১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সিদ্দিক বাজারে ভবনে বিস্ফোরণ, নিহত বেড়ে ১৭

বিস্ফোরণে ভবনের প্রথম দুটি তলার ছাদের অংশ ধসে আন্ডারগ্রাউন্ডে পড়েছে। নিচে এখনও মানুষ আটকে আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সিদ্দিক বাজারে ভবনে বিস্ফোরণ, নিহত বেড়ে ১৭

ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Mar 2023, 05:28 PM

Updated : 07 Mar 2023, 11:18 PM

পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজারে একটি ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে; আহত হয়েছেন শতাধিক।

মঙ্গলবার বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে নর্থ সাউথ রোডের ১৮০/১ হোল্ডিংয়ের ওই ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে বলে ফায়ার সার্ভিসের উপ পরিচালক দিন মনি শর্মা জানান।

ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট সেখানে উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছে। তবে কীভাবে এ বিস্ফোরণ ঘটল তা জানা যায়নি। ডিএমপির কাউন্টারিজম ইউনিটের বম ডিসপোজাল ইউনিট এবং সেনাবাহিনীর মিলিটারি পুলিশের একটি দল তল্লাশিতে যোগ দিয়েছে।

সাত তলা যে ভবনে বিস্ফোরণ ঘটেছে, তার নিচের দুটো তলায় স্যানিটারি সামগ্রী আর গৃহস্থালী সামগ্রীর বেশ কয়েকটি দোকান ছিল। তার উপরে ছিল ক্যাফে কুইন নামের একটি খাবার হোটেল। প্রথম দুটি তলার ছাদ ধসে আন্ডারগ্রাউন্ডে পড়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হাফিজ আকতার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভবনের নিচে অনেকে আটকা পড়ে আছে। ভবন কেটে উদ্ধার করতে হবে। সে অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে। ভবন ভাঙার ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।

Image

ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

বিস্ফোরণে দেয়াল ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি ভেতরের জিনিসপত্র ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ভবনের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকা সাভার পরিবহনের একটি বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিস্ফোরণের ধাক্কায়।

হাফিজ আকতার বলেন, “অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জীবনহানি অনেক ঘটেছে। সাম্প্রতিককালে এ ধরণের বিস্ফোরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি।”

পাশের সাকি প্লাজা নামের পাঁচ তলা ভবনের ওপরে চারটি ফ্লোরে ব্র্যাক ব্যাংকের গুলিস্থান শাখা এবং ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই সার্ভিস সেন্টার রয়েছে। বিস্ফোরণের ধাক্কায় কাচ ভেঙে ব্যাংকের অফিস কক্ষগুলোর পর্দা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।

ব্র্যাক ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, ‘‘সিদ্দিক বাজার আমাদের যে শাখাটি রয়েছে, তার পাশের ভবনে বিস্ফোরণ ঘটেছে। সেই ধাক্কায় ব্যাংক ভবনের কাচ সম্পূর্ণ গুড়ো গুড়ো হয়ে নিচে পড়েছে। উড়ে আসা কাচের টুকরার আঘাতে কয়েকজন ব্যাংক কর্মী আহত হয়েছেন।”

Image

ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ভবনের নিচের কলামগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে তারা যেতে পারছেন না।

“সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞরা এসেছেন। একটু স্টেবল হলে নিচের দিকে অভিযান চালাবো আমরা।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বিস্ফোরণ যখন ঘটে মার্কেট তখন খোলা ছিল; ক্রেতা, বিক্রেতা, কর্মচারীরা ছিলেন। কতজন ভেতরে আটকা পড়ে আছে তা তাদের জানা নেই। সেনাবাহিনীর সদস্যরা যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছেন, তাদের সব যন্ত্রপাতি দিয়ে নিচতলা এবং আন্ডারগ্রাউন্ডে উদ্ধার অভিযান চালানো হবে।”

কেন বিস্ফোরণ

সীতাকুণ্ডে অক্সিজেন কারখানা এবং ঢাকার মিরপুরে রোডে ভবনে বিস্ফোরণের পর এক সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয় বিস্ফোরণে প্রাণহানি ঘটল। সিদ্দিকবাজারে এতবড় বিস্ফোরণের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। 

বিস্ফোরণের কারণ জানতে চাইলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক সাংবাদিকদের বলেন, “বিশেষজ্ঞরা তদন্ত করে দেখছেন বিস্ফোরণের ঘটনা নাশকতা না দুর্ঘটনা। আপনারা জানেন যে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ হতে পারে। আমাদের বিশেষজ্ঞরা তদন্ত করে বলতে পারবেন যে এটি নাশকতা না কোনো দুর্ঘটনা।”

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক মাইন উদ্দিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “দোকান মালিক সমিতির লোকজন বলেছেন, নিচে কোনো গ্যাসের লাইন নেই। তবে পানির রিজার্ভ ট্যাংক রয়েছে। কোথায় কী ঘটেছে তা তদন্ত করে আপনাদের পরে জানাব।”

রাজউক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞাও রাতে  ঘটনাস্থলে আসেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “মনে হচ্ছে ভবনটির কোথাও লিকেজ ছিল। এ কারণে অনেক গ্যাস জমে থাকতে পারে। হয়ত তখন কেউ ম্যাচের কাঠি জ্বালানোর ফলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তবে ফায়ারের কর্মকর্তারা এখনো চূড়ান্তভাবে কিছু বলেনি।”

তিনি জানান, পুলিশ ও রাজউক কর্মকর্তারা ভবন মালিকের সাথে কথা বলেছেন। ভবনের ভেতর থেকে লোকজন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভেতরে থাকা মালামাল সরিয়ে নিতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করছেন।

হাসপাতালে আহাজারি

বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল থেকে শতাধিক ব্যক্তিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পরিবেশ। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া জানান, এ পর্যন্ত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ১৫ জন পুরুষ এবং ২ জন নারী।

তারা হলেন, মমিনুল ইসলাম (৩৮), তার স্ত্রী নদী আক্তার, মোহাম্মদ সুমন (২১), মুনসুর হোসাইন (৪০), ইসহাক মৃধা (৩৫), মো. ইসমাইল হোসেন (৪২), মো. রাহাত (১৮) ও আলামিন (২৩), মাইনউদ্দিন (৫০), নাজমুল হোসেন (২৫), ওবায়দুল হাসান বাবুল (৫৫), আবু জাফর সিদ্দিক (৩৪), আকৃত্তি বেগম (৭০), মো, ইদ্রিস মীর (৬০), হৃদয় (২০), নুরুল ইসলাম ভুইয়া (৫৫) ও মো. সিয়াম (১৯)। তাদের মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক।

ঢাকা মেডিকেলে যারা ভর্তি হয়েছেন, তাদের মধ্যে আছেন আজিম (১৫), নোমান (৩২), ফাইজু (১৫), আশিক (২৩), কাউছার (৩৭) সিয়াম (৫০), শাকিল (২৩), শহিদুল (৩৪), শাহিন ( ৪২),  ফয়সাল (২২),  লিটন (২৫), মো. হাসান (৩০), মোস্তফা (৩০) নাজির (৩০), নির্জর (২৮), খলিল (৪০), রুহুল আমিন (৩২), রশিদ (৫৪), শিবলী (৩৫),  হাসান ( ২০), তোফাজ্জল (৩০), সজীব (২৪), সুমি ( ১৮), রকেয়া (৫০), রিয়াজ (২০), জাহান (২৫), শাহ আলম ( ৩০), নূর আলম (১৮), জাহান আলী (২০), মজনু (২৮), সেলিনা (৩৬), মোস্তাফিজুর (১১), রাজিব (৪২), ফারদিন (২২), মিলন (২৬), নার্গিস (৩০), হুমায়ুন কবির (৪৮), সুমন (২১), তুষার (১৮), সাইফুল (২০), আলামিন (২৫), শহিদুল (৪৮), মশারফ (৫০), জাহান ( ১৯), আলাউদ্দিন (২৩), সুমন চক্রবর্তী (৪১), তুহিন (১০),  আলাউদ্দিন (২০), জয়নাল (৫০), মহাম্মদ ঈসমাইল ( ৪২), সুলাইমান ( ২৪) ও জামাল (৩৬)। এছাড়া আরও অন্তত ছয়জন ভর্তি আছেন, যাদের নাম জানা যায়নি।

আহতদের মধ্যে দগ্ধ আটজনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়েছে। তাদের সবার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা।

ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং আবাসিক সার্জন ডা. এস এম আইয়ুব হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চারজনের শরীরের ৫০ শতাংশের বেশি পুড়েছে। একজনের ৯৮ শতাংশ পুড়ে গেছে।”

দেহের ৫৫ শতাংশ এবং ৩০ শতাংশে আগুনের ক্ষত নিয়েও বার্ন ইনস্টিটিউটে এসেছেন রোগীরা। কারও শরীরের ১৫ শতাংশের বেশি আগুনে পুড়ে গেলে চিকিৎসকরা ওই রোগীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হিসেবে বিবেচনা করেন।

Image

ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ

যেখানে বিস্ফোরণ ঘটেছে, তার কাছেই বিআরটিসির বাস কাউন্টার। ব্যস্ত ওই সড়কে যানবাহনের পাশাপাশি প্রচুর পথচারী ছিল সে সময়। বিস্ফোরণে আহতদের মধ্যে ওই ভবনের বিভিন্ন দোকানের কর্মচারীদের পাশাপাশি বাসযাত্রী ও পথচারীরাও রয়েছেন।

বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে গেছেন ভবনের নিচতলার বাদশা ট্রেডিংয়ের শ্রমিক আনোয়ার হোসেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি জানান, দোকানের ম্যানেজার কথায় চা আনতে বাইরে গিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ বিস্ফোরণে বিকট আওয়াজে তিনি চেতনা হারান।

বিস্ফোরণে আগে দোকানের ভেতরে অন্তত তিনজন ছিলেন এবং দোকানের বাইরে ছিলেন স্যানিটারি দোকানের ৭-৮ জন শ্রমিক। চেতনা ফেরার পর দোকানের বাইরে থাকা শ্রমিকদের হাসপাতালে নিতে দেখলেও ভেতরে থাকা মহাজন ও বাকিদের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান বাদশা।

ওই ভবনের সামনে রাস্তার ওপর ভ্যানে করে বেল বিক্রি করছিলেন দিলীপ দাস। বিস্ফোরণে তিনিও আহত হয়েছেন।

দিলীপ বলেন, বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায় আশপাশের এলাকা। পথচারীদের ওপর বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পড়তে দেখেছেন তিনি। বিস্ফোরণে তার এক ক্রেতাও আহত হয়েছেন।

স্থানীয় দোকানদার মোহাম্মদ বিজয় বলেন, “আসরের নামাজের সময় সবাই যখন জামাতে দাঁড়াইছে, তখনই বিস্ফোরণ; আওয়াজে প্রথমে ভাবছি বোমা বোধহয়। কয়েক মিনিট ধোঁয়ায় পুরা এলাকা ঢাকা ছিল।”

বিদ্যুৎ বন্ধ, যানজট

ভবনে বিস্ফোরণের পর নিরাপত্তার কেথা ভেবে পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজার, নয়াবাজার, নর্থ সাউথ রোড় এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পরিস্থিতি অনুকূল হলে তা বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানি ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান।

এদিকে বিস্ফোরণের পর নর্থ সাউথ রোড ও আশেপাশের সড়কে স্থানীয়রা ভিড় করলে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। এতে উদ্ধার কাজেও বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিসসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ বেশ কয়েকটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এর প্রভাব পড়ে পুরান ঢাকাকে যুক্ত করে এমন সব সড়কে। তাতে গুলিস্তান, মতিঝিলসহ রমনা পর্যন্ত সড়কেও যানজট দেখা দেয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ কমিশনার (ট্রাফিক) আসমা সিদ্দিকা মিলি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।