Published : 19 Nov 2025, 03:21 PM
দৈনিক ভোরের কাগজের অনলাইন প্রধান মিজানুর রহমান সোহেলকে মধ্যরাতে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ১০ ঘণ্টা পর আবার ছেড়ে দেওয়ার কারণ এখনো স্পষ্ট হয়নি।
ছাড়া পাওয়ার পর সোহেল এই ভোগান্তির জন্য দায়ী করেছেন সরকারের একজন উপদেষ্টাকে, যদিও তিনি তার নাম নেননি।
আবার এ ঘটনায় ফেইসবুকের আলোচনায় প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়বের নাম এসেছে।
তবে ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব তা অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, একটি ‘স্বার্থান্বেষী মহল’ তার কাছ থেকে ‘সুযোগ সুবিধা নিতে ব্যর্থ হয়ে’ এ ধরনের ‘অপপ্রচার’ চালাচ্ছে।
আর গোয়েন্দা পুলিশ পুরো বিষয়টিকে তুলে ধরেছে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাড্ডার বাসা থেকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তারা সাংবাদিকরা মিজানুর রহমান সোহেলকে ধরে নিয়ে যান। এরপর বৃহস্পতিবার ভোরে তাকে স্ত্রীর জিম্মায় বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয় বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল আলম জানান।
একই ঘটনায় মোবাইল ফোনের 'গ্রে মার্কেটের’ এক ব্যবসায়ী ‘মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের’ সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ পিয়াসকে রাত ৩টার দিকে তার মিরপুর ১ নম্বরের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পিয়াস এখনো ডিবি হেফাজতেই রয়েছেন।
এদিকে সোহেল ছাড়া পাওয়ার পর বেলা ১১টার দিকে এক ফেইসবুক পোস্টে তার ভোগান্তির বর্ণনা দেন। তার ভাষ্য, মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের (এমবিসিবি) সংবাদ সম্মেলন ‘বন্ধ করার জন্য’ তাকে আটক করা হয়েছিল, কারণ তিনি ওই সংগঠনের মিডিয়া পরামর্শক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
ফেইসবুক পোস্টে সোহেল বলেন, “গত রাত ১২টার দিকে ডিবি প্রধান আমার সঙ্গে কথা বলবেন, এই অজুহাতে ৫/৬ জন ডিবি সদস্য জোর করে আমাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। ডিবিতে নিয়ে আসামির খাতায় আমার নাম লেখা হয়। জুতা-বেল্ট খুলে রেখে গারদে আসামিদের সাথে আমাকে রাখা হয়।
“কিন্তু কেন আমাকে আটক করা হলো? তা আমি যেমন জানতাম না, তেমনি যারা আমাকে তুলে এনেছিলেন বা ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও কিছু বলতে পারেননি। দীর্ঘ সময় পর বুঝতে পারলাম, সরকারের একজন উপদেষ্টার ইশারায় মাত্র ৯ জন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে মনোপলি ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়ার জন্যই আমাকে আটক করা হয়েছিল। আমার সাথে সংগঠনের (এমবিসিবি) সেক্রেটারি আবু সাঈদ পিয়াসকেও আটক করা হয়।”
ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্ট্রার (এনইআইআর) নিয়ে বুধবার ডিআরইউতে এমবিসিবির সংবাদ সম্মেলন করার কথা ছিল জানিয়ে সোহেল লিখেছেন, “সেই প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করাই তাদের প্রধান টার্গেট ছিল। কিন্তু তাদের জন্য আফসোস, যে উদ্দেশ্যে তারা প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতে চাইল, সেটা দেশের সবাই জেনে গেল।”
তার অভিযোগ, “দেশের মুক্ত বাণিজ্য নীতির সঙ্গে এনইআইআর স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক। প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে দেশে প্রতিযোগিতা কমিশনও রয়েছে। অথচ মাত্র ৯ জন ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে সারাদেশে ২৫ হাজার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে পথে বসানোর গভীর চক্রান্ত চলছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে গ্রামের সাধারণ মানুষ, প্রবাসীসহ অনেকেই বিপদে পড়বেন। একটা চেইন ভেঙ্গে পড়বে। অনেক ব্যবসায়ী পথে বসে যাবে। জেনে রাখা ভালো, এই ৯ জনের একজন ওই উপদেষ্টার স্কুল-বন্ধু।”
সোহেল লিখেছেন, “একটা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললে সরকার কেন ভয় পায়? শুধুমাত্র প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতেই কি আমাকে গভীর রাতে জোর করে তুলে নিতে হল? যারা মুখে ‘বাকস্বাধীনতা’র বুলি আওড়ান, তারাই কি আমাকে বাকরুদ্ধ করতে এই আয়োজন করলেন? মগের মুল্লুকে এই কি তবে বাকস্বাধীনতার বাস্তব চিত্র?”
এদিকে রাতে সোহেলকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবরের মধ্যেই ফেইসবুকে একাধিক ব্যক্তি এর পেছনে ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যবকে ইঙ্গিত করে পোস্ট দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সোহেল নাম উচ্চারণ না করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনি নিজেও (ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব) জানেন আমি কার কথা বলছি।”
অস্বীকার ফয়েজের
সোহেলকে ডিবি পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। বুধবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।
'ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' শিরোনামের ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “মঙ্গলবার রাতে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল ভোরের কাগজের অনলাইন এডিটর মিজানুর রহমান সোহেলকে কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায় বলে খবর পাওয়া যায়। তবে এর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে জড়িয়ে একটি ভিত্তিহীন প্রচারণা চালানো হয়েছে; যা সকালে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সেখানে এনইআইআর বাস্তবায়নের সঙ্গে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে জড়িয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে সত্যের অপলাপ করা হয়েছে।”
তৈয়্যব বলেন, “রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার স্বার্থেই আমরা এনইআইআর বাস্তবায়ন করছি। অবৈধ হ্যান্ডসেটের লাগাম টানতে সংক্ষুব্ধ পক্ষের সঙ্গে বিটিআরসি বৈঠকও করেছে। এত কিছুর পরও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই একটি ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো অনলাইন নিউজ পোর্টাল আমার ওপর দায় চাপিয়েছে। তাদের উদ্দেশেই আমার বক্তব্য- এটা অনভিপ্রেত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কাজ করে। এখানে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকার অবকাশই নেই।
“এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা তার পরিবারের পক্ষ থেকেও আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। অথচ একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার কাছ থেকে সুযোগ সুবিধা নিতে ব্যর্থ হয়ে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিককে বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে।”
তৈয়্যব বলেন, “সাংবিদক মিজানুর রহামানের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত বা পেশাগত কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তারপরও এমন প্রপাগান্ডা মুক্তমত প্রকাশের স্বাধীনতাকেই ভুলুণ্ঠিত করছে।”
ডিবি বলছে ‘ভুল বোঝাবুঝি’
মিজানুর রহমান সোহেলকে ধরে নিয়ে আসার বিষয়টি ‘ভুল বোঝাবুঝি’ ছিল বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল আলম।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনি একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু অনুমতি ছাড়াই সভাপতি-সেক্রেটারির নাম ব্যবহার করেছিলেন।
“পরে আমরা ওই প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারিকে ডেকে আনি এবং বিষয়টি ভুল বুঝাবুঝি হওয়ায় ভোরবেলা সাংবাদিক মিজানুর রহমানকে বাসায় দিয়ে আসা হয়েছে।”