Published : 16 Sep 2025, 06:58 PM
‘অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সন্দেহজনক লেনদেনের’ অভিযোগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. ছিদ্দিকুর রহমান সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
তার বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদনের তথ্য মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, দুদকের প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক মো. আবুল হাসনাত তার বিরুদ্ধে অভিযোগটি অনুসন্ধান করেছেন।
দুদক বলছে, অনুসন্ধানে রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান ছিদ্দিকুরের জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে ‘অসঙ্গতিপূর্ণ’ ৩৬ কোটি ১৫ লাখ ৯৭ হাজার টাকার সম্পদ অর্জন এবং তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ১৭৭ কোটি ৫৮ লাখ ২৭ হাজার টাকার ‘অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য’ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর এবং ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন ছিদ্দিকুর। সেনাবাহিনীতে তিনি ইঞ্জিনিয়ার-ইন-চিফ সেনাসদরসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এসব দায়িত্বে থাকার সময় ‘ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসদাচরণের’ মাধ্যমে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘জ্ঞাত আয়বহির্ভূত’ সম্পদের পরিমাণ ৩৬ কোটি ১৫ লাখ ৯৭ হাজার ৬৮৫ টাকা।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়, এছাড়া তার নামে ৩৮টি ব্যাংক হিসাবে মোট ৭৫ কোটি ৬৫ লাখ ৯৭ হাজার ৫২১ টাকা জমা এবং ৭৫ কোটি ৬৫ লাখ ২৪ হাজার ৪৩৬ টাকা উত্তোলনসহ সর্বমোট ১৫১ কোটি ৩১ লাখ ২১ হাজার ৯৫৭ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ১৯টি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ১৩ কোটি ১৬ লাখ ৫৭ হাজার ৩৭ টাকা এবং উত্তোলন হয়েছে ১৩ কোটি ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৬৩৭ টাকা। সব মিলিয়ে ১৭৭ কোটি ৫৮ লাখ ২৭ হাজার ৬৩১ টাকার ‘অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক’ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দুদক বলছে, এভাবে ‘দুর্নীতি ও ঘুষ’ থেকে প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পত্তি মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে রূপান্তর, স্থানান্তর ও হস্তান্তরের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
এ কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্দান্তে অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের বরাতে দুদক বলেছে, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান ছিদ্দিকুরের বৈধ উৎসের সম্পদ (ঋণসহ) ৩২ কোটি ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৬৫ টাকা। অনুসন্ধানকালে তার প্রাপ্ত সম্পদের মূল্য দাঁড়ায় ৫৪ কোটি ৩৪ লাখ ৭৫ হাজার ২২৮ টাকা। এ সময় তার পারিবারিক ব্যয় হিসাব করা হয় ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৮৯ হাজার ২২২ টাকা। অর্থাৎ পারিবারিক ব্যয়সহ মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৮ কোটি ১৭ লাখ ৬৪ হাজার ৪৫০ টাকা। সেই হিসাবে তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ৩৬ কোটি ১৫ লাখ ৯৭ হাজার ৬৮৫ টাকা।
এর আগে গত ১৯ মে আদালত ছিদ্দিকুর ও তার স্ত্রী গাজী রেবেকা রওশনের নামে থাকা বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট (বিও অ্যাকাউন্ট) ও শেয়ার অবরুদ্ধের আদেশ দেন।
সেসময় দুদকের আবেদনে বলা হয়, ছিদ্দিকুরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পসহ একাধিক প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। কেবল তার নামেই নয়, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামেও জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধান করছে দুদকের একটি দল।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ছিদ্দিকুর ও তার স্ত্রীর নামে ১৩টি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ শেয়ারের মালিকানা রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রে ‘বিপুল অস্থাবর সম্পদ’ পাওয়া গেছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, তারা এসব বিও অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ তুলে ‘বিদেশে পাচারের চেষ্টা’ করছিলেন।
এর আগে গত ১৭ এপ্রিল একই আদালত ছিদ্দিকুর ও তার স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ছিদ্দিকুরকে ২০২৪ সালের এপ্রিলে দুই বছরের জন্য রাজউক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল সরকার। সরকার পরিবর্তনের পর ওই বছর ১৯ সেপ্টেম্বর তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরায় অন্তর্বর্তী সরকার। পরে আবার সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ২২ সেপ্টেম্বর তাকে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। চলতি বছরের মার্চে আবার তাকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়।
দুদকের অভিযোগের বিষয়ে ছিদ্দিকুর রহমানের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাড়া দেননি। বার্তা পাঠানো হলে, এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।