Published : 17 Sep 2025, 09:55 PM
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ কী হবে, তা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা এখন সীমিত হয়েছে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ ও গণভোটের মধ্যে।
বিশেষজ্ঞ কমিটির ওই দুই প্রস্তাব নিয়ে বুধবার দীর্ঘ আলোচনা হলেও গণভোট কবে কীভাবে হবে, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছে বিএনপি, জামাতসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো।
রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তৃতীয় ধাপের আলোচনা শেষে এ বিষয় বিস্তারিত তুলে ধরেন কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সর্বশেষ আলোচনায় এ ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে যেগুলো সংবিধান সংশ্লিষ্ট নয়, সেগুলো অধ্যাদেশ জারি করে বা সরকারি আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। সরকার সেগুলো বাস্তবায়ন করবে।
“সংবিধান সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বাস্তবায়নের পথে আমাদের বিশেষজ্ঞ প্যানেল আগে দুটো বিষয়ের কথা বলেছিলেন—তার একটি হচ্ছে গণভোট, আরেকটি হচ্ছে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে এই দুটো বিষয়কে সমন্বিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ মতামত কমিশনকে তারা দিয়েছেন এবং সেটা আমরা আজকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে উপস্থাপন করেছি।
“আমাদের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের কাছ থেকে যে সুপারিশ পাওয়া গেছে, তারা বলছেন যে ঐক্যমত কমিশনকে এই মতামত দিচ্ছেন এবং আমরা এটা সরকারের কাছে সুপারিশ হিসেবে হাজির করতে পারি। তারা বলছেন যে অন্তর্বর্তী সরকার একটি কনস্টিটিউশনাল অর্ডার, যেটা জুলাই ঘোষণার ২২ দফা অনুসরণ করে ঘোষণা করতে পারে। এই কনস্টিটিউশনাল অর্ডারের মধ্যে থাকবে যে কোর রিফর্ম, যেগুলো মূলত সংবিধান সংশ্লিষ্ট যে সমস্ত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে সেগুলো থাকবে।”
কমিশনের সহসভাপতি বলেন, “তারা আরও বলছেন যে এই কনস্টিটিউশনাল অর্ডারটি পরবর্তী সময়ে—অর্থাৎ যেদিন পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—সে একই সময়ে গণভোট করা যেতে পারে এবং যেই অর্ডারের কথা তারা বলছেন, কনস্টিটিউশনাল অর্ডারের মধ্যে ওই গণভোটের বিধানটি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
“তৃতীয়ত তারা বলছেন যে এই কনস্টিটিউশনাল অর্ডার ইমিডিয়েটলি ইফেক্টিভ হবে, যখন এটা ঘোষণা করা হবে। তবে গণভোটের মধ্য দিয়ে যখন জনগণের সম্মতি পাওয়া যাবে তখন থেকে এটাকে ভ্যালিডেটেড বলে মনে করা হবে এবং যখন থেকে আইনটা করা হয়েছে তখন থেকে তার বাস্তবায়ন বিবেচনা করা হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে কিছুটা সময় দিতে চাই, যেটা তারা অনুরোধ করেছেন—যাতে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে বিকল্পগুলো কমিয়ে আনতে পারে। আমরা চাই আমাদের পক্ষ থেকে ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারকে একাধিক বিকল্প পদ্ধতি সুপারিশ করতে। সেজন্য এখন যেটা আছে—প্রায় ছটির মত (প্রস্তাব) রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে এবং বিশেষজ্ঞ প্যানেলের কাছ থেকে একটি আমাদের হাতে আছে—আমরা চাই এটা আরো কমিয়ে আনতে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আমাদের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকবে এবং আমরা আশা করছি অক্টোবরের শুরুর দিকে আমরা আবার মিলিত হব।
“আমরা সকলে একমত হতে পারি বা কমিশন যখন এই মতামতগুলোর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করার মত অবস্থায় উপনীত হবে, সে সময় যেন আমরা কমিশনের প্রধান এবং মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার কাছে সুপারিশগুলো উপস্থাপন করতে পারি।আলোচনার ক্ষেত্রে এখন এই পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। আমরা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ রাখব এবং আমরা আশা করছি অক্টোবরের শুরুর দিকেই আমরা আবার বসে খুব দ্রুততার সঙ্গে কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তৈরি করে সরকারকে দিতে পারব।”

বিএনপি বলছে, গণভোটের মাধ্যমেই যদি এর সমাধান করতে হয়, তাহলে সেই ভোট হওয়া উচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা যাই করি, হতে পারে এটা কনস্টিটিউশনাল অর্ডার, এক্সট্রা কনস্টিটিউশনাল অর্ডার অথবা স্পেশাল কনস্টিটিউশনাল অর্ডার অথবা অন্য যে কোনো প্রকার রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল অথবা ঐতিহাসিক জাতীয় দলিল। যে কোনো কিছু আমরা প্রণয়ন করি, একটা প্রশ্ন থেকে যায়।
“জুলাই সনদের যে বিষয়গুলো শুধুমাত্র সংবিধান সংস্কার অথবা সংশোধন সংক্রান্ত, সেই বিষয়গুলো এখনই কার্যকর করার মত কোনো দলিল প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই সরকার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে কি না? জুডিশিয়ারি কী বলে? আমরা জুডিশিয়ারির কাছে যাই।”
গণভোট নিয়ে তিনি বলেন, “যদি গণভোট করতে হয়, এই বিষয়ে এবং সেটার কার্যকারিতার তারিখ নির্ধারণ করতে হয়, গণভোটের রেজাল্ট… সেই গণভোটের প্রস্তাব করা হয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেদিন হবে সেদিনে। আমরা বলেছি জাতীয় সংসদে যারা ভোট প্রদান করবেন, এমপিদের, তার তো একটা জাতীয়ভাবে পরিসংখ্যান হবে যে কতজন ভোট দিলেন কত ভোটার ভোট দিলেন তার মধ্যে ম্যাক্সিমাম ভোটার মেজরিটি যদি এই জুলাই সনদকে স্বীকৃতি দিয়ে এই সংস্কারগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে।
“সেটা একটা আইনি বৈধতা আসবে, সেটাও বিবেচনা করা যায়। তখন সেই মেজরিটির মতামতের ভিত্তিতে সেই জাতীয় সংসদ তো সেগুলা সংশোধন করবে আর যারা মেজরিটি ভোট পাবে তাদের তো প্রতিশ্রুতি থাকবে জাতীয় সংসদে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য, যেহেতু এই সনদ স্বাক্ষরিত হবে।
“তখন বলা যায় যে মেজরিটি ভোট যারা পেয়েছে, যে দল অথবা জোট সরকার সংসদে থাকবে, তারা যেমন রেসপন্সিবল থাকবে, সমস্ত জাতীয় সংসদের সকল সদস্য রেসপন্সিবল থাকবে।সেটা জনগণের রায়ে এবং এটাও আমরা বলেছি, যা কিছুই গৃহীত হোক সেটা হবে জাতীয় সংসদে।”
তিনি বলেন, “যখন সংশোধনী গ্রহণ করা হবে, সংবিধানের সেখানে কিছু মৌলিক প্রশ্নে আমরা সম্মত হয়েছি। সে সংশোধনীগুলো আসবে যেগুলোর জন্য সাংবিধানিকভাবে অবশ্যই আবার গণভোট করতে হবে, এটা গণভোটের পরে, তাহলে দুটো গণভোট দরকার হবে। এগুলো সব বিষয়ে বিবেচনা করলে আমাদের (জাতীয় নির্বাচনের) আগেও করতে হবে, পরেও গণভোট করতে হবে। সেই হিসেবে আমরা বলছি, গণভোট জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে করার কথা।
“সেজন্য আমরা বলেছি, দেখুন আমরা আলোচনার টেবিলে আছি আমরা সমাধানের জন্য এক জায়গায় যাওয়ার জন্য প্রতিদিন ইনোভেটিভ আইডিয়াস বা জাতির পক্ষে সমাধানের জন্য আমরা প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছি। এখন যদি আলোচনার টেবিলে সমাধান হয়, আমি আশা করি হবে, তাহলে যে কোনো অসাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে আমরা বন্ধ করতে পারব।”
ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক থেকে বের হয়ে জামায়াতে ইসলামের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি দিতে হবে।
তিনি বলেন, “জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি এখন বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের দাবি। এটা দাবি করার কথা ছিল না। তবে অনেকেই রাস্তায় মিছিলের উদাহরণ দিচ্ছেন, সবার জানা আছে রাস্তার মিছিলের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের বিদায় হয়েছে। সুতরাং জুলাই সনদের যদি বাস্তবায়ন করতে সরকার দেরি করে, অথবা অন্য কিছু হয়, তাহলে আবার জনগণ রাস্তায় নামবে এটা খুবই স্বাভাবিক।
“এর বাইরে যাওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই। যে কোনো দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য বাংলাদেশের ঐতিহ্যই হল আন্দোলন সংগ্রাম লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই এগুলো বাস্তবায়িত হয়।”
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “জুলাই সনদের ভিত্তিতেই নির্বাচনটা করলে নির্বাচন সুষ্ঠ হবে। সাংবিধানিক বিষয়গুলো এখানে স্থান পাবে। যারা বলছেন সাংবিধানিক বিষয়গুলো এখানে স্থান পাবে না, শুধু অমৌলিক বা যেগুলো জেনারেল আছে, কম গুরুত্বপূর্ণ আছে, সেগুলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে হচ্ছে হবে। মৌলিকগুলো পার্লামেন্টে যাবে… আমরা সেখানে বলেছি যে পার্লামেন্টের কোনো এখতিয়ার নাই–কনস্টিটিউশনাল বেসিক স্ট্রাকচার অ্যামেন্ডমেন্ট করে চেঞ্জ করতে পারে না পার্লামেন্ট। এটার জবাব কিন্তু উনারা ( বিএনপি) দিতে পারেন নাই।”
বিএনপির বক্তব্যের সমালোচনা করে আযাদ বলেন, “কেয়ারটেকার সরকারের জন্য রাজপথে আন্দোলন করেছে, সংগ্রাম করেছে, বক্তৃতা দিয়েছে বিএনপি, বলেছ ‘আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখেই শেখ হাসিনা কেয়ারটেকার বাতিল করেছেন’, তা আপনার আগের বক্তব্য আর আজকের অভিমত স্ববিরোধী। ঐকমত্য কমিশনের ভেতরে কিন্তু বহুবার আলোচনা হয়েছে আদালতকে আমরা বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে চাই।
"আজকের ঐকমত্য কমিশন যে প্রস্তাবটা দিয়েছে সেই জায়গায় যদি আমরা একমত হয়ে যাই, তাহলে দেশ আগামীতে সুন্দর একটি নির্বাচন পাবে, ফেব্রুয়ারিতে যথাসময় নির্বাচন হবে। ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে আমরা নতুন বাংলাদেশ, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে দেশটাকে এগিয়ে নিতে পারব, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।”
তিনি বলেন, “জুলাই সনদকে ডিক্লাইন করার কোনো সুযোগ এখানে আছে বলে আমি মনে করি না। যারা এই পথে হাঁটবেন, আমার মনে হয় জনগণ তাদের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। জুলাই সনদের স্পিরিট যারা ধারণ করে না, ইতোমধ্যে কিন্তু ছাত্র সংগঠন নির্বাচনের ফলাফল এটা প্রমাণিত হয়েছে। আমরা জনমতকে ও জনঅভিপ্রায়কে প্রাধান্য দিয়ে এগোতে চাই।”
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, এবি পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা এদিন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন।