শিক্ষক নিয়োগ: রায় জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তে কমিটি, রায় ঘোষণা ২৬ নভেম্বর
এ বিষয়ে রায়ের জন্য আগামী ২৬ নভেম্বর দিন দিয়েছে আদালত।
শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত মামলায় হাই কোর্টের ‘রায় জালিয়াতির’ অভিযোগের পুরো ঘটনা তদন্তে রেজিস্ট্রার জেনারেলকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
পাশাপাশি আগামী ২৩ নভেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে; একই সঙ্গে এ বিষয়ে রায়ের জন্য আগামী ২৬ নভেম্বর দিন দিয়েছে আদালত।
সোমবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন-বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি।
তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, “মাত্র তো আদেশ হল। আদেশের কপি আমাদের কাছে আসলে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন শুরু করবো।”
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়ার বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলায় ‘জালিয়াতির মাধ্যমে হাই কোর্টের রায় নেওয়ার’ অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি আপিল বিভাগে আসে।
গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের শুনানিতে মামলার নথিতে প্রক্রিয়াগত অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
এরপর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বিচারপতিরা সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর নথি পর্যালোচনা করেন। ওই দিন ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়াকে পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা ছাড়তে নিষেধ করা হয়। এই বিষয়ে আদেশের জন্য সোমবার দিন ঠিক করে আপিল বিভাগ।
সেদিন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের বিপক্ষে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিলের শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের নজরে বিষয়টি আসে।
অনীক আর হক বলেন, ২০২৩ সালের একটি মামলায় নতুন আবেদনকারীদের পক্ষভুক্ত করার আবেদনের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত ব্যত্যয় ঘটে। ১০ অক্টোবর এক আইনজীবী হলফনামাসহ নতুন আবেদনকারীদের পক্ষভুক্ত করার আবেদন করেন। পরদিন শুনানির পর আবেদনটি মঞ্জুর হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, নতুন পক্ষগুলোর নাম নথিতে অন্তর্ভুক্ত করতে ফাইলটি সেকশনে যাওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি বলে দাবি করেন অনিক আর হক।
এরপর ১২ অক্টোবর মামলাটির পূর্ণাঙ্গ শুনানি হয়। অথচ শুনানির আগে প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে ‘রেডি ফর হিয়ারিং’ সিল থাকার কথা থাকলে এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি বলে দাবি করেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী ।
অনীক আর হক বলেন, শুনানির পর ১৬ অক্টোবর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন বিচারপতিরা। এর মধ্যে ১৫ অক্টোবর মূল আবেদনকারীদের ৫৮ জনের মধ্যে প্রায় ৪০ জনকে বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়।
তার অভিযোগ, এ আবেদনসংক্রান্ত আদেশের নথিও যথাযথভাবে সেকশনে যায়নি। বাদ পড়া আবেদনকারীদের পক্ষে হলফনামায় স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিরও এ কাজ করার ক্ষমতাপত্র বা অনুমতিপত্র ছিল না বলে রাষ্ট্রপক্ষ নথি পরীক্ষা করে দেখেছে।
এরপর ১৬ অক্টোবর রায় ঘোষণা করা হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
অনীক আর হক বলেন, “সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ মনে করছে। কারণ, তিনি ক্ষমা চেয়ে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন।”
সিদ্দিকুল্লাহর করা অন্য একটি মামলার প্রসঙ্গ তুলে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “রায় ঘোষণার আগের দিন সম্পূরক রুল জারি করা হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে সরকারের কাছে নোটিস পাঠিয়ে জবাব নেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ফাইলটি সংশ্লিষ্ট বিচারপতির সামনে রাখা হয় এবং সরকারের বিপক্ষে রায় দেওয়া হয় বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ।”
একই দিনে হওয়া আরও কয়েকটি মামলার নথিও প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতিরা পর্যালোচনা করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
রায় জালিয়াতির অভিযোগ নাকচ করে আইনজীবী মোহাম্মদ ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটি রায় জালিয়াতির ঘটনা নয়; মূলত পক্ষভুক্ত করার আবেদনসংক্রান্ত প্রক্রিয়াগত বিষয়।”
তিনি বলেন, মামলাটি কোটা আন্দোলনের সময়কার একটি নিয়োগসংক্রান্ত রিট। মূল মামলাটির শুনানি এখনও হয়নি। শুনানিকালে কিছু আবেদনকারীকে বাদ দেওয়া এবং নতুন কয়েকজনকে পক্ষভুক্ত করার আবেদন করা হয়েছিল।
ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়া বলেন, “আমার পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু বাকি আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া সেকশনে সম্পন্ন হতে যে সময় প্রয়োজন, তা পর্যাপ্ত পাওয়া যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী সব করা হলেও প্রক্রিয়ার জন্য সময়ের স্বল্পতা ছিল।”
ভুলটি সেকশনের কী না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আদালত ও সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ আসার আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।”
এ প্রসঙ্গে সোমবার সিদ্দিক উল্লাহ মিয়ার আইনজীবী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, জালিয়াতির অভিযোগে সব মিলিয়ে প্রায় ১৮টি মামলার নথি আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে, তা তদন্ত করে প্রতিবেদন আপিল বিভাগের কাছে উপস্থাপনের দায়িত্ব রেজিস্ট্রারকে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আগামী ২৩ নভেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে হবে। এরপর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী আদেশ দেবেন আদালত।
এ সময় এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ আরো অন্যান্য আইনজীবীদের সঙ্গে অভিযুক্ত আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়াকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
