নৌকা ডুবল যাদের

জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগেরই স্বতন্ত্ররা।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 7 Jan 2024, 06:27 PM
Updated : 7 Jan 2024, 06:27 PM

দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এবারের ভোটে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগেরই বেশ কয়েকজন নেতা। তারা নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হয়েছেন।

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় থেকে ভোটে দাঁড়ানো এসব প্রার্থীদের অনেকে আওয়ামী লীগের মনোনীতদের বিরুদ্ধে সরব আলোচনা তৈরি করেন। ফল ঘোষণার পর নৌকা ডুবিয়ে তাদের জয় চমক হিসেবে এসেছে।

নৌকা নিয়ে হেরে যাওয়ার তালিকায় রয়েছেন- আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপ, টানা তিনবারের সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ, কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল।

মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন- বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী দুই বারের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী, ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী দুই বারের সংসদ সদস্য এনামুর রহমান এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী তিনবারের সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য।

এছাড়া ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের মধ্যে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ফজলে হোসেন বাদশা আওয়ামী লীগের শরিক হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোট করে হের যায়।

এবারের ভোটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাতে কেউ নির্বাচিত হতে না পারেন, সেজন্য দলের নেতাদেরও স্বতন্ত্র হওয়ার সুযোগ দেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এরপর প্রায় দেড়শ আসনে দলের মনোনীত নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোটের লড়াইয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নামেন আওয়ামী লীগের নেতারা। তাদের মধ্যে অনেকের জয়ের খবর আসতে শুরু করেছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় এবং নির্বাচন কমিশন থেকে তাদের বেসরকারিভাবে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।

যেসব আসনে স্বতন্ত্রের কাছে নৌকার হার

বরগুনা-১ আসনে (সদর-আমতলী-তালতলী) আসনে হেরে গেছেন টানা তিনবারের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। তিনি নৌকা প্রতীকে ৫৪ হাজার ১৬৮ ভোট পেয়ে হয়েছেন তৃতীয়।

এ আসনে জয় পেয়েছেন ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম সরোয়ার টুকু। তিনি ভোট পেয়েছেন ৬১ হাজার ৮৭৪ ভোট।

তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গোলাম সরোয়ার ফোরকান (স্বতন্ত্র) পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৮৭৪ ভোট।

নেত্রকোণা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনে নৌকার প্রার্থী অসীম কুমার উকিল হেরে গেছেন; তিনি পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৫৫০ ভোট।

এ আসনে জয় পেয়েছেন ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা ইফতিকার উদ্দিন তালুকদার পিন্টু। তিনি ভোট পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৮০৩টি।

মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে হেরেছেন নৌকার মৃণাল কান্তি দাশ; ভোট পেয়েছেন ৮২ হাজার ৮৩৩টি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক পৌরসভা মেয়র মোহাম্মদ ফয়সাল স্বতন্ত্র হিসেবে কাঁচি প্রতীকে পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৭০৫টি।

নরসিংদী-৩ আসনে নৌকা প্রতীকের ফজলে রাব্বি খান ৪৫ হাজার ১১৫ ভোট পেয়ে হেরে গেছেন। আওয়ামী লীগের আরেক নেতা সিরাজুল ইসলাম মোল্লা স্বতন্ত্র হিসেবে ভোট করে ঈগল প্রতীকে জয় পেয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৭৭৯ ভোট।

যশোর-৬ আসনে নৌকা নিয়ে হেরেছেন শাহীন চাকলাদার, ভোট পেয়েছেন ৩৯ হাজার ২৬৯টি। জয়ী হয়েছেন ঈগল প্রতীকে আজিজুল ইসলাম, ভোট পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৯৪৭টি।

চট্টগ্রাম-১৬ আসনে শেষ বেলায় আচরণিবিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থিতা হারালে নৌকার মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর প্রাপ্ত ভোট বাতিল করা হয়।

বাঁশখালীর এ আসনে জেলা আওয়ামী নেতা মুজিবুর রহমান ঈগল প্রতীকে ৫৭ হাজার ৪৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আরেক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ কবির। তিনি ট্রাক প্রতীকে পেয়েছেন ৩২ হাজার ২২০ ভোট।

এবার ৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৭৮ ভোটারের মধ্যে ভোট দেন ১ লাখ ২৯ হাজার ২২৩ জন। এর মধ্যে বাতিল করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৯৬৮টি ভোট, যা মোস্তাফিজুরের বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফরিদপুর-৩ সদর আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী শামীম হক ৭৫ হাজার ৮৯ ভোট পেয়ে হেরে যান। এখানে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে আজাদ। তিনি ঈগল প্রতীকে পেয়েছেন এক লাখ ৩৪ হাজার ৯৮ ভোট।

ফরিদপুর-৪ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কাজী জাফর উল্যাহ এবারও হেরে গেছেন। নৌকা প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৬ ভোট।

এ আসনে আওয়ামী লীগের আরেক নেতা নিক্সন চৌধুরী ঈগল প্রতীকে তৃতীয়বারের মত জয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৫ ভোট।

হবিগঞ্জ ৪ আসনে নৌকার প্রার্থী বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী হেরে গেছেন। টানা দুইবারের এই সংসদ সদস্য পেয়েছেন মাহবুব আলী পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৫৪৩ ভোট। 

তার প্রতিদ্বন্দ্বী ফেইসবুকের পরিচিত মুখ স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন জয়ী হয়েছেন। যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এ প্রার্থী পেয়েছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৯ ভোট।

মাদারীপুর ৩ আসনে আওয়ামী লীগের আবদুস সোবহান মিয়া (গোলাপ) ৬১ হাজার ৯৭১ ভোট পেয়ে হেরে গেছেন।

তার প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক আওয়ামী লীগ নেতা সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসা. তাহমিনা বেগম বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ে ঈগল প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৬৩৩ ভোট।

ঢাকা-১৯ আসনে নৌকার প্রার্থী ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমানকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম। এ আসনে নৌকা তৃতীয় স্থান পেয়েছে। সাইফুল আশুলিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন।

এখানে আওয়ামী লীগের আরেক নেতা সাবেক সংসদ সদস্য তৌহিদ জং মুরাদ ঈগল প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হেরে গেছেন।

সাইফুল পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৪১২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৌহিদ জং মুরাদ পেয়েছেন ৭৬ হাজার ২০২ ভোট। আর নৌকা প্রতীকের এনামুর পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৩৬১ ভোট।

রাজশাহী-২ আসনে নৌকা প্রতীকের ১৪ দলের প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশা স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন।

প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী রাজশাহী নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুর রহমান বাদশা পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৯০৬ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশা পেয়েছেন ৩১,৪৬৩ ভোট।

সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ১৪ দলের প্রার্থী বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ফজলে হোসেন বাদশা এর আগের টানা তিনবারের সংসদ সদস্য।

কুষ্টিয়া-২ আসনে ১৪ দলীয় জোটের নেতা ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু নৌকা প্রতীক নিয়ে পরাজিত হয়েছেন। ইনু পেয়েছেন ৯২ হাজার ৪৪৫ ভোট।

ফলাফল অনুযায়ী ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা কামারুল আরেফিন ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

যশোর-৫ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী তিনবারের সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য হেরে গেছেন। নৌকা প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৭২ হাজার ৩৩২ ভোট।

ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা ইয়াকুব আলী ৭৭ হাজার ৪৬৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য বদরুদ্দোজা মো. ফরহাদ হোসেন সংগ্রামকে হারিয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এ. কে. একরামুজ্জামান।

আওয়ামী লীগ নেতা একরামুজ্জামান কলার ছড়ি প্রতীকে পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৪২৪ ভোট। সংগ্রাম নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৪৬ হাজার ১৮৯ ভোট।

মানিকগঞ্জ-২ আসনে নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন তিনবারের সংসদ সদস্য কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম।

এ আসনে ট্রাক প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ দেওয়ান জাহিদ আহমেদ টুলু।

ঘোষিত ফল অনুযায়ী মোট ১৯৩টি ভোটকেন্দ্রে টুলু পেয়েছেন ৮৮ হাজার ৩০৯ ভোট আর মমতাজ পেয়েছেন ৮২, হাজার ১৩৮ ভোট।

ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে জুয়েল আরেং নৌকা প্রতীকে ৭৩ হাজার ৮৯২ ভোট পেয়ে হেরে গেছেন। তাকে হারিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুল হক সায়েম, যিনি ট্রাক প্রতীকে ৯৩ হাজার ৫৩১ ভোট পেয়েছেন।

ময়মনসিংহ-৬ ফুলবাড়িয়া মোসলেম উদ্দিন নৌকা প্রতীকে ভোট করেও হেরেছেন, পেয়েছেন ৪২ হাজার ৫৫৮ ভোট।

এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মালেক সরকার ট্রাক প্রতীকে ৫২ হাজার ২৫৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন।

ময়মনসিংহ-৭ ত্রিশাল আসনে হেরেছেন আওয়ামী লীগের হাফেজ রুহুল আমিন মাদানি। তিনি নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৫০ হাজার ৫৩১ ভোট।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম আনিসুজ্জামান আনিছ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ট্রাক প্রতীকে তাকে হারিয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৭১ হাজার ৭৩৮ ভোট।

ময়মনসিংহ-১১ ভালুকা আসনে কাজিম উদ্দিন আহমেদ ধনু নৌকা প্রতীকে ভোট করে হেরে গেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে। তিনি পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৪২০ ভোট।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ ওয়াহেদ নৌকার ভরাডুবির কারণ হয়েছেন। তিনি ৯৫ হাজার ২৮০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন।

কিশোরগঞ্জ-২ (পাকুন্দিয়া-কটিয়াদী) আসনে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল কাহার আকন্দ প্রথমবার নৌকায় ভোট করার সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি। তিনি পেয়েছেন ৬৮,৬৯২ ভোট।

এ আসনে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য সোহরাব উদ্দিন। ঈগল প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের এ নেতা পেয়েছেন ৮৯,৫৩৯ ভোট।