Published : 03 Jun 2026, 08:15 PM
রাজধানীর পল্লবীতে নূরজাহান বেগম নামে এক বৃদ্ধার গলিত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় অবহেলা, দায়িত্বহীনতা, ভরণ-পোষণ ও আইনগত কর্তব্য পালনে ব্যর্থতার বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়ে তার চার সন্তানকে উকিল নোটিস পাঠানো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি বুধবার এই নোটিস পাঠান।
নূরজাহান বেগমের চার সন্তান হলেন- মোংলা সমুদ্র বন্দরের যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অধ্যাপক এ কে এম আশিকুর রহমান, কানাডাপ্রবাসী কে এম আতিকুর রহমান ও স্কুল শিক্ষিকা ফাতিমা নাসরিন সুলতানা।
আইনজীবী রাখি বলেন, “নোটিস পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় জনস্বার্থে এবং প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং উচ্চ আদালতের নজরে আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
নোটিসে বলা হয়েছে, “বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে নজরে আসে, প্রায় ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ নূরজাহান বেগম রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে দীর্ঘ সময় নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান। তার মরদেহ প্রায় ৭ দিন পর উদ্ধার করা হয়।
“প্রকাশিত তথ্যে আরও প্রতীয়মান হয়, তার একাধিক প্রতিষ্ঠিত সন্তান জীবিত থাকা সত্ত্বেও মৃত বৃদ্ধা প্রয়োজনীয় তত্ত্বাবধান, খোঁজখবর ও মানবিক সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত ছিলেন। সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত মর্মান্তিক বিষয় নয়; বরং এটি প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক নৈতিকতা এবং আইনের শাসনের প্রশ্নে জাতীয় গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
নোটিসদাতা বলছেন, “বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫, ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে মানবিক মর্যাদা, আইনের সমান আশ্রয় ও জীবন-নিরাপত্তার যে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে, তার আলোকে প্রত্যেক নাগরিকের, বিশেষত অসহায়, প্রবীণ ব্যক্তির নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও পরিবারের যৌথ দায়িত্ব। অতঃপর, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩-এ সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ, দেখভাল, পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আইনগত বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
“আইনটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান করে, পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন কেবল নৈতিক কর্তব্য নয়, এটি একটি আইনগত দায়িত্বও বটে। যে মা সন্তানের জীবন গঠন করেন, সেই মা যদি জীবনের অন্তিম সময়ে নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও অযত্নের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন এবং মৃত্যুর পরও দীর্ঘ সময় মরদেহ একটি আবদ্ধ কক্ষে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে, পোকা-মাকড় মায়ের মৃতদেহ কুড়ে কুড়ে খায়, তবে তা সভ্য সমাজের জন্য গভীর লজ্জা, বেদনা ও বিবেকের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।”
এর আগে বুধবার সকালে নূরজাহান বেগমের সন্তানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে আইনজীবী মো. শরীফ সরকারের পক্ষে জনস্বার্থে রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী। রিটে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ‘কেয়ারগিভার’নিয়োগের নির্দেশনা চাওয়া হয় ওই আবেদনে।
রোববার রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ কল পেয়ে পল্লবী ৬ নম্বর সেকশনের ৮ নম্বর সড়কের একটি বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বহুতল ভবনটির চতুর্থ তলায় মেয়ের বাসার একটি কক্ষে দীর্ঘদিন ধরে নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করে আসছিলেন তিনি।
পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির বলেন, “লাশটি দেখে মনে হয়েছে তিনি ৩-৪ দিন আগে মারা গেছেন। শরীরে পচন ধরে মাংস খুলে পড়ছিল।”
সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বৃদ্ধার সন্তানদের নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
পুরনো খবর
মিরপুরের বাসায় বৃদ্ধার গলিত লাশ: সন্তানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে রিট মামলা