০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

হাদি হত্যার প্রধান আসামি ফয়সাল করিমসহ দুজন ভারতে গ্রেপ্তার

শনিবার গভীররাতে বনগাঁ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

হাদি হত্যার প্রধান আসামি ফয়সাল করিমসহ দুজন ভারতে গ্রেপ্তার
ফয়সাল করিম মাসুদ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Mar 2026, 05:47 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:06 PM

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স।

এসটিএফের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে রোববার সন্ধ্যায় বার্তা সংস্থা এএনআই’র প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শনিবার রাতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বনগাঁ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

এসটিএফ বলছে, দুই বাংলাদেশি তাদের দেশে চাঁদাবাজি, হত্যাসহ গুরুতর অপরাধ করে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে বলে ‘গোপন ও বিশ্বাসযোগ্য’ তথ্য ছিল। তারা সুযোগ পেলে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিল।

এই তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার গভীররাতে বনগাঁ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বলছে, ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মী ওসমান হাদিকে হত্যা করে ভারতে পালিয়ে যায়। মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে তারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরার পর বাংলাদেশে ‘ফেরার উদ্দেশ্যে’ শেষ পর্যন্ত বনগাঁয় যায়।

এ বিষয়ে মামলা করা হয়েছে জানিয়ে এসটিএফ বলছে, রোববার আদালতে হাজির করার পর তাদের পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।

জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে রোববার সন্ধ্যায় বলেন, “ওরা আমাদেরকে এখনো অফিসিয়ালি কনফার্ম করেনি।”

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বলেন, “আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টা জেনেছি। এখন যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অফিসিয়ালি বিষয়টি জানার চেষ্টা করছি।” 

বাংলাদেশে আদালতের নির্দেশনার পর বর্তমানে হাদি হত্যা মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

ফয়সালের গ্রেপ্তারের খবরের পর এ ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. ছিবগাত উল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়ার পর তাদের ভারত থেকে ফিরিয়ে আনতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী।

গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর খবর আসে।

হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে।

তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ।

অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)। তাদের মধ্যে শেষের তিনজন পলাতক রয়েছেন।

হাদি হত্যা মামলায় ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে গত ৬ জানুয়ারি অভিযোগপত্র দেয় ডিবি পুলিশ। কিন্তু অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট নয় ইনকিলাব মঞ্চ।

গত ১২ জানুয়ারি মামলাটি শুনানির জন্য ছিল। মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাবের সেদিন অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য দুই দিন সময় চান। আদালত তা মঞ্জুর করে ১৫ জানুয়ারি অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ঠিক করেন।‎

সেদিন ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে নারাজি দাখিল করেছে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। পরে আদালত মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেয়।

অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ বলেছেন, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ে হাদির দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে বোঝা গেছে, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই’ হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘বাধাগ্রস্ত করতে’ এবং ভোটারদের মধ্যে ‘ভয়ভীতি তৈরি করতেই’ আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হাদির নির্বাচনি প্রচারে অনুপ্রবেশ করে বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়।