Published : 10 Dec 2025, 06:23 PM
মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের অন্তর্ধান হওয়ার দিন আজ।
১৯৭১ সালের এই দিনে (১০ ডিসেম্বর) নিখোঁজ হন তিনি। এরপর তার আর খোঁজ মেলেনি।
মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে এদেশের সহযোগীরা আরও হিংস্র হয়ে ওঠে।
তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় সে সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা; যারা কলম ধরেছিলেন মুক্তির পক্ষে।
যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের এ দেশের দোসররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সংস্কৃতি কর্মীসহ বিভিন্ন পেশার বরেণ্য ব্যক্তিদের অপহরণ করে। পরে রায়েরবাজার ও মিরপুরে নিয়ে তাদের হত্যা করা হয়।
এছাড়া ২৫ মার্চের কালরাত থেকেই সারাদেশের বুদ্ধিজীবীরা হত্যার শিকার হতে থাকে। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ধরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা এ দেশের মানুষের ওপর যে গণহত্যা ও নৃশংসতা চালিয়েছে, তার নজির ইতিহাসে খুব বেশি নেই।
সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অনেক কাছ থেকে দেখেছেন সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী।
তিনি ২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হওয়ার পেছনে বড় কৃতিত্ব সিরাজুদ্দীন হোসেনের।
"তার লেখনী, তার বিভিন্ন বিষয়ে সংবাদের শিরোনাম মানুষকে এমন উদ্দীপ্ত করেছিল যে, ইত্তেফাক শুধু জনপ্রিয় হয়েছে, তাই-ই নয়, যুক্তফ্রন্ট জনপ্রিয় হয়েছে এবং মানুষ যুক্তফ্রন্টকে ভোট দেওয়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।"
গাফফার চৌধুরী বলেন, "সিরাজুদ্দীন হোসেন শুধু সাংবাদিক, তা তো নয়। তিনি সাহিত্যিকও ছিলেন। যদিওবা দুয়েকটি মানুষ তাকে দেখেছে, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমানে সমানে কথা বলেছেন।
"এটা ভুল হচ্ছে মুজিব তোমার। এটা ভুল হচ্ছে মুজিব তোমার। এটা করো, ওটা করো। এটা বলার সাহস এখন পর্যন্ত আর কারো হয় নাই। সিরাজুদ্দীনের সেটা ছিল।"
ছয় দফা আন্দোলনের সময়, ১৯৬৬ সাল যখন বঙ্গবন্ধু ঠিক করলেন উনি লাহোরে গিয়ে ছয় দফা উত্থাপন করবেন, তিনি তখন সিরাজুদ্দীন ও গাফফার চৌধুরীকে ডেকেছিলেন বলে তুলে ধরেন।
এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হলে তখন কী করতে হবে, সেই পরামর্শও তাদের দিয়ে যান।
গাফফার চৌধুরী বলেন, ইত্তেফাক ছয় দফার খবর ছাপাতে না চাইলেও সিরাজুদ্দীন হোসেন ছয় দফার খবর সেখানে ছেপেছেন।
সিরাজুদ্দীন হোসেনের এ অটল সিদ্ধান্তের ফলে পত্রিকাটির উপর পাকিস্তানি শাসকদের খড়্গ নেমে আসে। তিনিও দীর্ঘদিন বেকারত্বের মুখ দেখেন।
"ইত্তেফাক প্রথমে সাপোর্ট দিতে চায়নি। ভয় পেয়েছে যে নির্যাতন নেমে আসবে। সিরাজ ভাই ছয় দফার খবর ছেপেছেন।
"তারপর সেই ভয়াবহ দিন। ছয় দফা আন্দোলন সমর্থন করার জন্য ইত্তেফাক পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। মানিক মিয়াকে (পত্রিকার তখনকার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া) জেলে নেওয়া হয়। সিরাজ ভাই তখন দীর্ঘকাল বেকার ছিলেন।"
বঙ্গবন্ধু মানিক মিয়া ও সিরাজুদ্দীনের কথা সব সময় বলতেন বলে তুলে গাফফার চৌধুরী বলেন, "বঙ্গবন্ধু বলতেন, এই দুইজনকে ছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশ আমি কেমন করে গড়ব?
"এ দুজন ছিলেন মানিক মিয়া ও সিরাজুদ্দীন হোসেন।"
বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতেও সিরাজুদ্দীনকে নিয়ে দীর্ঘ লেখা রয়েছে তুলে ধরে গাফফার চৌধুরী বলেন, “তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই আত্মজীবনী আর কখনো প্রকাশিত হয়নি বা আলোর মুখ দেখেনি।”