সাহিত্যে দুর্দশার পেছনে প্রযুক্তি নয়, পুঁজিবাদ: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে তিনি সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরির আহ্বান জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 9 Sept 2022, 03:38 PM
Updated : 9 Sept 2022, 03:38 PM

বর্তমানে সাহিত্যে দুর্দশা প্রযুক্তির জন্য তৈরি হয়নি, এর কারণ পুঁজিবাদ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

তিনি বলেন, সাহিত্যের একটা দুর্দশা চলছে, যা অস্বীকার করা যাবে না। লোকে বই পড়তে চায় না এবং বলে যে এর জন্য প্রযুক্তি দায়ী। তবে আমি বলব, প্রযুক্তি এর জন্য দায়ী নয়। প্রযুক্তির উপর পুঁজিবাদের যে আধিপত্য সেটার কারণে এ দুর্দশা সৃষ্টি হয়েছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে তিনি সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরির জন্য আহ্বান জানান।

শুক্রবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র মিলনায়তনে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের চতুর্থ জাতীয় সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

'ভয়ের মাঝে অভয় বাজাও, সাহসী প্রাণে চিত্ত জাগাও' স্লোগানকে সামনে রেখে চতুর্থ জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করে সংগঠনটি। সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

সম্মেলন থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চাবিরোধী সব ‘কালাকানুন’ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।

উদ্বোধন ঘোষণা শেষে একটি শোভাযাত্রা স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর থেকে শুরু করে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর ঘুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে এসে শেষ হয়।

এরপর আলোচনা সভায় অধ্যাপক সিরাজুল বলেন, অতীতে তাকালে আমরা দেখব যে, প্রযুক্তি সব সময় সাহিত্যকে সহযোগিতা করেছে। যখন কাগজ বা ছাপাখানা ছিল না, তখন প্রযুক্তিই কাগজ ও ছাপাখানা এনেছে। এরপরে যখন রেডিও এল তখন ধারণা করা হল সাহিত্যের বদলে এবার মানুষ রেডিও শুনবে, সাহিত্য পড়বে না। কিন্তু দেখা গেল রেডিও সাহিত্যকে ব্যবহার করছে।

"ঠিক একইরকমভাবে টেলিভিশনও সাহিত্যকে শেষ করতে পারেনি। কিন্তু, আজকের চলমান সাহিত্যের এ বিপদ প্রযুক্তির কারণে সৃষ্টি হয়নি বরং প্রযুক্তির উপর পুঁজিবাদের যে আধিপত্য সেটার কারণে সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, পুঁজিবাদ মুনাফা, মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা ও ভোগ বিলাসিতায় মানুষকে উৎসাহিত করে। প্রযুক্তি বা বিজ্ঞানের বিকাশের কারণে আজকের পৃথিবী বিপন্ন হয়নি বরং তা হয়েছে পুঁজিবাদ বিকাশের কারণে।

পরিবেশ না থাকলে লেখক তৈরি হয় না মনত্ব্য করে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের এই অধ্যাপক বলেন, ৪০০ বছর পূর্বের ইংরেজি সাহিত্যের সাথে আমরা পরিচিত। ইংরেজি সাহিত্যের দুজন শেক্সপিয়র ও ফ্রান্সিস বেকন তারা উঠে এসেছেন যদিও তখন সভ্যতা এতটা অগ্রসর ছিল না।

"কেন পারলেন তারা? শেক্সপিয়ার লেখাপড়া জানতেন না, স্কুল থেকে পাশ করেননি, ল্যাটিন কম জানতেন, গ্রিক আরও কম জানতেন। তাহলে তিনি কেমন করে তার অসামান্য রচনাগুলো লিখেছিলেন? পরিবেশ তাদেরকে লেখক হিসেবে গড়ে তুলেছে।"

বর্তমানে পুঁজিবাদের সঙ্গে সাহিত্যের দ্বন্দ্ব চলছে বলেও মনে করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

তিনি বলেন, আজকে মানুষ বই পড়তে না চায়, স্থুল বিনোদনে ডুবে থাকে, মাদকাসক্ত হয় তার প্রধান কারণ হল পুঁজিবাদী দৌরাত্ম এবং এই সংকট একটি চরম সংকট।

"প্রগতি লেখক সংঘের কাজ হবে একটা সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরি করা। আমরা ইউরোপীয় রেনেসাঁসের কথা শুনেছি। বঙ্গীয় রেনেসাঁসের কথা শুনেছি সেই বঙ্গীয় রেনেসাঁস আমাদের জাগরণ এনে দিতে পারেনি।"

প্রগতি লেখক সংঘের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া পিনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক, নাট্য ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ।

প্রগতি লেখক সংঘের সহ সম্পাদক অভিনু কিবরিয়া ইসলামের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন সম্মেলন প্রস্তুতি পরিষদের আহ্বায়ক শামসুজ্জামান হীরা, শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক দীপংকর গৌতম।

সম্মেলনের পর কাউন্সিল অধিবেশনে গোলাম কিবরিয়া পিনুকে সভাপতি ও দীপংকর গৌতমকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই বছরের জন্য নতুন কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচিত হয়।

কমিটির অন্যান্য সদস্য হলেন

সহসভাপতি-শামসুজ্জামান হীরা, সাখাওয়াত টিপু, এ কে শেরাম, জাকির হোসেন, ইয়াজদানী কোরায়শী ও মাইনুদ্দিন পাঠান, সহ সাধারণ সম্পাদক-অভিনু কিবরিয়া ইসলাম ও মাধব রায়, কোষাধ্যক্ষ-দীনবন্ধু দাস, সাংগঠনিক সম্পাদক-মাহবুবুল হক, দপ্তর সম্পাদক-সোহেল তারেক, প্রচার সম্পাদক-মো. তারেকুজ্জামান, প্রকাশনা ও গবেষণা সম্পাদক-হাবীব ইমন, সাহিত্যসভা ও অনুষ্ঠান বিষয়ক সম্পাদক-শান্তা মারিয়া, আন্তর্জাতিক সম্পাদক-প্রশান্ত কুমার মণ্ডল, সদস্য-মতিন বৈরাগী, ফারুক মাহমুদ, সিদ্দিক আহমেদ, সুদীপ্ত হান্নান, তপন বাগচী, রহমান মুফিজ, দিলরুবা সুলতানা, অপূর্ব গৌতম, সুভাষ চন্দ, জলিল আহমেদ, সাব্বির রেজা, কোরবান আলী মণ্ডল, মৃণাল কান্তি ঢালী, শাহ মো. জিয়াউদ্দিন, মোয়াজ্জেম হোসেন মানিক, মহিদুর রহমান, শ ম কামাল, বিমল কান্তি দাস, আনোয়ার কামাল ও মীর মোশাররফ হোসেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক