Published : 06 May 2026, 03:53 PM
সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র বাতিলের নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাই কোর্ট।
বিচারপতি রাজিক আল জলিল এবং বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ বুধবার এই আদেশ দেয়।
আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম, আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান ও মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
রুল জারির পর আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান জানিয়েছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসরের পর তিন বছর অতিবাহিত না হলে কেউ এমপি হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন না।
তবে মনিরা শারমিনের প্রার্থিতা বৈধ দাবি করে এই আইনজীবী বলেন, "মনিরা শারমিন কৃষি ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী তিন মাসের বেতন জমা দিয়ে তার চাকরির অবসান (টার্মিনেট) করেছেন। সুতরাং চাকরি থেকে তার এই ইস্তফা দেওয়াটা আরপিওর ওই বিধিনিষেধের আওতায় পড়ে না। নির্বাচন কমিশন বেআইনিভাবে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করে তাকে এমপি হিসেবে শপথ নেওয়া থেকে বারিত করেছে।"
রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে এ ধরনের আইনকে বড় বাধা
আদালতের আদেশের পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মনিরা শারমিন আইনের অস্পষ্টতা ও প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “আইনটি মূলত তৈরি হয়েছিল আমলা, আইজিপি বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের জন্য; যারা তিন বছর অতিবাহিত হওয়ার আগেই নির্বাচন করলে ভোটারদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন বা প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দিতে পারেন। কিন্তু একটি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তার পক্ষে কোনো নির্বাচনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করার সক্ষমতা থাকে না।”
সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রে এই আইনের প্রয়োগকে ‘অসম্ভব’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনি এলাকা (কনস্টিটিউয়েন্সি) থাকে না; তাদের ভোটার হলেন ৩০০ আসনের সংসদ সদস্যরা। সুতরাং আমার ওপর আরপিওর এই ধারাটি কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়।”
তরুণ ও শিক্ষিতদের রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে এ ধরনের আইনকে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে এনসিপির এই নেত্রী বলেন, “বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই বাধা নেই, অথচ আমাদের কাজের ধরন একই। এটি নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে। শিক্ষিত মানুষ যদি নিজের ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করে রাজনীতিতে আসতে চায়, সেখানে এ ধরনের কালো আইন দিয়ে বাধা তৈরি করা হলে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন কীভাবে বাস্তবায়ন হবে?”
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশন বেআইনিভাবে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে অভিযোগ করে মনিরা শারমিন নির্বাচন প্রক্রিয়ায় দ্বিমুখী নীতিরও অভিযোগ এনে তিনি বলেন, “বিএনপির চারজন সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। কিন্তু তাদেরও আরপিও অনুযায়ী নানা অযোগ্যতা রয়েছে। একই রকম স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা একজন তো সমালোচনা সামনে আসার পর গত ২৬ এপ্রিল পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু তারা সরকারি দল (জোট) হওয়ায় এ নিয়ে খুব বেশি কথা হয়নি। এটি আইনের সুস্পষ্ট ব্যত্যয়।”
মনিরা শারমিন ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে চাকরি ছাড়েন। চাকরি ছাড়ার পর তিন বছর পূর্ণ না হওয়ার কারণ দেখিয়ে গত ২৩ এপ্রিল রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত ২৬ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন মনিরা শারমিন। কিন্তু শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনও তার আপিল খারিজ করে দেয়। এরপর প্রার্থিতা ফিরে পেতে গত বৃহস্পতিবার হাই কোর্টে রিট দায়ের করেন তিনি।
সোমবার রিটটি শুনানির জন্য বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাই কোর্ট বেঞ্চে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ওই বেঞ্চের এক বিচারপতির এবং রিটকারীর বাড়ি একই গ্রামে হওয়ায় আদালত রিটটি শুনতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
পরে রিটকারী আইনজীবীরা তাৎক্ষণিকভাবে বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চে বিষয়টি নজরে আনলে মঙ্গলবার শুনানির দিন ধার্য করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শুনানি শেষে আদালত এই রুল জারি করল।
নারী আসনে প্রার্থিতা বাতিল: মনিরা শারমিনের রিটের আদেশ বুধবার