বিশ্ব রোহিঙ্গাদের ভুলে যেতে পারে না: শেখ হাসিনা

“তাদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিকারে এগিয়ে আসতে সকলেরই দায়িত্ব রয়েছে,” বলেন তিনি।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 19 Jan 2024, 11:13 AM
Updated : 19 Jan 2024, 11:13 AM

গত ছয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা যায়নি জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতি ‘কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না’ মন্তব্য করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৮তম অধিবেশনের সাইডলাইনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, “বিশ্ব রোহিঙ্গাদের ভুলে যেতে পারে না; কেননা, ২০১৭ সালে তাদের দেশত্যাগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না এবং তারা কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে নিপীড়ন ও বিতারণের শিকার হয়েছে।

“তাদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিকারে এগিয়ে আসতে সকলেরই দায়িত্ব রয়েছে। তাদের ভরণপোষণের জন্য মানবিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটিই সব কিছু নয়। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, তারা মিয়ানমারে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারবে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিশ্চিত জীবন যাপন করতে পারবে। এর জন্য আমাদের সমস্যাটির মূলে গিয়ে সমাধান করতে হবে, যা মিয়ানমারেই রয়েছে।”

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ, কানাডা, গাম্বিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ‘তারা কি আমাদের ভুলে গেছে?’ শিরোনামে উচ্চ পর্যায়ের এক ইভেন্ট আয়োজন করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

এ সংকটের টেকসই সমাধানে নিরাপত্তা ও সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব বাস্তবায়নের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে সম্মিলিত প্রচেষ্টা আরও বহুগুণ বাড়াতে বিশ্ব সম্প্রদায়, বিশেষ করে আসিয়ান সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান বাংলাদেশ সরকারপ্রধান।

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দরকার যাতে বাড়িঘর থেকে তাদের পালাতে না হয়। এখানে উপস্থিত অনেক দেশ আছে, যারা কয়েক দশক ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। আমার বিশ্বাস মালয়েশিয়া এবং সৌদি আরব বাংলাদেশের সঙ্গে একমত হবে।”

অর্ধযুগেও এই সংকটের সমাধান না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশে তাদের দীর্ঘ উপস্থিতি কেবল তাদের আরও হতাশার দিকেই ঠেলে দিচ্ছে না, এটি কক্সবাজারের পরিস্থিতিকেও অনিশ্চিত করে তুলছে।”

রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ, যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কারণে অতিরিক্ত চাপে পড়ছে।

“পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ উপস্থিতি আমাদের জনগণের জন্য গুরুতর সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাজনিত প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির হিসেবে পরিচিত এই আশ্রয় শিবিরের কারণে ৬ হাজার ৮০০ একর সংরক্ষিত বন ধ্বংসের ফলে কক্সবাজারের জীব বৈচিত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

সমস্যা সমাধানে চারটি প্রস্তাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার থেকে উদ্ভূত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা আরও বহুগুণ বাড়াতে হবে, সব বিকল্পের মধ্যে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনই সবচেয়ে কার্যকর।

প্রথম ও দ্বিতীয় প্রস্তাবে তিনি বলেন, “আমি বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন বিষয়টি সমাধান করে এবং এই দুর্দশাগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের জীবনধারণের জন্য আমাদের মানবিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এ বিষয়টিকে তাদের এজেন্ডার শীর্ষে রাখে। তৃতীয়ত, এই জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য নৃশংসতাকারী অপরাধীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য চলমান এবং প্রচলিত আইনি ও বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ছয় বছর ধরে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের মর্মান্তিক বিতাড়নের ঘটনা দেখে আসা বিশ্বকে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের স্থায়ী দুর্ভোগের কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে তারা আজ এখানে সমবেত হয়েছেন।

সমস্যা সমাধানের পথ তুলে ধরে তিনি বলেন, “২০১৭ সালের নভেম্বরে আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছি, তার দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে তাদের মনোযোগ দিতে হবে।…পাইলট প্রত্যাবাসন প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষতে আশা বাঁচিয়ে রাখবে। আমি আশা করি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনকারীদের রাখাইনে পুনরায় একত্রিত হতে সহায়তা করতে এগিয়ে আসবে।

“আঞ্চলিক দেশগুলো, বিশেষ করে আসিয়ান সদস্যরা, মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে, নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে পারে। রোহিঙ্গা সঙ্কটের মূল কারণগুলোকে কার্যকরভাবে মোকাবেলায় অব্যহত আন্তর্জাতিক মনোযোগ প্রয়োজন। মিয়ানমারের বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের বাস্তবায়ন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।”

সংবাদসূত্র: বাসস

(প্রতিবেদনটি প্রথম ফেইসবুকে প্রকাশিত হয়েছিল ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে: ফেইসবুক লিংক)