২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

ওয়াশিকুর হত্যা: রায়ের অপেক্ষায় থাকা মামলা ১১ বছর পর ‘বিচারের অপেক্ষায়’

রায় হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে; কিন্তু ত্রুটির কথা বলে নতুন করে অভিযোগ গঠন হয়। আর দ্বিতীয়বার অভিযোগ গঠনের পরেই ঝুলে যায় মামলাটি।

ওয়াশিকুর হত্যা: রায়ের অপেক্ষায় থাকা মামলা ১১ বছর পর ‘বিচারের অপেক্ষায়’
ওয়াশিকুর রহমান বাবু

বিডিনিউজ২৪

মামুন খান

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Mar 2026, 09:28 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:16 PM

তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ী এলাকায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে কুপিয়ে হত্যার বিচারকাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। 

১১ বছর আগের এ হত্যাকাণ্ডের রায় কবে হতে পারে, সে ধারণাও দিতে পারছেন না মামলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। 

অন্যদিকে ‘মামলার ভবিষ্যৎ’ নেই দাবি করে আসামিদের খালাসের অপেক্ষায় আছেন বিবাদী পক্ষের আইনজীবীরা।

২০১৫ সালের ৩০ মার্চ কর্মস্থলে যাওয়ার পথে তেজগাঁওয়ে দুর্বৃত্তদের চাপাতির আঘাতে খুন হন ওয়াশিকুর, যিনি ফেইসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে ধর্মীয় গোড়ামির বিরুদ্ধে লিখতেন।

হত্যাকাণ্ডের পরেই ঘটনাস্থল থেকে আরিফুল ও জিকরুল্লাহ নামে দুজনকে আটকের তথ্য দেয় পুলিশ।

এ ঘটনায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করেন ওয়াশিকুরের ভগ্নিপতি মনির হোসেন মাসুদ। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক মশিউর রহমান। 

পরের বছরের ২০ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক এস এম জিয়াউর রহমান। 

হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় আরিফুল ও জিকরুল্লাহকে।

হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় আরিফুল ও জিকরুল্লাহকে।

সাড়ে চার বছর বিচার চলার পর ২০২০ সালের ২৭ অক্টোবর রায়ের দিন নির্ধারণ করে আদালত। কিন্তু তখন অভিযোগ গঠনের কিছু ত্রুটি ধরা পড়ে। পরে এ মামলায় নতুন করে অভিযোগ গঠন করা হয়। 

এর মাঝে মামলাটি ১২তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলি হয়। এরপর আর তেমন অগ্রগতি নেই মামলায়। 

জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেও সাক্ষী হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। 

সাক্ষী হাজির না হওয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করার আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক বুলবুল ইসলাম গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানির দিন রাখেন। 

এরপর ৬টা ধার্য তারিখ পার হলেও আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি হয়নি। সর্বশেষ রোববার দিন ধার্য ছিল। তবে এদিন আসামিদের পক্ষে সময় আবেদন করা হয়। 

আদালত সময় আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ১০ মে আত্মপক্ষ শুনানির দিন রেখেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারি রাহিমুল করিম হিমেল।

ওয়াশিকুর রহমান বাবুর বাবা টিপু সুলতানের বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই। তিন সন্তানের মধ্যে ৯০ দশকের শুরুতে মারা যান বড় ছেলে। 

এরপর ১৯৯৫ সালের মৃত্যু হয় স্ত্রীর। ১১ বছর আগে হারান একমাত্র ছেলেকে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপেজলার উত্তর হাজীপুরে। সেখানে মেয়েই তার দেখভাল করে।

বর্তমানে সুপারি ও নারকেল বিক্রি করে সংসার চলছে বলে জানান টিপু সুলতান।

হত্যাকাণ্ডের পর হাসপাতালে ওয়াশিকুরের স্বজনদের আহাজারি।

হত্যাকাণ্ডের পর হাসপাতালে ওয়াশিকুরের স্বজনদের আহাজারি।

মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে টিপু সুলতান বলেন, “ছোট বেলায় ছেলে-মেয়েকে ফেলে তার মা চলে যায়। নিজ হাতে ওদের বড় করেছি। ওয়াশিকুরকে ঢাকায় ভর্তি করি। ছেলেটা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়, প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই ছেলেটাকে খুন করল। 

“১১ বছর হয়ে গেছে, বিচার পেলাম না। আমি বিচার চাই। বয়সও হয়েছে; মৃত্যুর আগে যেন ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে পারি। বিচার হলে কিছুটা শান্তি পাব।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,"আমার ছেলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, কোরআন পড়ত, মসজিদে যেত। কী কারণে তাকে খুন করল! নতুন সরকার আসছে। তারা যেন মামলাটা দ্রুত শেষ করেন।"

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, “বিগত ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকার এসব মামলার বিচারে যত্ন নেয়নি৷ তারা মিথ্যা রাজনৈতিক মামলা নিয়েই ব্যস্ত ছিল। বর্তমান সরকার এসব মামলার বিচার নিশ্চিতে কাজ করছে৷ ইতোমধ্যে এসব মামলার তালিকা করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত এ মামলার বিচার কাজ শেষ হবে৷”

ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের বরাত পুলিশ বলেছিল, ‘ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেওয়ার কারণে’ ওয়াশিকুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। 

মামলার আসামিরা হলেন- জিকরুল্লাহ ওরফে হাসান, আরিফুল ইসলাম ওরফে মুশফিক ওরফে এরফান, সাইফুল ইসলাম ওরফে মানসুর, মাওলানা জুনায়েদ আহম্মেদ ওরফে তাহের ও সাইফুল ইসলাম ওরফে আব্দুল্লাহ। 

আসামিদের মধ্যে জুনায়েদ আহম্মেদ ও আব্দুল্লাহ মামলার শুরু থেকে পলাতক। অন্য আসামিরা জামিনে আছেন।

জিকরুল্লাহ ও আরিফের আইনজীবী আব্দুর রশীদ মোল্লা বলেন, “মামলাটা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রায়ের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আসামিদের সাজা দেওয়ার মতো কিছু ছিল না; খালাস দেওয়া লাগে। সরকার চাপ দেয় আদালতের ওপর। নতুন ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।"

তিনি বলেন,"এ মামলার ভবিষ্যৎ নাই বললেই চলে। ওই সময় রায় দিলে হাই কোর্টে মামলাটা নিষ্পত্তি হয়ে আসামিরা খালাস পেয়ে যেত। জোর করে আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ওই সময় হয়েছে। 

“মাদ্রাসার ছাত্রদের, সাধারণ জনগণকে ধরে জঙ্গী সাজিয়ে ফাঁসিয়ে দিত। এ মামলার ভবিষ্যৎ নাই। ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু প্রকৃত দোষীরা আইনের আওতায় আসেনি।” 

এই আইনজীবীর দাবি, “জিকরুল্লাহ ও আরিফকে ঘটনাস্থল থেকে ধরে নাই। বাসা থেকে ধরে এনে মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছে। আশা করছি, ন্যায়বিচারে তারা খালাস পাবেন।”

ওয়াশিকুর রহমান মতিঝিলে ‘ফারইস্ট অ্যাভিয়েশন’ নামে একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে ট্রেইনি অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি সরকারি তিতুমীর কলেজে স্নাতকোত্তর করছিলেন।

বাবা টিপু সুলতানের সঙ্গে বেগুনবাড়ীর একটি কক্ষে সাবলেট থাকতেন। তাদের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপেজলার উত্তর হাজীপুরে।

মামলার বাদী ওয়াশিকুর রহমানের ভগ্নিপতি মনির হোসেন মাসুদ ইতালী প্রবাসী বলে জানান টিপু সুলতান। তিনি আদালতে সাক্ষ্য দেননি।

পুরনো খবর

ব্লগার ওয়াশিকুর হত্যা মামলার রায় ২৭ অক্টোবর

ব্লগার ওয়াশিকুর হত্যায় ফ্রান্সের নিন্দা

ওয়াশিকুর হত্যাদুই আসামি রিমান্ডে

ফের অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট খুন২ জনকে ধরল জনতা