‘পাহাড় আরও অশান্ত হলে সরকারকেই দায় নিতে হবে’

“সরকার স্বেচ্ছায় হোক বা চাপে পড়ে হোক এই পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে,” এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 Dec 2023, 02:39 PM
Updated : 23 Dec 2023, 02:39 PM

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে দেরি হলে পাহাড়ে আরও অশান্তি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান। 

তিনি বলেছেন, “আর কাল বিলম্ব না করে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করুন। পাহাড়িদের আত্মমর্যাদা বোধে আঘাত ও বঞ্চনা দীর্ঘায়িত হলে যদি পাহাড় আরও অশান্ত হয়, তবে এ দায় সরকারকেই নিতে হবে।”  

শনিবার বিকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নসরুল হামিদ মিলনায়তনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। 

নৃগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে রাজনৈতিক সংকটের শুরু সেই স্বাধীনতার পর থেকেই। ধীরে ধীরে তা একপর্যায়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রায় আড়াই দশকের এই সংঘর্ষে বারবার পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে গেছে রক্ত আর হিংসার ধারা। 

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে সংঘাতের সেই অধ্যায়ের যবনিকার আশা ছিল। তবে দীর্ঘ সময়েও চুক্তির বেশির ভাগ বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ করে আসছেন পাহাড়ি নেতারা। 

সেই চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার জন্য দেশের প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গত বছরে ২০ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন। এ প্ল্যাটফর্মের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শনিবার সংহতি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। 

নাজমুল হক প্রধান বলেন, “সরকারের চুক্তি মানে রাষ্ট্রীয় চুক্তি। কাজেই এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতেই হবে। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই আছেন, যারা পাহাড়ি মানুষদেরকে মানুষই মনে করে না। কিন্তু সরকারকে বলব-অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। আর কাল বিলম্ব না করে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করুন।” 

সরকার শান্তি চুক্তি করেছে চুক্তি ভঙ্গ করার জন্য মন্তব্য করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি জনসংহতি সমিতি বলছে, ২৯টি ধারায় কোনোভাবেই হাত দেয়নি সরকার। অন্যদিকে পাহাড়ে অঘোষিত সেনাশাসন জারি রয়েছে। কিন্তু সরকার তার প্রচারযন্ত্রের মধ্য দিয়ে নানাভাবে বিভ্রান্ত করছে। 

“সরকার বলছে, পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি ধারা বাস্তবায়ন করেছে…এখন আমাদের কাজ হচ্ছে এই চুক্তি বাস্তবায়নের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে নিয়ে যাওয়া।” 

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, রাষ্ট্রের পক্ষে যারা চুক্তি করেছিল, তারা যে এটি বাস্তবায়ন করবে- সেটা আশা করা যাচ্ছে না। কেননা এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রথমেই রাজনৈতিকভাবে ঐক্যমত্য থাকতে হবে। 

“কিন্তু যে দলটি করেছিল তাদের যে রাজনৈতিক দর্শন আমার মনে হয় না তারা দলীয়ভাবেও একমত ছিল। অন্যদিকে আমলারাও এই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একমত নয়। কেননা যদি রাজনৈতিকভাবে ঐক্যমত্যে পৌঁছা যেত তখন সামরিক, বেসামরিক আমলাদেরকে বুঝিয়ে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা যেত। কিন্তু সেসবের কোনোটাই হয়নি; কেননা রাজনৈতিকভাবে এই চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে ঐক্যমত্য নেই।” 

অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, সরকার স্বেচ্ছায় হোক বা চাপে পড়ে হোক এই পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। 

“কিন্তু এই চুক্তি যদি বাস্তবায়ন না করে, তবে জাতি হিসেবে আমরা প্রতারক হয়ে থাকব। পাহাড়ি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় চুক্তি বাস্তবায়ন জরুরি।”  

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য শরিফ সমশির বলেন, “এই চুক্তিটি এ অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটা পদক্ষেপ হিসেবে নানা মহলের কাছে সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই চুক্তির বাস্তবায়ন হয়নি। 

“বরং এই চুক্তিকে বিরোধিতা করে ইউপিডিএফ নামে যে সংগঠনটির সৃষ্টি হয় এবং ক্রমান্বয়ে তাদের যে সশস্ত্র বিরোধিতা-সেটাকে আমরা অনেক বাঙালি বামপন্থি ও ডানপন্থিরা সমর্থন করছি। এগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের পথকে আরও জটিল করেছে বলে মনে করি।” 

ঐক্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ তারেক বলেন, যে সরকার পার্বত্য চুক্তি করেছিল, সেই সরকারই টানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। 

“কিন্তু তাদের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা এই চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করেনি। ফলে পাহাড়ের মানুষকে এখনও এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। এই সরকারকে অনুরোধ জানাই, হয় আপনারা বলেন কবে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করবেন, নতুবা বলেন কেন এই চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। চুক্তি ভঙ্গের জন্য এই সরকারকে নিন্দা জানাচ্ছি।” 

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ‘বাস্তবায়ন না হওয়ার’ ফলে পাহাড়ে এক ধরনের ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ পরিস্থিতি চলছে মন্তব্য করে সংস্কৃতি কর্মী শাহেদ কায়েস বলেন, “সেখানে এখনও পর্যন্ত জুম চাষের ভূমি হারাচ্ছে। এছাড়া বান্দরবানের রাবার কোম্পানি থেকে শুরু বিভিন্ন কোম্পানি পাহাড়িদের ভূমি বেদখল করছে। আমরা আশা করেছিলাম, এই চুক্তির ফলে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু তা এখনও হয়নি।”  

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন বলেন, গত বছর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৫ বছর পেরিয়ে গেল। 

“তখন আমরা লক্ষ্য করলাম, পার্বত্য চুক্তি যে উদ্দেশ্যে করা হলো তা পূরণ হয়নি। যদি পূরণ হত, আমরা পাহাড়ের মানুষের মধ্যে আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখতাম। কিন্তু সেটার বদলে আমরা দেখছি পার্বত্য চুক্তির মূল ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।” 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে এবং সব মানুষের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করার কোনো বিকল্প নেই। 

“আমরা যদি মনে করি, পাহাড়িদের আন্দোলন পাহাড়িরা করবে- এই দিন ফুরিয়ে গেছে। আমাদেরকে সম্মিলিতভাবেই এই সংগ্রাম জারি রাখতে হবে।” 

অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাবেক সভাপতি সুলভ চাকমা।