Published : 11 Aug 2025, 01:27 PM
রাজধানীর পল্লবীতে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে ইশতিয়াক হোসেন জনি হত্যা মামলায় তৎকালীন এসআই জাহিদুর রহমান ও এএসআই কামরুজ্জামানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখেছে হাই কোর্ট।
এ ছাড়া আরেক এএসআই রাশেদুল হাসানের যাবজ্জীবন দণ্ড কমিয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং পুলিশের এক সোর্সকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আরেক সোর্স সাজা খেটে ইতোমধ্যে মুক্ত হয়েছেন।
সোমবার বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি এ কে এম রবিউল হাসানের হাই কোর্ট বেঞ্চ এ মামলার আপিলের রায় ঘোষণা করে।
এগারো বছর আগের এ মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ইরানি ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. বিল্লালের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান ছিল। সে অনুষ্ঠানে পুলিশের সোর্স সুমন নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন।
এ সময় সেখানে থাকা ইশতিয়াক হোসেন জনি ও তার ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকির সঙ্গে পুলিশের সোর্স সুমনের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে সুমনের ফোনে পুলিশ এসে ইশতিয়াক ও ইমতিয়াজকে ধরে নিয়ে যায় এবং থানায় নিয়ে দুই ভাইকে নির্যাতন করে।
এতে ইশতিয়াকের অবস্থা খারাপ হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়; পরে সেখানে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহত ইশতিয়াকের ভাই ইমতিয়াজ হোসেন একই বছরের ৭ অগাস্ট মামলা করেন।
সে মামলায় পল্লবী থানার তৎকালীন এসআই জাহিদুর রহমানসহ আটজনকে আসামি করা হয়। এই মামলাটি ২০১৩ সালে হওয়া নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে প্রথম মামলা।
এই মামলার বাদীর আবেদনে ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়। তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সে তদন্ত প্রতিবেদনে পাঁচ জনকে অভিযুক্ত এবং পাঁচজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। তদন্তকালে এএসআই রাশেদুল ও কামরুজ্জামানকে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত এ মামলায় পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। বিচার শেষে ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রায় দেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ।
ওই রায়ে এসআই জাহিদুর রহমান, এএসআই রাশেদুল হাসান ও এএসআই কামরুজ্জামানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। একইসঙ্গে তাদের প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা করে বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ে অপর দুই আসামি পুলিশের সোর্স সুমন ও রাসেলের সাত বছর কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দেয় বিচারিক আদালত।
দণ্ডিত পাঁচ আসামির মধ্যে তৎকালীন এএসআই কামারুজ্জামান শুরু থেকে পলাতক আর আসামি সুমন সাজাভোগ করে বেরিয়ে গেছেন।
বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জাহিদুর, রাশেদুল ও রাসেল ২০২০ সালে হাই কোর্টে পৃথক আপিল করেন। ২০২১ সালে হাই কোর্ট সব আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে।
গত ৯ জুলাই হাই কোর্টে একসঙ্গে সব আপিলের শুনানি শুরু হয়। গত ৭ অগাস্ট শুনানি শেষে হাই কোর্ট রায়ের জন্য রোববার দিন ঠিক করে। রোববার সারাদিন রায় পড়েও শেষ না হওয়ায় সোমবার ফের পড়া শুরু হয় এবং সাড়ে ১২টার দিকে শেষ হয়।
রায়ে এসআই জাহিদুর রহমান ও এসআই মো. কামরুজ্জমান মিন্টুর সাজা বহাল রাখা হয়। এএসআই এএসআই রাশেদুল হাসানের সাজা কমিয়ে ১০ বছর ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া নিহতের পরিবারকে আরও ২৫ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত। এ ছাড়া রাসেলকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়।
পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, পুলিশ তথা রাষ্ট্র নিরপরাধ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কোনো কোনো সময় অপরাধীরা বিনা বিচারে নির্যাতনে হত্যার শিকার হয়, কিন্তু এই মামলার জনি সম্পূর্ণ নিরপরাধ।
আদালত নিহত ইশতিয়াক হোসেন জনির মা, বিধবা স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে পুনর্বাসনের নির্দেশও দেয়।