Published : 22 Mar 2026, 08:35 PM
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যার প্রধান আসামি ভারতে গ্রেপ্তার ফয়সাল করিম মাসুদ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের পর রোববার পশ্চিমবঙ্গের একটি আদালতে হাজির করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণে ফয়সাল ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অস্বীকার করেন।
ভারতের সংবাদমাধ্যম সংবাদ প্রতিদিনের খবরে বলা হয়েছে, বিধাননগর আদালতে দাঁড়িয়ে ফয়সাল দাবি করেছেন- তিনি এসব কাজ করেননি, কোনও কিছুর সঙ্গে যুক্তও নন।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) হাতে গত ৭ মার্চ গ্রেপ্তার হওয়া ফয়সালকে ১৪ দিনের রিমান্ড শেষে রোববার আদালতে নেওয়া হয়।
পুলিশ পাহারায় আদালতে নেওয়ার সময় হাদি হত্যার প্রধান এ আসামি ও সন্দেহভাজনকে নানা প্রশ্ন করেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। সেই ঘটনার ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ভিডিওতে দেখা যায়, ফয়সাল ও আলমগীরকে হাঁটিয়ে নিয়ে আসছেন পুলিশ সদস্যরা। তখন স্থানীয় সাংবাদিকরা ঘিরে ধরেন। নানা প্রশ্ন করতে থাকেন।
একজন প্রশ্ন করেন, কার কথায় হাদিকে হত্যা করা হয়েছিল ফয়সাল? কে বলেছিল? কেউ ফাঁসিয়েছে নাকি?
এসব প্রশ্নে চুপ থাকেন ফয়সাল। পরে আবারও একই প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “আমি এ কাজ করি নাই।”
তাকে ফাঁসানো হয়েছে কিনা আবার জানতে চান এক সাংবাদিক। ফয়সাল তখন আবারও ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বলেন, “নো, আমি এ কাজই করি নাই। এ ধরনের কাজে আমি ছিলাম না।”
ফাঁসাচ্ছে কারা? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি জানি না।”
আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন- তুমি পালালে কেন? পালালে কেন ভাই? এ প্রশ্নে চুপ থাকেন ফয়সাল।
এরপর আরো কিছু প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। তখন ফয়সাল ও আলমগীর কেউ কোনো জবাব না দিয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে উপরের তলায় উঠে যান।
কলকাতার সংবাদ প্রতিদিন লিখেছে, রোববার বিধাননগর আদালতে দাঁড়িয়ে হাদি খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন ফয়সাল করিম।
পরে তাদের দুজনকে আরও ১৪ দিনের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
আদালত থেকে জেলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে ফের সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়েন ফয়সাল। তখন তিনি বলেন, “আপনারা এত হাদি হাদি করছেন। বাংলাদেশের মানুষ এত হাদি হাদি করতেছে। হাদি তো অ্যাকচুয়ালি একটা জামায়াতের প্রোডাক্ট, ও তো একটা জঙ্গি।”
খুনটা কি তুমি করেছিলে? এক সাংবাদিকের এ প্রশ্নে ফয়সাল বলেন, ‘নো’।
তাহলে কে করেছে? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “জামায়াত-বিএনপির একটা চাল হতে পারে।”
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক হাদি হত্যার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেনকে ৮ মার্চ গ্রেপ্তারের তথ্য দেয় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ। ৭ মার্চ গ্রেপ্তারের তথ্য পরদিন এসটিএফের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে বার্তা সংস্থা এএনআইও প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বনগাঁ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এসটিএফ বলছে, দুই বাংলাদেশি তাদের দেশে চাঁদাবাজি, হত্যাসহ গুরুতর অপরাধ করে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে বলে ‘গোপন ও বিশ্বাসযোগ্য’ তথ্য ছিল। তারা সুযোগ পেলে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে গভীররাতে বনগাঁ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বলে, ফয়সাল ও সহযোগী আলমগীর বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মী ওসমান হাদিকে হত্যা করে ভারতে পালিয়ে যায়। মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে তারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরার পর বাংলাদেশে ‘ফেরার উদ্দেশ্যে’ শেষ পর্যন্ত বনগাঁয় যায়।
এ বিষয়ে মামলা করার কথা জানায় এসটিএফ।
বাংলাদেশে আদালতের নির্দেশনার পর বর্তমানে হাদি হত্যা মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
ফয়সালের গ্রেপ্তারের খবরের পর এ ইউনিটের তখনকার প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. ছিবগাত উল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়ার পর তাদের ভারত থেকে ফিরিয়ে আনতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী।
গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর খবর আসে।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে।
তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)। তাদের মধ্যে শেষের তিনজন পলাতক রয়েছেন।
হাদি হত্যা মামলায় ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে গত ৬ জানুয়ারি অভিযোগপত্র দেয় ডিবি পুলিশ। কিন্তু অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট নয় ইনকিলাব মঞ্চ।
আরও পড়ুন-