Published : 15 Mar 2026, 09:00 AM
প্রায় তিন বছর আগে ‘অজ্ঞান পার্টির’ কবলে পড়ে প্রাণ হারানো ইমরান বাদলের স্ত্রী রুম্পা দুই ছেলেকে নিয়ে এখন গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া থাকেন।
আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় জীবন বয়ে নিয়ে চলা এই নারী ঈদ সামনে রেখে সতর্ক করে বলেছেন, তার স্বামীর মতো যেন আর কারো জীবনে এমন না ঘটে।
এ ঘটনায় করা মামলার একজন আসামির দেওয়া জবানবন্দি ও আরেকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যের বরাতে জানা গেছে, মানুষকে অজ্ঞান করে টাকা পয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করা এই চক্রটি মানুষকের ধোঁকা দিতে ছদ্মবেশ নিত।
কখনো কখনো তারা মাদ্রাসার নামে চাঁদা তুলত।
এ চক্রটির কবলে পড়ে ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রাণ হারান ইমরান বাদল, তিনি তখন টঙ্গীর কটন ফিল্ড বিডি লিমিটেডের ক্রয় কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সে দিন সকাল ১১টার দিকে অফিসের কাজে বিকাশ পরিবহনের একটি বাসে আশুলিয়ার জিরাবো এলাকা থেকে উত্তরার দিকে আসছিলেন ইমরান। অজ্ঞান পার্টি চেতনানাশক খাইয়ে তার ব্যাগ থেকে লাখ খানেক টাকা নিয়ে যায়। উত্তরার কামারপাড়ায় যখন তাকে উদ্ধার করা হয়, তখন তিনি মৃত।
তার আগে বাস থেকে শামসুদ্দিন নামে একজনকে আটক করে যাত্রীরা। পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
এ ঘটনায় ওইদিনই উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন ইমরানের স্ত্রী রুম্পা। একে একে ধরা পড়েন অন্য আসামিরা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ২০২৩ সালের বছরের ৩০ সেপ্টম্বরে চারজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
তারা হলেন-মাদারীপুর সদর থানার খামারবাড়ির শামসুদ্দিন হাওলাদার, গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকার দুর্লভপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম, শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার মাটিফাটা গ্রামের আকরাম আলী ও গাজীপুর সদর থানার টেক কাথোরা গ্রামের দেলোয়ার হোসেন ওরফে হাসান। এরা সবাই এখন জামিনে আছে।
গত বছরের ২৫ অগাস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। মামলাটি ঢাকার নবম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মাহমুদুল হাসানের আদালতে বিচারাধীন।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার মামলার দিন ধার্য ছিল। ওইদিন ইমরানের ভগ্নিপতি এস এম মনির হোসেন সাক্ষ্য দেন। আগামী ২৮ এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী দিন রাখা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত মামলাটিতে পাঁচজনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে মামলার বাদী রুম্পা বলেন, তারা থাকতেন গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায়। স্বামীর এমন মৃত্যুর পর সংসারের নেমে আসে অভাব। টঙ্গী ছেড়ে ফিরে যান নিজ এলাকায় গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায়।
তিনি বলেন, “আমার জীবনটাই শেষ হয়ে গেছে। দুই ছেলেকে নিয়ে অথৈ সাগরে ভাসছি। ওদের বাবা ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সে তো এখন নাই। আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে চলতে হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আমাদের সাথে যেমনটা ঘটেছে, এমনটা যেন আর কারো সাথে না ঘটে। আমার স্বামীর মত আর কাউকে যেন এভাবে অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে প্রাণ হারাতে না হয়।”
আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা প্রত্যাশার পাশাপাশি ‘অজ্ঞান পার্টি’ থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান রুম্পা।
ইমরানের ভগ্নিপতি মনির বলেন, “টাকা পয়সার জন্য এভাবে একজন লোককে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিতে হবে? এটা মেনে নেওয়া যায় না।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম সরকার সাক্ষী হাজির করে মামলার বিচার দ্রুত শেষ করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
সবাইকে সতর্ক করে এ আইনজীবী বলেন, “সামনে ঈদ। যাত্রীরা যেন অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টির ফাঁদে না পড়ে। অপরিচিত লোকের কোনো খাবার খাওয়া বা নেওয়া ঠিক হবে না। সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।”

আসামি আকরাম আলীর জবানবন্দি ও শামসুদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নজরুল ও দেলোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে তারা দেশের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও ঢাকায় চলাচলরত বাসযাত্রীদের নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে নগদ টাকা, মোবাইল ও মালামাল লুটে নিত।
ইমরান হত্যার দিন তারা সকালে আশুলিয়ায় যায় এবং সেখান থেকে যায় ফ্যান্টাসি কিংডম এলাকায়। পরে উত্তরামুখী বিকাশ বাসে চেপে বসে। ইমরানের পাশের আসনে বসে তাকে ‘নেপচুন ল্যাবরেটরি কোম্পানির’ যৌন উত্তেজক ওষুধের কথা বলে চেতনানাশক খাওয়ান শামসুদ্দিন। পরে বাসটি উত্তরা পশ্চিম থানার কামারপাড়া বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছলে শামসুদ্দিন তার ব্যাগে থাকা ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, বাকি তিনজন বাস থেকে নেমে যেতে পারলেও যাত্রীরা শামসুদ্দিনকে আটক করে পুলিশে দেয়। তার আগে সহযোগীরা এক লাখ টাকা নিয়ে চলে যায়।
শামসুদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাধারণ যাত্রীদের ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা ‘ধর্মীয় বেশ’ ধারণ করতো। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে হ্যান্ড মাইক দিয়ে ‘টঙ্গী আল ইনসাফ ক্বারী মিয়া’ মাদ্রাসার নাম ব্যবহার করে চাঁদা তুলে ভাগ করে নিতো।
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, আসামিরা একটি সংঘবদ্ধ অজ্ঞান পার্টির সক্রিয় সদস্য। শামসুদ্দিন এ চক্রের মূলহোতা। তদন্তে জানা যায়, তারা দীর্ঘদিন বাসযাত্রীদের অজ্ঞান করে তাদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন, নগদ টাকাসহ অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে আসছিল।
ইমরানের ভিসেরা ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের বরাতে তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, তারা মৃত্যু হয়েছে চেতনানাশকের কারণে।
মামলার বিষয়ে কথা বলার জন্য আসামিপক্ষের আইনজীবী খান মো. ইব্রাহিমকে কয়েকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি।