Published : 25 Oct 2025, 12:23 PM
দেশে যে ২৬টি বিসিএস ক্যাডার রয়েছে, তার মধ্যে প্রশাসন ছাড়া বাকি ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্তরা পদোন্নতি ও সুবিধা দেওয়ার দাবি তুলেছেন।
সেই সঙ্গে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করতে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নিয়ে অধ্যাদেশ জারির দাবি জানানো হয়েছে।
শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে এসব দাবি তুলে ধরেন ‘বৈষম্যবিরোধী অবসরপ্রাপ্ত ২৫ ক্যাডার সমন্বয় পরিষদ’র সমন্বয়ক আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল।
বিগত সরকারের শাসনামলে ‘বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তাদের বঞ্চনা লাঘবের জন্য’ অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “এ প্রক্রিয়ায় প্রশাসন ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্ত ও প্রয়াত মিলে প্রায় ৭৭৮ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তাদের পদোন্নতির আদেশে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিক্রম উল্লেখ এবং বেতন ভাতাসহ সকল অর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।
“পরবর্তীতে অন্যান্য ক্যাডারের পক্ষ থেকে দাবি উত্থাপন করা হলে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়। প্রাপ্ত আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করে ২৫টি ক্যাডারের বঞ্চিত অবসরপ্রাপ্ত মাত্র ৭২ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়। যাচাই বাছাইয়ে প্রকৃতপক্ষে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা কোনো কারণ ছাড়াই বাদ পড়ে যান।“
আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল বলেন, “অবসরপ্রাপ্ত ২৫ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির আদেশেও বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এই আদেশে শুধু বকেয়া মূলবেতন, গ্রাচ্যুইটি এবং পেনশনের জন্য আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
“আমরা ২৫ ক্যাডারের বঞ্চিত সকল কর্মকর্তাদের আবেদনগুলো পুনর্বিবেচনা এবং প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মতো ভূতাপেক্ষ বেতন ভাতাসহ সকল আর্থিক সুবিধা প্রদানের জোর দাবি জানাচ্ছি।”
যেসব ক্যাডারের পদোন্নতির সুযোগ তৃতীয় বা চতুর্থ গ্রেডে আটকে রাখা হয়েছে, তাদেরকে উচ্চ-গ্রেড প্রদানের মাধ্যমে সমতা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে ‘বৈষম্যবিরোধী অবসরপ্রাপ্ত ২৫ ক্যাডার সমন্বয় পরিষদ’।
প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সব মন্ত্রণালয়ের পদ দখল করে আছে অভিযোগ করে আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল বলেন, “এই পদগুলোকে প্রশাসনিক পদ বলে প্রচার করে প্রশাসন ক্যাডার প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের পদ দখল করে আছে। ‘হরফুন মৌলা বা সকল কাজের কাজী’র ন্যায় তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা বা পেশাদারিত্ব না থাকলেও পদগুলো দখল করে রেখেছে।
“অথচ সিভিল সার্ভিস গঠনকালে সরকারের উপসচিব এবং তদুর্ধ্ব পদগুলোকে পুলপদ হিসেবে রাখা হয়েছিল। প্রশাসন ক্যাডারসহ কোন ক্যাডারের তফসিলেই পদগুলো ছিল না।
“প্রশাসন ক্যাডারের পদোন্নতির সোপানেও উপসচিব ও তদুর্ধ্ব কোনো পদ ছিল না। সকল ক্যাডার থেকে প্রতিযোগিতামুলক পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাইকৃত মেধাবী, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের এসকল পদে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল। এ কারণে ক্যাডার সার্ভিস গঠনের আগেই ‘সিনিয়র সার্ভিস পুল আদেশ, ১৯৭৯’ জারি করা হয়েছিল।”
তিনি বলেন, “অথচ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ সকল মন্ত্রণালয়ে তাদের অবস্থানগত সুবিধার অপব্যহার করে ধাপে ধাপে উপসচিব ও তদুর্ধ্ব পদগুলো দখল করেছে। ২০২৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের পরের মাসে এই পদগুলো প্রশাসন ক্যাডারের তফসিলভুক্তও করে নিয়েছে।
“এর ফলে প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরা অন্যান্য ক্যাডারের ওপর কর্তৃত্ব করার দাপ্তরিক সুযোগ পাচ্ছে, কিন্তু জনগণ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।”
জুলাই সনদের ৮৪টি সুপারিশে জনপ্রশাসন সংস্কার বিষয়ক ৭টি সুপারিশ স্থান পেয়েছে উল্লেখ করে আহমেদ আলী চৌধুরী বলেন, “যে দুইটি সুপারিশের বিষয়ে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ আপত্তি জানিয়েছিল, সেই দুইটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুপারিশ দুটির একটি হলো— সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের জন্য তিনটি পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন (সরকারি কর্মকমিশন (সাধারণ), সরকারি কর্মকমিশন (শিক্ষা) ও সরকারি কর্মকমিশন (স্বাস্থ্য)) এবং অপরটি হলো, হিসাব বিভাগ থেকে নিরীক্ষা বিভাগ আলাদাকরণ।
“নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগ একত্রে থাকার কারণেই প্রি-অডিট কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে। কারণ সিএজির কম্পট্রোলার (ব্যয় নিয়ন্ত্রক) হিসেবে ভূমিকা কার্যকর হয় হিসাব বিভাগের মাধ্যমে। যদি হিসাব বিভাগকে নিরীক্ষা বিভাগ থেকে পৃথক করা হয়, তবে প্রি-অডিট কার্যক্রম বিলুপ্ত হবে, যা আর্থিক জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করবে।”
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশকে আড়াল করে, অত্যন্ত কম গুরুত্বপূর্ণ ও অযৌক্তিক কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে জুলাই সনদকে দুর্বল করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন অবসরপ্রাপ্ত ২৫ ক্যাডার সমন্বয় পরিষদের সমন্বয়ক আহমেদ আলী।
তিনি বলেন, “সুপারিশকৃত সিনিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিসের বিষয়টি সনদে অন্তর্ভুক্ত থাকা জরুরি ছিল। কারণ এই বিষয়টি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ও উন্নয়ন কর্মসূচির সাথে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট। পুলের বিধি অনুযায়ী, আমরা উপসচিব পদে কোটা বাতিল করে সকল ক্যাডার থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছি। আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদও একই দাবি জানিয়েছে।

“কিন্তু জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন উপসচিব পর্যায়ের মোট পদের প্রশাসন ক্যাডারের জন্য ৫০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট ২৫ ক্যাডারের জন্য ৫০ শতাংশ পদ রাখার সুপারিশ করেছে, যা জুলাই বিপ্লবের সাথে সাংঘার্ষিক। জুলাই সনদে এ বিষয়ের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।”
আহমেদ আলী বলেন, “তাছাড়া জুলাই সনদ গৃহীত হওয়ার পর, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের অপরাপর সুপারিশমালা কোন পর্যায়ে রাখা হয়েছে, সেগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, সে বিষয়ে কঠোর গোপনীয়তা চলছে। আমরা আশঙ্কা করছি যে, পূর্বের ন্যায় এই সংস্কার কমিশনের যে অংশটুকু প্রশাসন ক্যাডারের স্বার্থ রক্ষা করবে, সেটুকুই বাস্তবায়ন করা হবে; অবশিষ্টগুলো আর আলোর মুখ দেখবে না।
“বাংলাদেশে জনপ্রশাসন সংস্কারের লক্ষ্যে এ পর্যন্ত ২৬টি কমিশন বা কমিটি গঠন করা হয়েছে, তার সবগুলোতেই এমন ঘটনা ঘটেছে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্রজনতার রক্তের বিনিময়ে গঠিত বর্তমান সরকার জনপ্রশাসনের বৈষম্য দূর করে সেবা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গঠনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সে আশা করছি।”
ঢাকা মহানগরীর সাতটি কলেজ নিয়ে শিক্ষাখাতে নতুন সংকট সৃষ্টি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “এই সাতটি কলেজসহ সারাদেশের সকল কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিলো। কোনো ধরনের স্টাডি ব্যতিরেকে, কেবলমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ২০১৭ সালে এই সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছিল।
“শিক্ষার্থীরা প্রথমে খুশি হলেও কিছুদিনের মধ্যে অব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি চরম অবজ্ঞা-অবহেলার অভিযোগ উত্থাপন করে আন্দোলন শুরু করে। সে পরিপ্রেক্ষিতে সমাধানের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে, যেখানে শিক্ষা ক্যাডারের কাউকে রাখা হয়নি।
“…দেশসেরা কলেজগুলো বন্ধ করে অনুমান নির্ভর বা পরীক্ষামূলক কোর্স পরিচালনা সঠিক নয়। গণভোটে নয়-শিক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞগণের সুপারিশের আলোকে, এবং অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”