Published : 11 Aug 2025, 11:20 PM
ঢাকার মৌচাকে সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বেইজমেন্ট পার্কিংয়ে রাখা একটি গাড়ি থেকে দুজনের লাশ উদ্ধারের পর নিহতদের ‘গতিবিধির’ বিষয়ে ধারণা পেয়েছে পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজ ও পারিপার্শিক ঘটনা ‘বিশ্লেষণ’ করে তাদের হাসপাতালে যাওয়ার কারণ জানা গেলেও কীভাবে মৃত্যু হলো, সেটির উত্তর জানতে ‘একটু’ অপেক্ষা করার কথা বলছে পুলিশ।
পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মো. মাসুদ আলম বলছেন, ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় বেজমেন্টে গাড়ির মধ্যে তীব্র গরমে লাশ ‘ডি কম্পোজড’ হয়ে এমন অবস্থা হয়েছে, তাদের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন রয়েছে কিনা, তা প্রাথমিক অনুসন্ধানে বোঝা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, “অনেক জিজ্ঞাসা আছে, এসবের উত্তর পেতে দুয়ে-দুয়ে চার মেলাতে একটু সময় লাগবে।”
সোমবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে হাসপাতালের নিরাপত্তারক্ষীরা গাড়ির ভেতর দুজনের মরদেহ দেখে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
নিহতদের পরিচয় জানতে প্রথমে গাড়ির নম্বর ‘ঢাকা মেট্রো গ ৩৬-৩৭৪৫’ ধরে খোঁজ চালায় পুলিশ। পরে জানা যায়, গাড়ির মালিক জোবায়ের আহমেদ সৌরভ, যিনি নোয়াখালীর চাটখিলের বাসিন্দা।
পরে সৌরভের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, মারা যাওয়া দুজনের একজন জাকির হোসেন, যিনি গাড়িটির চালক। আরেকজনের নাম মিজান। তাদের বাড়িও নোয়াখালীর চাটখিলে। তারা রোববার ভোরে হাসপাতালটিতে এসেছিলেন সেখানে চিকিৎসাধীন এলাকার একজনকে বাড়ি নিয়ে যেতে।
রোগীর স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করার আগেই রোববার ভোরে তারা গাড়িসহ পার্কিংয়ে চলে আসেন। পরের দিন দুপুরে গাড়ির ভেতরে লাশ মেলে তাদের।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও গাড়ি মালিকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বলছে, চালক জাকিরের প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাই ছিলেন মিজান। দুজনের বয়সই ৪০ থেকে ৪২ বছরের মধ্যে।
পুলিশ বলছে, গাড়িটি ভাড়ায় যাত্রী আনা-নেওয়া করে। হাসপাতালে গাড়ির মালিক সৌরভের এলাকার চিকিৎসাধীন শিশু জোবায়েরকে বাড়ি নিয়ে যেতে যোগাযোগ করা হয়েছিল। এরমধ্যে গাড়ির মালিক সৌরভেরও বিমানবন্দরে কাজ ছিল, তাই সৌরভসহ তিনজন রোববার ভোর ৫টা ৩২ মিনিটে হাসপাতালের সামনে এসে পৌঁছান।
এরপর জাকির গাড়ি নিয়ে হাসপাতালের পার্কিংয়ে চলে যান। সৌরভ ও মিজান হাসপাতালের রিসিপশনে এসে কথা বলেন। কথাবার্তা বলে মিজান চলে যান গাড়ির কাছে, আর সৌরভ সেখান থেকে বিদায় নেয়। সিসিটিভি ফুটেজে মিজানের পায়ে হেঁটে গাড়ির কাছে যেতেও দেখা গেছে।
সিসিটিভি ফুটেজে মিজানকে গাড়ির কাছে পর্যন্ত যেতে দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত গাড়িতে উঠতে দেখা যায়নি। পিলারের আড়ালে থাকায় সেই অংশটি ক্যামেরায় আসেনি।
উপকমিশনার মাসুদ আলম বলেন, “সৌরভের সঙ্গে কথা বলে আমরা যেটা জানতে পেরেছি, সে এসেছিল অন্য একটা কাজে। আর এরা দুজন পেসেন্টকে নিয়ে যাবে বলে অপেক্ষা করছিল। এখানে জোবায়ের নামে একটা বাচ্চা আছে, তার অপারেশন হয়েছে। রোববার রিলিজ দেওয়ার কথা, কিন্তু রিলিজ দেয় নাই।
“তারা গাড়ি নিয়ে ভোরে আসছে। ওই সময় রোগীর লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে নাই। তখন হয়তো তারা ভেবেছে একটু রেস্ট নিয়ে ৯টা-১০টার দিকে কথা বলবে। কিন্তু তারা আর গাড়ি থেকে আর বের হননি।”
এদিকে গাড়ির মালিকও কাল থেকে টানা যোগাযোগের চেষ্টা করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। এরমধ্যে রোগীর লোকজনের মাধ্যমে সৌরভ জানতে পারেন, রোববার তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না, তাদের নেওয়ার জন্য কেউ হাসপাতালে গেলে যেন চলে যায়।”
মাসুদ আলম বলেন, “বেজমেন্টে যেহেতু নেটওয়ার্কের ঝামেলা আছে। মালিকও কয়েকবার ট্রাই করছে, যোগাযোগ করতে পারে নাই। মাঝখানে এ অবস্থা হয়েছে।”
মালিক কেন খোঁজ না পেয়ে হাসপাতালে এলেন না এবং নিহতদের শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে কিনা জানতে চাইলে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে শুরু করে আমাদের যাবতীয় টুলসগুলা ব্যবহার করে তদন্ত করছি। তদন্তের পরে বুঝতে পারব, আসলে কী হয়েছে।
“বেইজমেন্টে প্রচণ্ড গরম, গাড়ির দরজা বন্ধ করা। একটা লাশের তিন-চার দিন পর যে অবস্থা হয়, এগুলোর সে অবস্থা হয়ে গেছে। লাশ ‘ডিকম্পোজড’ হয়ে গেছে। এগুলো খালি চোখে দেখা মুশকিল। ময়নাতদন্তে গেলে চিকিৎসকরা হয়ত বুঝতে পারবেন, অন্য কোনো ঝামেলা আছে কিনা।”

রোববার রাত থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালের বেইজমেন্টে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন সুভাস বড়ুয়া।
তিনি বলছেন, “ভোর ৫ টা ৪০ মিনিটের দিকে গাড়িটি বেসমেন্টে প্রবেশ করে। হাসপাতালে রোগী রয়েছে বলে জানায় গাড়ির চালক। তবে কোনো রোগীর নাম বলেননি। পরে তার গাড়ির নাম্বার লিখে গাড়িটি ভেতরে প্রবেশ করতে দেই।”
তিনি বলেন, “যারা রোগী আনা-নেওয়া করেন, তারা কখনও চার-পাঁচ ঘণ্টা, কখনও সকালে এসে বিকাল পর্যন্ত থাকেন। ১২ বা ২৪ ঘণ্টা পরও বের না হওয়া গাড়িগুলো চেক করা হয়। ওই প্রাইভেটকারটি যখন ঢোকে, তখন শুধ চালক ছিলেন।”
সকাল ৮টার পর নিরাপত্তার দায়িত্বে আসা মিজানুর রহমান বলেন, “রাতে এমনিতেই বেইজমেন্টে নীরব থাকে। কোনো কাজ না থাকলে সাধারণত নিচে যাওয়া হয় না। শুধু গাড়ি আছে কিনা দেখে আসা হয়। রোববার রাতেও সেটাই হয়েছে, গাড়ি আছে কিনা দেখেছি।”
সোমবার সকালে ডিউটিতে আসা মিজানুরই গাড়িতে লাশ দেখতে পান। তার ভাষ্য, হাসপাতালটিতে রোগীর প্রচুর চাপ থাকে। যদি কেউ গাড়ি পার্কিং করতে চান, তাহলে রোগী নামিয়ে তারপর পার্কিংয়ে আসেন। প্রাইভেট কার রাখার চার্জ ৩০ টাকা; আর মোটরসাইকেলের জন্য ২০ টাকা নেওয়া হয়। প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় লেখা থাকে। যাওয়ার সময় টাকা আদায় করা হয়।
তিনি বলেন, “সোমবার সকাল পৌনে ১২ টায় পার্কিং খালি আছে কিনা দেখার জন্য বেইজমেন্টের তৃতীয় তলায় আসি। এসে দেখি, গাড়ির ভেতরে দুজন আছেন। বাইরে থেকে ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে দরজা খুলে দুজনকে দেখতে পাই। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা পুলিশে খবর দেন।”
গত ২২ জুলাই এ হাসপাতালে ছেলে জোবায়েরকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করান হুমায়ুন কবির। তার বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলায়। রোববার জোবায়েরকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিতে পারে বলে এলাকার মনির নামে একজনের মাধ্যমে গাড়িটি ঠিক করেন হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, “জাকির বিমানবন্দরে ভাড়া নিয়ে আসবে বলে জানায় মনির। ফেরার সময় আমাদের নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তখন আমি মনিরকে বলেছি, আমাদের রিলিজ দিলে আসতে বলবেন। গাড়ির লোকজনের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।”
রোববার তার ছেলের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কথা থাকলেও চিকিৎসকরা দেননি। কিন্তু এ তথ্য মনিরকে জানানোর আগেই জাকির ভোরে গাড়ি নিয়ে হাসপাতালে চলে গিয়েছিলেন। তারা পৌঁছে কোন ফোন দেননি বলে ভাষ্য হুমায়ুন কবিরের।
সিআইডির ফরেনসিক টিম আলামত সংগ্রহ করেছে জানিয়ে উপকমিশনার মাসুদ আলম বলেন, “তাদের কাছ থেকেও একটা মতামত পাব।”
মালিক সারাদিনেও যোগাযোগ করতে না পেরে পুলিশকে জানায়নি কেন, সেই প্রশ্নে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, “মালিক যেটা বলতেছে, ফোনে ট্রাই করতেচিল। ফোনে না পেয়ে উদ্বিগ্ন তো ছিলই। বিষয়টা তদন্তে নিয়ে আসব। যদি অস্বাভাবিক কিছু থাকে, তদন্তে চলে আসবে।”
আরও পড়ুন