পুলিশের অধীনে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে গেল ১০ সেপ্টেম্বর। এক সপ্তাহের মাথায় প্রকাশ করা হয় গেজেট।
র্যাবের জনবল, সম্পদ, নথিপত্র, স্থাপনা, তহবিল ও দায়দায়িত্ব নতুন ইউনিটে হস্তান্তরের বিধান রেখেই এসআরবি আইন করা হয়েছে।
এরপর গেল ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকার মিরপুরে বাড়ি দখল, মারধর ও চাঁদা দাবির এক মামলা এসআরবিকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়।
‘রাজনৈতিক পরিচয় দেখে তালিকা করা হয়নি’
এসআরবির মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নিয়ে কিংবা কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করে তালিকাটি তৈরি করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “তালিকাটি শতভাগ নিরপেক্ষভাবে তৈরি করা হচ্ছে। এতে কার কী রাজনৈতিক পরিচয়, সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় ৩ হাজার ৫৮৬ জন চাঁদাবাজের এ তালিকা তৈরি হচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়া এখনো চলমান।”
কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করা হচ্ছে না উল্লেখ করে এসআরবি মহাপরিচালক বলেন, “কাউকে টার্গেট করে কিছু করা হচ্ছে না। প্রতিটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করেই তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে কেবল প্রকৃত অপরাধীদেরই আইনের আওতায় আনা যায়।”
২৭ মামলার আসামি আল-আমিন গ্রেপ্তার
হত্যা, অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে ২৭টি মামলার আসামি মো. আল-আমিন ওরফে পিচ্চি আল-আমিন ওরফে ওমর ফারুককে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি।
গত ১ অক্টোবর রামপুরার টিভি রোড থেকে আল-আমিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুজন এবং ৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় কুঞ্জবন এলাকা থেকে সহযোগী মো. কাওছার খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খিলগাঁওয়ের ভূঁইয়াপাড়ায় একটি টিনশেড ঘর থেকে দুটি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, একটি ম্যাগাজিন ও নয় রাউন্ড গুলি উদ্ধারের কথা জানিয়েছে এসআরবি। গত ১২ জুন হাতিরঝিলের ইয়াছিন খান পলাশ ওরফে কাইল্লা পলাশ হত্যা মামলায় আল-আমিন এজাহারভুক্ত আসামি।
গত রোববার বিকালে কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, আল-আমিনের বাড়ি ঝালকাঠিতে। তাঁর পাঁচ সহযোগীর মধ্যে চারজনের বাড়ি একই জেলায় এবং একজনের বাড়ি বরগুনায়। তিনি বলেন, “আমরা এনালাইসিস করে দেখলাম, আল-আমিন তার সমমনা বা উনি যাদেরকে সঠিক মনে করেছেন, ওনার সমগোত্রীয় তাদেরকে ঢাকায় এনে তাদের অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।”
জানতে চাইলে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক ও মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, “শিল্পাঞ্চলভিত্তিক চাঁদাবাজি রোধে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। গোয়েন্দা তালিকা অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চলগুলোতে অভিযান চালিয়ে গত দুই মাসে চাঁদাবাজিসংক্রান্ত মামলায় ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
“শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং চাঁদাবাজি ও বিশৃঙ্খলা দমনে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
