কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন: প্রাণ বাঁচাতে দোতলা থেকে লাফ দেন শায়ান দম্পতি
“তারা যে ফিরে এসেছে এতেই শুকরিয়া।”
ঘুম ভাঙতেই চারপাশে ধোঁয়া। দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা। দরজা খুলে দেখেন, আগুনের কারণে নিচে নামার পথ বন্ধ। তখন স্ত্রী ফাহমিদা আক্তারের হাত ধরে দোতলা থেকে লাফ দেন শায়ান উল মান্নান। নিচে ড্রেনের পানিতে পড়ে প্রাণে বাঁচলেও ফাহমিদার কপালে আঘাত লাগে, আর আগুনের ফুলকিতে ঝলসে যায় শায়ানের পিঠ।
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের ইনানী এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকার বাসায় ফিরেছেন এ দম্পতি। শরীরে পোড়া ও আঘাতের ক্ষত নিয়ে ফিরলেও তাদের মন থেকে এখনো কাটেনি আতঙ্ক। শায়ান ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। আর ফাহমিদা বাড়ি ফেরার পর থেকে চুপচাপ বসে থাকছেন।
ছুটিকে স্মরণীয় রাখতে বেড়াতে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু আনন্দের সেই ভ্রমণ যে জীবন-মৃত্যুর এমন লড়াইয়ে পরিণত হবে, তা কল্পনাতেও ছিল না। প্রাণে বেঁচে ফিরলেও আগুনের মধ্যে আটকে পড়া আর জীবন বাঁচাতে দোতলা থেকে লাফ দেওয়ার স্মৃতি এখনো তাড়া করছে তাদের।
রোববার এ দম্পতির খোঁজ নিতে তাদের বাসায় যাওয়ার আগে ফোন করা হয় শায়ানের বাবা আব্দুল মান্নানকে। ছেলে ও পুত্রবধূর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা জানিয়ে তিনি না যাওয়ার অনুরোধ করেন। তাদের কাছ থেকে শোনা ঘটনা তিনি ফোনে বর্ণনা করেন।
শনিবার সকালে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার দূরে আগুনে পুড়ে যায় টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্ট। এতে একই পরিবারের ছয়জনসহ মোট ১০ জন নিহত হয়; আহত হয় নয়জন।
এক ট্যাক্সিচালকের ফোন থেকে সকাল ৮টার দিকে ছেলে শায়ানের দুর্ঘটনার খবর পান মান্নান। তিনি তখন একটি কাজে কেরাণীগঞ্জ যাচ্ছিলেন। রাস্তায় থাকায় প্রথমে ফোন ধরতে পারেননি। পরে অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ১৮টি মিসড কল দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
মান্নান বলেন, “ধরার সাথে সাথে আমার ছেলে উদ্বিগ্ন ও ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, ‘বাবা, আমি তো অ্যাক্সিডেন্ট করছি। আমি এখন ভালো আছি একটু, টেনশন করো না। আমি হাসপাতালের দিকে যাচ্ছি ড্রেসিং করার জন্য। আমার এই সমস্যা, তোমার বৌমার এই সমস্যা।’”
ছেলের মুখে এমন কথা শুনে ঘাবড়ে যান মান্নান। কী ঘটেছে, কতটা আহত হয়েছেন তারা, কিছুই তখন জানা ছিল না তার। এরপর থেকে ওই ট্যাক্সিচালকের মোবাইল ফোন দিয়েই বিপদগ্রস্ত সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন তিনি।
আগুনে শায়ান ও ফাহমিদার ফোনসহ সব জিনিসপত্র পুড়ে যায়। চিকিৎসা থেকে শুরু করে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা—পুরো সময় ওই চালকের ফোনটিই ছিল যোগাযোগের একমাত্র ভরসা।
মান্নান বলেন, “ঘটনার পর থেকে সবকিছু করে সে (ট্যাক্সিচালক) একেবারে বিমানে উঠাই দিছে। এই পুরো সময়ই তার মোবাইলটা ইউজ করতেছিলাম আমরা।”
ছেলে ও পুত্রবধূকে কাছে পাওয়ার পর তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেন মান্নান। ফাহমিদার কপালের একপাশে ব্যথা, সেখানে ব্যান্ডেজ করা। শায়ানেরও কোমরে ব্যথা ছিল। পিঠের পোড়া অংশের চিকিৎসাও করানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দুজনকে ফিরে পেয়ে স্বস্তি মান্নানের কণ্ঠে।
“যাক, আলহামদুলিল্লাহ। অনেক মানুষ তো মারা গেছে। আল্লাহ পাক তো তাদের সেফলি ফিরায়া আনছে, যেই অবস্থায় আনুক না কেন। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি।”
ছেলে শায়ান ও পুত্রবধূ ফাহমিদার মুখে শোনা ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে কয়েকবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মান্নান।
তিনি বলেন, ঘুম থেকে উঠে শায়ান প্রথমে দেখেন, ঘরে ধোঁয়া ঢুকছে। এরপর দরজা খুলে আগুন দেখতে পান। ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় নিচে নামার কোনো পথ ছিল না।
মান্নানের ভাষ্যে, “ফিরে এসে ছেলে আমারে বলল যে, ‘আমি যখন ঘুম থেকে উইঠা চোখ মেলে দেখি যে, একটা ধোঁয়া, ধোঁয়া আসতেছে। তারপর দরজা—ওই সামনে দরজাটা খোলার পরে দেখি যে আগুন’।
“মানে তখন আর নিচের দিকে বাইর হওয়ার কোনো পথ নাই, সব অন্ধকার হয়ে গেছে ধোঁয়ায়।”
এ অবস্থায় স্ত্রীকে নিয়ে দোতলা থেকে লাফ দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখেননি শায়ান। দুজন একসঙ্গে ঝাঁপ দেন।
মান্নান বলেন, “তখন তার বৌরে বলছে যে, এখন এইখান থেকে লাফ দেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নাই। তখন দুইজনে একসাথে লাফ দিছে।”
দোতলা থেকে লাফ দেওয়ার আগে তাদের গায়ের কাপড়েও আগুন ধরে যাওয়ার উপক্রম হয়। শরীর ও কাপড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই তারা নিচে লাফ দেন। তবে আগুনের ফুলকি এসে পড়ে শায়ানের পিঠে।
মান্নান বলেন, “ছেলের কিন্তু একটু পিঠ পোড়া গেছে। ওই যে স্পার্ক (আগুনের ফুলকি) করছে তো ব্লাস্টের (তাদের মতে, কিছু একটা বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত) পরে।
“তখন ওই স্পার্ক আইসা তার পিঠের মধ্যে পড়ছে। পড়ার পরে পিঠটা মোটামুটি ঝলসে গেছে।”
নিচে ড্রেন ও পানি থাকায় তারা প্রাণে বেঁচে গেছেন বলে মনে করেন মান্নান।
তার ভাষায়, “দুই তলা থেকে ড্রেন আছে যে, ড্রেনের মধ্যে লাফ দিছে। ড্রেন আছে, পানি আছে, পানির মধ্যে লাফ দিছে, যার কারণে মোটামুটি আল্লাহ... আল্লাহর একটা রহমত এইডা আরকি।”
অগ্নিকাণ্ডের পর শায়ান ও ফাহমিদার সব জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। পরনের পোশাক ছাড়া কিছুই নিয়ে বের হতে পারেননি তারা। আহত অবস্থায় তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসা নিয়ে ঢাকায় ফেরেন দুজন।
শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি তাদের এখন মানসিক ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে জানিয়ে মান্নান বলেন, “আমার বৌমা ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক। খুব বেশি ছুটিছাটা পায় না। এবার ছুটি পেয়ে আমাকে এসে বললো, ‘বাবা আমরা ঘুরতে যেতে চাই, যদি আপনারা অনুমতি দেন’।
“আমি সানন্দে রাজি হলাম। এখন মনে হচ্ছে, অনুমতি না দিলেও ভালো হতো। আসলে কার জন্য কখন কী পরিস্থিতি উপরওয়ালা লিখে রাখছেন, সেটা তো আমরা জানি না। তারা যে ফিরে এসেছে এতেই শুকরিয়া।”
