Published : 01 May 2026, 11:35 PM
ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগেই তাল বীজ নিয়ে সড়কের পাশে ও ফাঁকা জায়গায় ছুটে চলেন তিনি। সকাল সকাল সেই বীজ লাগিয়ে আবার অফিস ধরেন। অফিস শেষে বিকালে অঙ্কুরিত চারায় পানি আর যত্নাদি নিতেই দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। চট্টগ্রাম সাইলোর তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী খেদমত আলী রোজ এভাবেই দিন কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
৫২ বছর বয়সি খেদমত গেল পাঁচ বছরে ১০ হাজারের বেশি একাধিক গাছের বীজ লাগিয়েছেন।
এই উৎসাহ কোথা থেকে এল, প্রশ্ন করতেই খেদমত আলী বললেন, “ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসার পর দেখি অনেক ফাঁকা জায়গা পরে আছে। রাস্তা রোদে খাঁ খাঁ করে, কিন্তু কেউ কোনো গাছ লাগায় না।
“ফাঁকা জায়গা দেখতে ভালোও লাগে না। তাই গাছ লাগানোর কথা মাথায় আসে।”
কথায় কথায় তিনি এও বললেন, “হামরা গ্রামে দেখছি আগে বাবুই পাখির ভাসা (বাসা) করতো তালগাছে। কিন্তু এহানে আসার পর গাছ ও ভাসা কিছুই দেখি না। তাই ভাবছিলাম তাল গাছ লাগাব।”
খেদমতের বাড়ি বগুড়ার আদমদিঘী উপজেলার সান্দিরা গ্রামে। অর্থ সংকটে নবম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা হয়নি। এরপর জীবিকার তাগিদে ঢাকায় ছুটে যান। কিছুদিন দৈনিক সংবাদে অফিস সহায়কের কাজ করেন। পরে খাদ্য কর্মসূচির কাজে চট্টগ্রাম থিতু হন।

৩০ বছরের বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামে বসবাসকারী খেদমত শুরুতে খাদ্য কর্মসূচির বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেছেন। প্রায় দুই দশক ধরে চট্টগ্রাম সাইলো’র তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন।
তাল বীজ রোপণের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল কীভাবে, তার বর্ণনায় খেদমত বললেন, “আমার চাকরি জীবনের শুরুতে একজন সাইলো সুপার ছিল। তিনি তালের পিঠা ও বড়া (পিঠা) পছন্দ করতো।
“তাই ময়মনসিংহের নান্দাইল থেকে কিছু তাল নিয়ে আসা হয়েছিল। সেগুলা থেকে তালের সব পিঠা ও খাবার তৈরির পর বীজগুলো সাইলোর ভিতরে ফাঁকা জায়গায় প্রথম রোপণ করি।”
২০২১ সাল থেকে তাল বীজ রোপণ শুরু করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার তালের বীজ রোপণ করেছি। যার বেশির ভাগ গাছ হিসেবে বড় হচ্ছে। আমি নিয়মিত গাছের যত্নও করি। কর্ণফুলি টানেল রোডের দুই পাশে এসব গাছ লাগানো হয়েছে।”
খেদমত বলতে থাকেন, “চট্টগ্রামে আসার পরপরই গাছ লাগানোর চিন্তা থাকলেও বীজ রোপণ করিনি। কারণ ১৯৯৩ সালে শুনতে পাই, কর্ণফুলি টানেলের এই রাস্তা অনেক উঁচু করা হবে। আর রাস্তা উঁচু করতে সব গাছ নষ্ট বা মারা যাওয়ার ভয়ে আগে বীজ রোপণ করিনি।

“২০২২ সালের পর থেকে পুরোদমে তাল বীজ রোপণ শুরু করি। এই কর্ণফুলি টানেল রোডে (বেরিবাঁধ রোড) সাড়ে ৪ হাজার গাছ লাগিয়েছি।”
একবার অসুস্থ হয়ে পড়ায় প্রায় চারশ বীজ নষ্ট হয়ে যায়। সেই কথা মনে পড়লে এখনও আক্ষেপ হয় খেদমত আলীর।
তার কথায়, “আমি তাল গাছ লাগাই—এটা এই এলাকার সবাই প্রায় জানে। তাই একবার এক জায়গায় ট্রাক দুর্ঘটনায় অনেক তাল ফেলে গেছিল, সেখানের সন্ধান পাইছিলাম।
“সেখান থেকে প্রায় ৪০০ বীজ পেয়েছিলাম, কিন্তু পরে আমার শরীরে ফোঁড়া হয়। অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর কোনো কাজ করতে পারিনি। এই সময় বীজগুলো লাগাতে না পারায় নষ্ট হয়েছে।”
তালের পাশাপাশি কয়েক হাজার কাঁঠাল বীজ ও চারা রোপণ করেছেন বলে জানালেন বৃক্ষপ্রেমী খেদমত।
তিনি বলেন, “তাল বীজই বেশি লাগিয়েছি। এর বাইরে চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট রোডে কয়েক হাজার কাঁঠাল গাছের বীজ ও গাছ লাগিয়েছিলাম, কিন্তু মানুষ ও পশুরা সেগুলা নষ্ট করেছে। অল্প কিছু বড় হয়েছে।”
এক প্রশ্নের জবাবে খেদমত আলী বলেন, “এই অঞ্চলে তাল গাছ নাই। ভবিষ্যতে অনেকে তালের স্বাদ ভুলে যেতে পারে। এই চিন্তা করেই বেশি তাল গাছ লাগিয়েছি।”
এক মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে চট্টগ্রামে বসবাসকারী এই ব্যক্তি গাছের খেদমত করেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চান।