কাউকেই ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দেওয়া হবে না: সফিকুজ্জামান

“সিলিন্ডার গ্যাসের বাজার অস্থির। কেন এমন হচ্ছে, এ বিষয়ে আমি গোয়েন্দা সংস্থাকে অনুরোধ করব অনুসন্ধান করতে,” বলেন এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 20 Sept 2022, 12:00 PM
Updated : 20 Sept 2022, 12:00 PM

বাড়তি দামসহ মেয়াদোত্তীর্ণ এবং অবৈধভাবে বড় থেকে ছোট সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অভিযান চালাবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান এসব অনিয়মের বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, “কাউকেই ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দেওয়া হবে না।”

অধিদপ্তরের সভাকক্ষে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এলপি গ্যাস উৎপাদনকারী, বাজারজাতকারী এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এমন হুঁশিয়ারি দেন।

সরকারের নির্ধারণ করা ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ১২৩৫ টাকা এবং ২৫ কেজির দাম ২ হাজার ৫৭১ টাকা।

কিন্তু ভোক্তাদের কাছে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বাজারে ১ হাজার ৪৫০ টাকা পর্যন্ত এবং ২৫ কেজির দাম ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে এমন অভিযোগ পাওয়ার কথা জানায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

সভায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সফিকুজ্জামান বলেন, “নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে সিলিন্ডার বা বোতলজাত গ্যাস বাজারে বিক্রি হচ্ছে এমন অভিযোগ পাওয়া যায় যাচ্ছে নিয়মিত।

“এর বাইরে বাজারে সিলিন্ডারের মেয়াদোত্তীর্ণ ও ক্রস ফিলিংয়েরও (বড় থেকে ছোট সিলিন্ডারে ভরা) অভিযোগ আছে। তাই জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করবে।”

নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন ‘বার্নিং ইস্যু’ হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সিলিন্ডার বিস্ফোরণ কেন হবে? লাইফটাইম আছে। প্রস্তুতকারকদের এই জায়গায় মনোযোগ দিতে হবে।

 “অনেক জায়গায় অতিরিক্ত লাভের আশায় সিলিন্ডার ক্রস ফিলিং করা হয়, এটি কোম্পানিগুলোর জন্য ক্ষতিকর। এখানে কোম্পানিগুলোকে মনোযোগ দিতে হবে।”

সিলিন্ডার গ্যাসের বাজার ‘অস্থির’ হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, “কেন এমন হচ্ছে, এ বিষয়ে আমি গোয়েন্দা সংস্থাকে অনুরোধ করব অনুসন্ধান করতে।

“নির্দিষ্ট একটি চক্রের জন্য সরকার বিব্রত হবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না। আমদানিকারক, উৎপাদক, বিক্রেতা পর্যায়ে আলোচনা করতে হবে, ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে দাম নিয়ে আসতে হবে।”

মতবিনিময় সভায় কোম্পানিগুলোর পক্ষে বসুন্ধরা এলপি গ্যাস লিমিটেডের হেড অব সেলস জাকারিয়া জালাল জানান, এই খাতে তাদের বিনিয়োগ ২২ বছরের।

তিনি বলেন, “২২ বছর পর ভোক্তা আমাদের ডাকল। তাহলে কি আমরা এতবছর মানুষকে ঠকিয়েছি?”

জাকারিয়া বলেন, “এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি দেয় সরকার, আর আমরা সিলিন্ডারে ৮২ টাকা ভ্যাট দিই। রেগুলেটরি ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলারদের জন্য বরাদ্দ রেখেছে ৭২ টাকা। অথচ এটার পরিবহন খরচ ১৬৩ টাকা।

“বাকি ৯১ টাকা কে দেবে? তেলের দাম বেড়েছে দুই মাস হল। এখনও বিইআরসি ৬৫ টাকা লিটারে তেলের হিসাব করে। তাহলে কি সিলিন্ডার পরিবহনে আমাদের খরচ বাড়ে নাই?

“কে না জানে ডলারের দাম বেড়েছে, তারা কেন কম দামে ডলার ধরে দেয়? তাদের কাছে জানতে চাইলে কোনো জবাব পাওয়া যায় না।”

দোকান পর্যায়ের খুচরা বিক্রেতা হাজী বদিউল আলম বলেন, “আমরা একেকটা সিলিন্ডার ১ হাজার ২৬০ টাকা দিয়ে কিনি, এর বাইরে আমাদের পরিবহন খরচ আছে। আমরা লসেই বিক্রি করছি। দুইদিন পর আমরা পথে বসব।

“এখানে সাড়ে ১৩শ থেকে ১ হাজার ৩৭০ টাকায় বিক্রি করা ছাড়া বিকল্প নেই।”  

ওমেরা এলপিজির ডিস্ট্রিবিউটর আহমদুল্লাহ সাইদ বলেন, “আমাদের নিজস্ব খরচে কোম্পানি থেকে এলপিজি নিয়ে আসতে হয়। ঘোড়াশাল থেকে ট্রাকে ২০৬ থেকে ২০৮ পিস সিলিন্ডারের জন্য পরিবহন খরচ পড়ে প্রায় ছয় হাজার টাকা।”

এছাড়া আলাদা করে নিজেদের বিভিন্ন গন্তব্যের জন্য ট্রাকের ভাড়া এবং মজুরি যোগ হয় বলে দাবি করেন তিনি।

এলপি গ্যাস কল্যাণ সমিতির সভাপতি এবং ওমেরা ডিলার সেলিম খান বলেন, “রিটেইলারদের কাছে পৌঁছে দিতে আমাদের প্রতিটি সিলিন্ডারে গড়ে ১৫ থেকে ২০ টাকা খরচ আছে।

“রেগুলেটরির বেঁধে দেওয়া দামেই আমরা বিক্রি করছি। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা রিটেইলারদের বলে দেই তারা যাতে ২০ টাকার বেশি অতিরিক্ত লাভ না করে।”

সভায় কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) প্রতিনিধি কাজী আব্দুল হান্নান বলেন, “২২ বছর ধরে বাজারে এই সিলিন্ডার ব্যবসা চলছে। অতীতে কখনো এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

“ক্রমাগত মার্কেট বাড়ছে কিন্তু কোনো পরিবর্তন আসছে না। যেমন খুশি তেমন দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। এখানে বিইআরসি (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) কিছুই করতে পারছে না। তখন আমরা বাধ্য হয়েছি আদালতে যেতে।

“পরবর্তীতে আদালতের এক নির্দেশের মাধ্যমে বিইআরসি মূল্য নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে।”

দেশের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নষ্ট হোক ক্যাব কখনো এমনটা চায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা কারও পক্ষে কিংবা বিপক্ষে না, আমরা চাই ভোক্তার স্বার্থে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হোক।”

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির উপপরিচালক ফিরোজ জামান বলেন, “দাম নির্ধারণ গণশুনানির মাধ্যমেই হয়। সরকার যে আইন করেছে সেখানে ভোক্তা, ব্যবসায়ী সবার স্বার্থই দেখব। আমি কমিশনকে প্রতিবেদন দেব।

“ডিলাররা অভিযোগ করেছেন যে, তারা অভিযোগ জানানোর জায়গা পান না। ২০০৩ সাল থেকে আমরা কাজ শুরু করেছি। ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সমস্যা উপস্থাপন করার সুযোগ আছে। আইনের মধ্যে থেকে  বিষয়গুলো সমাধান করতে হবে।”

মতবিনিময় সভায় এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতা, ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক